প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মুক্তিপণ দিয়েছে কাতার!

ডেস্ক রিপোর্ট:  কাতারের ২৮ জন নাগরিকের ইরাকে অপহৃত হওয়া ও তাদের মুক্তি পাওয়ার প্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠেছে, কাতার কি তাদের মুক্ত করতে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঙ্কের মুক্তিপণ দিতে বাধ্য হয়েছিল? সংবাদমাধ্যম বিবিসির হাতে পৌঁছানো কথোপকথনের বর্ণনায় উঠে এসেছে অপহরণের ওই ঘটনার আদ্যোপান্ত। বিবিসি উল্লেখ করেছে, অপহরণকারীরা ইরান সংশ্লিষ্ট শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যারা সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত। যে বৈরি দেশ কাতারের এসব ফোনকলের রেকর্ড ফাঁস করেছে তারা প্রমাণ করতে চায়, কাতার সন্ত্রাসীদের অর্থায়নে কাজ করেছে। অন্যদিকে কাতারের দাবি তারা, ইরাক সরকারকে অর্থ দিয়েছে। তারপরও বৈরি দেশটি দাবি করেছে, ইরাক আসলে ওই অর্থ বণ্টনের কাজ করেছে। কাতার যে আগেও অপহরণের সঙ্গে জড়িত শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীটিকে অর্থ দিয়েছিল এবং দরকষাকষির সময়ে তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল তারও বর্ণনা রয়েছে ফাঁস হয়ে যাওয়া ফোনকলে। মোদ্দা কথা, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ওই মুক্তিপণের অঙ্ক কাতার পরিশোধ করেছে কি না তা প্রমাণ-অপ্রমাণের ওপর নির্ভর করছে দেশটির বিরুদ্ধে থাকা সৌদি জোটের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি।

ঘটনার শুরু ২০১৫ সালের ১৬ ডিসেম্বরে। ওই দিন কাতারের কাছে খবর আসে, রাজপরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২৮ জন ইরাকে অপহরণের শিকার হয়েছেন। এদের অনেকে সরাসরি রাজপরিবারের সদস্য এবং অন্যরা তাদের বন্ধুবান্ধব। তারা ইরাকে গিয়েছিলেন বাজপাখি শিকার করতে। যখন কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য নির্ধারিত ব্যক্তি শেইখ মোহাম্মেদ বিন আব্দুলরাহমান আল থানির হাতে অপহৃতদের তালিকা পৌঁছাল, তখন তিনি দেখলেন অপহৃতদের মধ্যে দুইজন তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। অপহৃত এসব ব্যক্তিকে পরবর্তী ১৬ মাস জিম্মি অবস্থায় থাকতে হয়েছিল। অপহৃতদের দুইভাগে ভাগ করে রাখা হয়েছিল। এক দলে রাজপরিবারের সদস্য। আর অন্য দলে তাদের সঙ্গী যারা কাতারের রাজপরিবারের সদস্য নয়। যারা কাতারের রাজ পরিবারের সদস্য নয় তাদেরকে তুলনামূলক ভালো খাবার দেওয়া হয়েছিল এবং ভালো আচরণ করা হয়েছিল। অন্যদিকে কাতারের রাজপরিবারের সদস্যদের মাটির তলার ঘরে রাখা হতো। কিছুদিন পরপর তাদের স্থান পরিবর্তন করা হতো। অপহৃতদের একজন নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, প্রথমে তারা অপহরণকারীদের ইসলামিক স্টেটের সদস্য মনে করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তারা সুন্নিদের উদ্দেশে শিয়াদের ব্যবহৃত কটুবাক্য বলতে শোনেন একজন অপহরণকারীকে।

অপহৃতদের উদ্ধারে শেইখ মোহাম্মেদ বিন আব্দুলরাহমান আল থানি ইরাকে নিযুক্ত কাতারের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। তাদের ওই আলোচনার বর্ণনাই পরবর্তীতে ফাঁস হয়ে যায়। কাতারের প্রতি বৈরি যে দেশটি ওই আলোচনার বিস্তারিত ফাঁস করেছে তাদের ভাষ্য, অপহৃতদের উদ্ধারে কাতার ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি পরিশোধ করেছে। আর এই অর্থ লেনদেনে জড়িত ছিলেন এমন সব ব্যক্তি ও গোষ্ঠী যারা যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সন্ত্রাসী। এদের একটি ইরাকের কাতাইব হেজবুল্লাহ। এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটি রাস্তায় বোমা পুঁতে রেখে মার্কিন সেনা হত্যা করেছিল। তাদের সঙ্গে অপহরণের ওই ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছিলেন ইরানের রেভ্যুলেশনারি গার্ডের কুদস ফোর্সের জেনারেল কাশেম সোলেইমানি। ব্যক্তিগতভাবে তার ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অপহরণের ঘটনা সমাধানের প্রক্রিয়ায় আসে আরেকটি সন্ত্রাসী সংগঠনের নাম: হায়াৎ তাহরির আল শাম। এই গোষ্ঠীটি সিরিয়াতে জঙ্গি সংগঠন আল কায়েদার শাখা হিসেবে কাজ করত। তখন তাদের নাম ছিল আল নুসরা ফ্রন্ট।

অপহরণের ঘটনা ঘটার পর বেশ কয়েক মাস অপহৃতদের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। ২০১৬ সালের মার্চ মাসে কাতারা নিশ্চিত হয়, অপহরণকারীরা ইরান সমর্থিত কাতাইব হেজবুল্লাহ (আল্লাহর ব্রিগেডের দল) নামে পরিচিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য। তারা কাতারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করে। সে সময় ইরাকে নিযুক্ত কাতরের রাষ্ট্রদূত জায়েদ আল খায়ারিন ততদিনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে যাওয়া শেইখ মোহাম্মেদ বিন আব্দুলরাহমান আল থানিকে জানান: ‘আমি তাদেরকে বলেছি, ১৪ জনকে ফেরত দিলে আমরা অর্ধেক অর্থ দিয়ে দেবো।’ বিবিসি জানিয়েছে অর্থের পরিমাণ কত তা সেখান থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

অপহরণকারীদের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা অনুযায়ী রাষ্ট্রদূত তিনবার অপহৃতদের ফেরত পাওয়ার আশা নিয়ে বাগদাদ গিয়েও ব্যর্থ হন। চতুর্থবার অপহরণকারীরা পেন ড্রাইভে অপহৃত একজন ব্যক্তির ভিডিও দেয়। ওই ভিডিওর বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আল থানি রাষ্ট্রদূতকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘এর কি নিশ্চয়তা আছে যে বাকিরাও ওর সঙ্গে আছে? ভিডিওটি ফোন থেকে মুছে ফেলুন, যেন ফাঁস না হয়ে যায়।’ রাষ্ট্রদূত খায়ারিন সম্মতি জানান।
অপহরণকারীরা মুক্তিপণের অর্থ দাবি করেছিল। আর কাতারের তা দেওয়ার সামর্থও ছিল। কিন্তু ফাঁস হওয়া নথি থেকে বিবিসি জেনেছে, ওই সময় অপহরণকারীরা তাদের দাবি নিয়ে অস্থিরতায় ভুগছিল। একবার তারা অর্থ দাবি করছিল। পরে আবার তারা কাতারকে ইয়েমেনে শিয়াদের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের পরিচালিত যুদ্ধ থেকে দূরে সরে যাওয়ার শর্ত দিচ্ছিল। পরে তারা দাবি করেছিল, সিরিয়ায় বিদ্রোহীরা যেসব শিয়াদের বন্দি করে রেখেছিল, তাদেরকে ছাড়িয়ে আনতে হবে। পরে আবার তারা অর্থ দাবি করে। এর মধ্যে আবার একজন মধ্যস্থতাকারী কাতারের রাষ্ট্রদূতের কাছে নিজের জন্য আলাদা করে ১ কোটি ডলার চেয়ে বসে। কাতারের রাষ্ট্রদূত এ বিষয়ে মন্তব্য করেছেন, ‘আমি তাকে লেবাননে একটি ফ্ল্যাট কিনে দেওয়ারও আশ্বাস দিয়েছিলাম, যাতে সে অনুপ্রাণিত হয়।’ রাষ্ট্রদূত যে দুইজন মধ্যস্থতাকারীর সহায়তা নিচ্ছিলেন তারা কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন। সেখানে তারা সেখানে তারা মন্ত্রীর কাছে ১ লাখ ৫০ হাজার ডলার এবং ৫টি রোলেক্স ঘড়ি উপহার হিসেবে দাবি করে!

২০১৬ সালের এপ্রিল নাগাদ এ ঘটনায় যুক্ত হন ইরানি সেনাবাহিনীর আল কুদস ফোর্সের জেনারেল কাসেম সোলাইমানি। তিনি কাতাইব হেজবুল্লাহর ইরানি পৃষ্ঠপোষক। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিপণের পরিমাণ শত কোটি ডলারে গিয়ে ঠেকে। এমন কি অপহরণকারীরা তার চেয়েও বেশি অর্থ দাবি করা শুরু করে। সোলাইমানির যুক্ত হওয়ার বিষয়ে রাষ্ট্রদূত পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে জানান, ‘সোলাইমানি গতকাল অপহরণকারীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং তাদেরকে ১০০ কোটি ডলারেই রাজি হতে বলেছেন।’ ইরানি জেনারেলের বিষয়ে রাষ্ট্রদূত আরও জানিয়েছিলেন, কাশেম সোলাইমানি অপহরণকারীদের আচরণে অত্যন্ত হতাশ। কারণ তারা ওই অর্থে সন্তুষ্ট হচ্ছিল না।

এরপর আরও কয়েক মাস পার হয়ে যায়। ২০১৬ সালের নভেম্বরে নতুন প্রস্তাব নিয়ে আসেন জেনারেল কাসেম সোলাইমানি। ওই সময় সিরিয়াতে দুইটি সুন্নি অধ্যুষিত শহর সিরিয়ার সরকারি বাহিনী ঘিরে রেখেছিল। আর ইরান সহায়তা করছিল সিরিয়ার আসাদ বাহিনীকে। অপরদিকে সিরিয়ার দুইটি শিয়া অধ্যুষিত শহর ঘিরে রেখেছিল সালাফি বিদ্রোহীরা, যাদেরকে কাতার সমর্থিত হিসেবে উল্লেখ করা হতো। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, তারা আল নুসরা ফ্রন্টের সাবেক সদস্য। এই চার শহর নিয়ে একটি চুক্তি বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছিল তখন, যাতে চার শহর থেকে নাগরিকদের নিরাপদে বের করে নিয়ে আসা যায়। সোলাইমানি চাইছিলেন, কাতার যেন চার শহরের বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে করা চুক্তিটি বাস্তবায়নে সহায়তা করে। রাষ্ট্রদূতের খায়ারিনের ভাষ্য, ওই সময় সোলাইমানি কাতাইব হেজবুল্লাহকে বলেছিলেন, ‘যদি চার শহরের ওই চুক্তির মাধ্যমে শিয়াদের প্রাণ রক্ষা হয় তাহলে অর্থ দাবি করা অপমানজনক বিষয় হবে।’

পরবর্তীতে ওই চার শহর থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার চুক্তিটি বাস্তবায়ন করা হয়। সেখানে উপস্থিত থেকে নাগ্রিকদেরনিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি তদারকি করেছিলেন কাতার সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা কর্মকর্তা জসিম বিন ফাহাদ আল থানি। শিয়াদের মুক্ত করে এক স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়, যাতে তাদের সঙ্গে শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে অপহৃত কাতারিদের বিনিময় করা যায়। কাতার এয়ারওয়েজের একটি বিমান বাগদাদে গিয়ে পৌঁছায় অর্থ নিয়ে। ২০১৭ সালের এপ্রিলে অপহৃতরা মুক্তি পান।
কাতারের প্রতি বৈরি যে রাষ্ট্রটি বিবিসির হাতে ওই ভয়েস মেইল ও কথোপকথনের রেকর্ড তুলে দিয়েছে, তাদের দাবি শেষ পর্যন্ত কাতার মূল ১০০ কোটি ডলার ও সঙ্গে আরও ১৫ কোটি ডলার দিয়েছিল অপহরণকারীদের। কাতারের সরকারি সূত্র কোনও সংখ্যা নির্দিষ্ট না করে স্বীকার করেছে, তারা বড় অঙ্কের অর্থ পাঠিয়েছিল ইরাকে। তবে তা সামরিক সহযোগিতা ও ইরাকের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য দেওয়া। কাতারের ভাষ্য, ‘আমরা চেয়েছিলাম অপহৃতদের মুক্তি ও নিরাপত্তার জন্য ইরাক সরকার দায়িত্ব নিক।’
কিন্তু বিমানে পাঠানো ওই অর্থ নিয়েও দেখা দেয় জটিলতা। কাতারের ভাষ্য, ‘ওই অর্থ যখন ইরাকে পৌঁছায় তখন পোশাকে পরিচয়সূচক কোনও চিহ্ন ছাড়া একদল সেনা সদস্য ওই অর্থের নিয়ন্ত্রণ বুঝে নেয়। তারা কারা, কাতার তা জানত না। কাতার মনে করেছিল, নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেওয়ার ওই ঘটনা কার্যকর করেছেন ইরাকের প্রধান হায়দার আল আবাদি। কাতারের পক্ষ থেকে তাকে তখন ফোন করা হয়। কিতু তাকে পাওয়া যায়নি। পরে অবশ্য সংবাদ সম্মেলনে আবাদি কাতারের পাঠানো অর্থের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কথা নিশ্চিত করেছিলেন।
২০১৭ সালের ২১ এপ্রিল ওই অপহৃতরা মুক্তি পান। কিন্তু কিভাবে? তা কি সিরিয়ায় উদ্ধারকৃত শিয়াদের বিনিময়ের মাধ্যমে? নাকি মুক্তিপণের বিনিময়ে? না কি দুটোই কাজ করেছে একই সঙ্গে? কাতারের দাবি তারা অপহরণকারীদের কোনও অর্থ দেয়নি। তারা ইরাককে অর্থ দিয়েছে। অন্যদিকে কাতারের প্রতি বৈরি রাষ্ট্রটি বিবিসির কাছে দাবি করেছে, কাতার সন্ত্রাসের অভিযোগে অভিযুক্ত সশস্ত্র সংগঠনকে অর্থায়ন করেছে মুক্তিপণের ১০০ কোটি ডলার দেওয়ার মাধ্যমে। শুধু এবারই নয়, কাতারের আগের আমিরও অপহরণের জড়িত কাতাইব হেজবুল্লাহকে অর্থ দিয়েছিলেন। একটি ফোনকলের রেকর্ডে রাষ্ট্রদূত খায়ারিনকে বলতে শোনা গেছে, ‘আপনাদের উচিত কাতারকে সহায়তা করা। আপনারা জানেন কাতার আপনাদের জন্য কত কি করেছে। আমিরের বাবা আপনাদের জন্য অনেক কিছু করেছেন। এমন কি একসময় ৫ কোটি ডলারও দিয়েছিলেন। দক্ষিণে অবকাঠামো গড়ে দিয়েছিলেন। তিনিই প্রথম পরিদর্শনে গিয়েছিলেন।’ বিবিসি খোঁজ নিয়ে জেনেছে, আসলেই কাতারের আমিরের বাবা কাতাইব হেজবুল্লাহকে ৫ কোটি ডলার দিয়েছিলেন এক সময়। কাতারের কর্মকর্তা বিবিসির কাছে স্বীকার করেছেন, ফাঁস হওয়া ওই বর্ণনা সঠিক। তবে এর কিছু অংশ ইচ্ছাকৃভাবে বিকৃত করা হয়েছে।

এটা যদি প্রমাণ করা যায়, কাতার যুক্তরাষ্ট্রের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী সংগঠনকে ১০০ কোটি ডলার দিয়েছিল, তাহলে সৌদি জোটের পক্ষে দেশটির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখার সুযোগ প্রশস্ত হবে। বাংলা ট্রিবিউন।

 

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ