প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শিক্ষার নামে শিশুদের শৈশব কেড়ে নিচ্ছি নাতো?

ডেস্ক রিপোর্ট : স্কুল কলেজ পর্যায়ে প্রতিযোগিতামূলক পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে অনেক আলোচনা, সমালোচনা হয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণির প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার খবরও আমরা জানি, যা আমরা নিকট অতীতে কখনো কল্পনা করিনি। ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র শুধু ছাত্রছাত্রীরা নয়, অভিভাবকদের একটি অংশও আগ্রহ নিয়ে সংগ্রহ করে থাকেন। কেন বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে? প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য দায়ী কে? ছাত্রছাত্রী? অভিভাবক? শিক্ষক? কোচিং সেন্টার? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান? নাকি শিক্ষা পদ্ধতি ও এর ব্যবস্থাপনা?

আমরা প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষা পদ্ধতি, জিপিএ ফাইভ আর গোন্ডেন জিপিএ নিয়ে যতটুকু আলোচনা করছি, শিশুদের শৈশব, শিশুদের অবসর, পরিবারের সাথে শিশুদের সময় কাটানোর অধিকার নিয়ে কতটুকু আলোচনা করছি বা ভাবছি?

আমাদের সময়ে গ্রামাঞ্চলের ছাত্রছাত্রীদের বয়স শহর এলাকার ছাত্রছাত্রীদের তুলনায় একটু বেশি হতো। গ্রামের ছেলেমেয়েরা সাধারণত ৬ থেকে ৭ বছরে স্কুলে যাওয়া শুরু করতো বলে কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে এসে শহর আর গ্রামের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বয়সে কিছুটা তারতম্য প্রত্যক্ষ করতাম। বর্তমানে এর ঠিক উল্টোটা লক্ষ্য করা যায়। গ্রামাঞ্চলের ছাত্রছাত্রীদের তুলনায় শহর অঞ্চলের ছাত্রছাত্রীরা এখন বেশ পরে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়। কারণ বর্তমানে শহরাঞ্চলের ছাত্রছাত্রীদেরকে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির আগে প্লে, নার্সারি আর কেজি নামে তিন তিনটি ধাপ পেরোতো হয় (বেসরকারি আর কিছুটা ‘ভাল’ স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে)। যেখানে গ্রামের ছেলেমেয়েদেরকে প্রাক-প্রাথমিকে সর্বোচ্চ এক বছর থাকতে হয়।

যতদূর মনে পড়ে, আমাদের সময়ে প্রথম শ্রেণিতে পড়ালেখার চাইতে স্কুল মাঠে খেলাধুলা, নতুন নতুন পাড়ার ছেলেমেয়েদের সাথে বন্ধুত্ব আর বাংলাসহ অন্যান্য জনগোষ্ঠীর (পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রেক্ষাপটে একজন আদিবাসী শিক্ষার্থীকে নিজ জনগোষ্ঠীর ভাষা ছাড়াও বাংলা-সহ অন্যান্য আদিবাসী ভাষা শিখতে হয় শিক্ষা জীবনের শুরুতে) ভাষা শেখার কাজই বেশি হয়েছে। এখন প্লে গ্রুপের শিক্ষার্থীকে সপ্তাহে সপ্তাহে ক্লাস টেস্ট দিতে হয়; শুধু তা নয়, রীতিমতো প্রশ্নপত্র তৈরি করেও তাদের পরীক্ষা নেয়া হয়। শ্রেণিটির নাম প্লে হলেও এখানে কোন প্লে (খেলাধুলা) থাকছে না, থাকছে শূন্যস্থান পূরণ কর, আগে ও পরের সংখ্যা লিখ ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের সময়ে আমরা যে ছড়া, কবিতাটি তৃতীয় কিংবা চতুর্থ শ্রেণিতে পড়েছি তা এখন প্লে, নার্সারিতে পড়ানো হয়। আরো মজার বিষয় হলো, এখন শহরে প্লে গ্রুপের ছেলেমেয়েদেরকে লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি মৌখিক পরীক্ষারও মুখোমুখি হতে হয়।

প্লে গ্রুপের ছাত্রছাত্রীদেরকে পরীক্ষার নম্বর দেওয়া হয় ঠিক জেএসসি বা এসএসসি পরীক্ষার ন্যায় গ্রেডিং পদ্ধতিতে এ+, এ- কিংবা এফ অর্থাৎ ফেল বা অকৃতকার্য। বর্তমানে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে পড়ালেখা করতে গেলেও পাস-ফেলের মোকাবেলা করতে হয়। কোন বিষয়ে ফেল করলে অভিভাবকদের ডেকে পাঠানো হয়। অভিভাবকরাও একে অপরের দেখাদেখি ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা নিয়ে অধিক মনোযোগী হয়ে পড়েন। শুরু হয় শিশুর গৃহবন্দী জীবন। গৃহশিক্ষক সংগ্রহের আয়োজনও শুরু হয় এই প্লে থেকে। শিশুটির সারাদিনের সময় ভাগ হতে হতে আর কোনকিছুই বাকি থাকে না। দিনটি শুরু হয় সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা খেয়ে না খেয়ে স্কুলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। স্কুল থেকে ফিরে এসে ভাত খেয়ে উঠতে না উঠতে গৃহশিক্ষক হাজির হয় নয়ত দুপুরে ঘুমোতে যাওয়ার চাপ থাকে। এভাবে সন্ধ্যা নামে। মা বাবারা অফিস থেকে ফিরে বাড়ির কাজ আছে কিনা দেখে, গৃহশিক্ষক কী পড়িয়েছে তা দেখে আবার পড়তে যেতে বলা হয় বা পড়তে দেওয়া হয়। রাতের ভাত খেয়ে সোজা ঘুমোতে যায়। এইভাবে সকালে উঠে আবার স্কুলের জন্য তৈরি হয়।

দেখা যায় শিশুটির প্লে থেকে তার শৈশবের সমস্ত সময় স্কুলের জন্য, বর্তমানে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য ব্যয় করতে হয়। বেড়ে উঠতে গিয়ে শিশুর যে খেলাধুলা দরকার, আত্মীয়, বন্ধু বান্ধবদের সাথে সম্পর্ক তৈরি করা দরকার, পরিবেশ-প্রতিবেশ সম্পর্কে ধারণা লাভের প্রয়োজন তার কোনটিই আর হয়ে ওঠে না।

প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতি বা প্রতিযোগিতা শিশুর সমস্ত শৈশব কেড়ে নিচ্ছে। সাপ্তাহিক দিনগুলোতেও অবসর থাকে না। সাপ্তাহিক ছুটিতে এক গাদা বাড়ির কাজ দেওয়া হয়। অভিভাবকদের ছেলেমেয়েকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ নেই। স্কুলের ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে শিশুকে দিনের পর দিন বাড়ির চার দেয়ালের মধ্যে নয়তো স্কুলের চার দেয়ালের মধ্যে বন্দী থাকতে হচ্ছে।

রমজান মাসে স্কুলগুলোতে একটা লম্বা ছুটি থাকে। কিন্তু স্কুলগুলো বন্ধ থাকলেও শিশুদের পড়ালেখা বন্ধ থাকে না। প্লে, নার্সারি আর কেজি স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের যে পরিমাণ বাড়ির কাজ দেওয়া হয়ে থাকে তা শিশুদের জন্য স্কুল বন্ধ থাকা না থাকার সমান। তাই নামে ছুটি হলেও কতটি স্কুল শিশুদের ছুটি দিয়ে থাকেন তা গবেষণার বিষয় হয়ে উঠতে পারে। দেখা যায়, রমজান মাসের ছুটির পর পরই শুরু হয়ে যায় ক্লাস টেস্ট আর দ্বিতীয় সাময়িকের নামে রীতিমতো প্রশ্নপত্র দিয়ে উত্তরপত্র লেখার প্রতিযোগিতা।

অল্প বয়সে ছেলেমেয়েরা ইংরেজি, বাংলা আর গণিতের প্রাথমিক ধারণার চাইতে আরো বেশি কিছু শিখে ফেলছে বলে অনেক অভিভাবককে দেখে খুশি বলেই মনে হয়। কিন্তু শিশুদের আমরা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় শেখাচ্ছি নাকি অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় শেখানো হচ্ছে তা ভাবছি না। প্লে, নার্সারির ছেলেমেয়েরা এ+ পেলে অভিভাবকদেরকে খুশিতে ফেসবুকে পোস্ট দিতে দেখা যায়। আমরা কি ভেবে দেখেছি এই এ+ দিয়ে তারা আগামীতে কী করবে? আমার পরিচিত একজন ছাত্র ঢাকার নামী স্কুল ও কলেজ থেকে জিপিএ ফাইভ পেয়েও কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারেনি, অপরদিকে গ্রাম থেকে পাশ করে আসা একজন ছাত্রকে দেখেছি বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে।

আবার পরীক্ষায় প্লে, নার্সারির শিশুদেরকে ফেল করিয়ে দিতেও দেখা যায়। শিক্ষা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হতে না হতে ফেল বা অকৃতকার্যও হতে হয়। শিশুদের এফ দিয়ে অকৃতকার্য দেখানোর ফলে, শিশুদের ওপর শিক্ষকরা কত পরিমাণে চাপ সৃষ্টি করছেন তা কি শিক্ষকরা উপলব্ধি করতে পারেন? একটু উপরের ক্লাসে গেলে দেখা যাবে সেখানেও সাপ্তাহিক ছুটিতেও ছুটি নেই। সাপ্তাহিক ছুটিতে অনেক স্কুল বাড়তি ক্লাসের আয়োজন করেন কিংবা স্কুল বন্ধের দিনগুলোতে কোচিং করানো হয়, যাতে স্কুলের কোন ছাত্র বা ছাত্রী ‘এফ’ না পায়। সবাইকে পাস করানোর নানা আয়োজন চলে (ভর্তির আগে স্কুলগুলো পোস্টার, ব্যানার দেয় ১০০% পাস বলে)। এই সব আয়োজনের মূলে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির ‘নাম’ কামানো। আর স্কুলটি ‘গৌরব’ অর্জন করতে গিয়ে সকল চাপ দেওয়া হয় শিশুদের ওপর।

আমাদের স্কুলগুলো ‘স্কুলবান্ধব শিশু’ প্রত্যাশা করে। কিন্তু স্কুলগুলো শিশুবান্ধব হয় না, হতে চায় না, হওয়ার পরিকল্পনাও দেখা যায় না। আমরা জানি, জোর করে মুখস্ত আর চাপিয়ে দেওয়া শিক্ষা কোনভাবেই জীবনমুখী, টেকসই আর শিশুবান্ধব হতে পারে না।

ব্যক্তি বা গোষ্ঠি উদ্যোগে গড়ে উঠা বিদ্যালয়গুলোতে কী পড়ানো হয়, কয়টি বই পড়ানো হয়, সিলেবাসটি শিশুদের উপযোগী কিনা, স্কুল কমিটিসহ শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ আছে কিনা তা দেখার কেউ নেই। আমরা অভিভাবকরাও এই প্রতিযোগিতায় সামিল হয়েছি। ছেলেমেয়েদেরকে এ প্রতিযোগিতায় সফল করতে সবকিছু দিয়ে নেমেছি। শিশুর মানসিক বিকাশ, সাংস্কৃতিক বিকাশ, শারীরিক বিকাশের দিকে না তাকিয়ে লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিয়েছি জিপিএ ফাইভ।

অন্যদিকে শহরে যেটুকু খালি মাঠ রয়েছে তাও নানাভাবে দখল হয়ে যাচ্ছে। আর যেগুলো দখল হতে বাকি আছে দেখা যাবে সেখানে সপ্তাহে সপ্তাহে খুচরা ব্যবসায়ীদের দ্বারা মেলা বসানো হচ্ছে নিয়মিতভাবে। ফলে একদিকে শিশু কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে অন্যদিকে সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত প্রয়োজনীয়- অপ্রয়োজনীয় পড়াগুলো পড়তে গিয়ে হাতে পাওয়া অবসর সময়টুকুতে তাদেরকে বাজারের খেলনার ওপর নির্ভরতার পাশাপাশি বিনোদন হিসেবে শপিং মলে ঘুরাঘুরিতে সীমাবদ্ধ থাকতে হচ্ছে।

শিক্ষা পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন না হলে শিশুদের শৈশব ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব হবে না। তাই আমাদেরকে চাপিয়ে দেওয়া সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ২০১০ সালের শিক্ষানীতিতে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার কথা বলা না থাকলেও আমরা আমাদের বিশ্বাসকে চাপিয়ে দিয়েছি শিশুদের ওপর। এইক্ষেত্রে শিশুরা যেমনি অসহায়, অভিভাবকরাও অনেকটা বাধ্য। আর এই সুযোগে অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিজেদের ‘নাম’ ‘সুনাম’ ধরে রাখতে শিশুদের ওপর চাপ সৃষ্টির পাশাপাশি অর্থ উর্পাজন করছে।

এই অসুস্থ শিক্ষা ব্যবস্থাপনার বিষয়টি আমাদের সকলকে উপলব্ধি করা জরুরী। শিশুদের শৈশব আনন্দময় করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। এটি তাদের অধিকারও। শিশুদের শৈশব আনন্দময় হলেই কেবল আগামীর বাংলাদেশও আনন্দময় হয়ে ওঠবে।
সূত্র : চ্যানেল আই অনলাইন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ