প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রাত্রির যাত্রী-এক অনন্য যাত্রাগাঁথা এবং একজন নির্মাতার স্বপ্ন

ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ তারেক: দিনের আলো ফুরিয়ে এলে দেখা মেলে রাত্রির। রাত্রি কখনো হয় উৎসবে রঙিন, কখনোবা বিষাদে মলিন। মানব জীবনের অদেখা ভূবনের দেখা মেলে রাতের আঁধারে। তেমন এক রাতের গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে এক অনন্য সৃষ্টি। যার নাম, ‘রাত্রির যাত্রী’। এটি একটি চলচ্চিত্র। তারচেয়েও বড় কথা এটি একজন নারীর জীবনের একটি রাতের গল্প। একটি রাত্রিকে সিনেমায় ফুটিয়ে তোলা চাট্টিখানি কথা নয়। সে কাজটিই সুনিপুণ দক্ষতায় করেছেন একজন পরিচালক। তার পরিচয় দেয়ার আগে কিছু কথা বলে নেয়া দরকার।

আমাদের দেশে একসময় বিটিভিতে বিভিন্ন ইংরেজি টিভি সিরিজ দেখাত। সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যান, ম্যাকগাইভার, দ্য এ টিম, দ্য এক্স ফাইলস ইত্যাদি। এসব সিরিজ দেখে অনেকের মনে হয়তো প্রশ্ন জাগতো আমাদের দেশে এমনকিছু করা সম্ভব কি না। সে সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপদান করেছিলেন তিনি। তিনিই প্রথম আমাদের টেলিভিশন জগতে গোয়েন্দা ধারাবাহিক নির্মাণ করেন। যার নাম ছিল ‘গোয়েন্দা কাহিনী’। এটিএন বাংলার শুরুর দিকে ২৬ পর্বের এ ধারাবাহিক বাংলা নাটকের দর্শককে নতুন ধারার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। ড্রয়িংরুমের বাইরেও যে নাটক হতে পারে সে ধারণা দিয়েছিলেন তিনি। তার হাত ধরেই বাংলাদেশ পুলিশের নাটকে সম্পৃক্ততা শুরু হয়। টনি ডায়েস, সমু চৌধুরী অভিনীত সে নাটক বাংলা নাটকের ইতিহাসে এক কালজয়ী অধ্যায়। তাকেই ধরা হয় বাংলা নাটকের থ্রিলার জনরার রূপকার। প্যাকেজ নাটকের শুরুর দিকে সুস্থ ধারার কিছু নাটক নির্মাণ করে তিনি দর্শকের নজরে এসেছিলেন। আরো কটি থ্রিলার তিনি দর্শককে উপহার দিয়েছিলেন, সেগুলো হল দ্য নিউ ফাইল, একটি গোয়েন্দা গল্প, শাদা রঙ ইত্যাদি।

পাঠক আপনি যদি নব্বই দশকের বাংলা নাটকের হালচালের খবরাখবর রেখে থাকেন তাহলে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন কার কথা বলছি। ঠিক ধরেছেন, বলছিলাম সুনির্মাতা হাবিবুল ইসলাম হাবিবের কথা। তিনি এমন একজন সংস্কৃতিপ্রেমী যিনি নিজের মেধার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটিয়েছেন তার কর্মে। তিনি কি নন। একাধারে নাট্য নির্মাতা, চলচ্চিত্র পরিচালক, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রপথিক তিনি। তিনি একজন স্বপ্নবাজ ব্যক্তি, যিনি স্বপ্ন দেখতে ভালবাসেন, স্বপ্ন দেখাতে ভালবাসেন।

হাবিবুল ইসলাম হাবিব তার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যাত্রা শুরু করেন ‘প্রেক্ষাপট’ নাট্যদল দিয়ে। তিনি বহুল আলোচিত কিছু মঞ্চনাটক পরিচালনা করেছিলেন। যেসব নাটক দর্শকের মন ছুঁয়ে গেছে অবলিলায়। তার নির্মিত মঞ্চনাটকগুলো হলো- ইদানিং তিনি ভদ্রলোক, খাঁটি মীর জাফরের বাচ্চা, ব্যারিকেড চারিদিক, সারাদিন পর, উল্টারাত পাল্টাদিন প্রভৃতি। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক ইদানিং তিনি ভদ্রলোক তৎকালীন সময়ে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। বিশেষ করে আশির দশকের বৈরী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক মঞ্চস্থ করাটা ছিল বেশ কঠিন কাজ। সে কাজটিই করে দেখিয়েছিলেন হাবিবুল ইসলাম হাবিব।

মঞ্চের মানুষ হাবিবুল ইসলাম হাবিব স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রেও নাম লিখিয়ে ফেললেন নির্মাতারূপে। নির্মাণ করলেন দুটো চলচ্চিত্র, ‘বখাটে’ ও ‘বিজয় নব্বই’। ১৯৮৭ সালের সামাজিক প্রেক্ষাপটে নির্মাণ করলেন ‘বখাটে’। অন্যদিকে ১৯৯১ সালে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন নিয়ে নির্মিত হলো ‘বিজয় নব্বই’। এ দুটো স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তার অভিজ্ঞতার ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণে। ‘বিজয় নব্বই’ – এর প্রথম প্রদর্শনী হয়েছিল শিল্পকলা একাডেমিতে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রয়াত রাজনৈতিক ব্যক্তি আবদুস সামাদ আজাদ, তৎকালীন শীর্ষ দৈনিকের প্রথিতযশা সাংবাদিকবৃন্দ। আরো উপস্থিত ছিলেন বর্তমান সরকারের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে প্রাণ হারানো ডাক্তার মিলনের স্ত্রী কবিতাও উপস্থিত ছিলেন এ প্রদর্শনীতে। দেশের সকল জাতীয় দৈনিকে শিরোনাম হয়েছিল এ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি। এ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দিয়ে চলচ্চিত্রে পা রাখেন বিশিষ্ট অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচী।

হাবিবুল ইসলাম হাবিব গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দেশের একমাত্র চ্যানেল বিটিভিতে প্যাকেজ অনুষ্ঠান নির্মাণের যে প্রচলন সৃষ্টি হয়েছিল সে আন্দোলনের অন্যতম অগ্রপথিক ছিলেন এ নির্মাতা। শুধু তাই নয়, তিনি সম্মিলিত জোট গঠনের আন্দোলন, শর্ট ফিল্ম মুভমেন্টসহ বিবিধ সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম সদস্য ছিলেন।

এ নিভৃতচারী নির্মাতার হাতে নির্মিত হয় পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে নাটক, বাংলাদেশ সেনা বাহিনীকে নিয়ে থিম সং ও টিভি ফিলার। চলচ্চিত্র, মঞ্চ ও টিভিতে তার সান্নিধ্যে এসে অনেকেই সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। উজ্জ্বল করেছেন দেশের শিল্প-সংস্কৃতি পরিম-লকে, বৃদ্ধি করেছেন দেশের সুনাম।
হাবিবুল ইসলাম হাবিবের আরেকটি পরিচয় আছে। তিনি এ প্রজন্মের জনপ্রিয় অভিনেত্রী আশনা হাবিব ভাবনার পিতা। বাবার হাত ধরেই মিডিয়ায় এসেছেন ভাবনা।

বর্তমানে হাবিবুল ইসলাম হাবিব তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘রাত্রির যাত্রী’ নিয়ে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। এতে অভিনয় করেছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী প্রিয়দর্শিনী মৌসুমী, আনিসুর রহমান মিলনসহ অনেকে। শিগগিরই দর্শকের জন্য নতুন ভাবনার সিনেমাটি নিয়ে আসছেন তিনি। আমাদের ধারাবাহিক এ প্রতিবেদনে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হবে ‘রাত্রির যাত্রী’ চলচ্চিত্র নির্মাণের না জানা নানা অধ্যায়।

লেখক পরিচিতি: সহকারী অধ্যাপক, ইইটিই বিভাগ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ