প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরা ও আগামী নির্বাচন

স্বদেশ রায় : সম্প্রতি মালয়েশিয়ান এক গবেষকের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানতে চান, কবে থেকে রোহিঙ্গারা আবার তাদের নিজ দেশে ফিরতে পারবেন? আমাকে এ প্রশ্ন করার কারণ হিসেবে বলেন, শ্রীলঙ্কা গার্ডিয়ানে আমার একটি লেখার ভেতর তিনি রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার বিষয়টির একটা ইতিবাচক ইঙ্গিত পেয়েছেন। তিনি আরও জানতে চান, ফিরে যাওয়ার পরিস্থিতি দ্রুত সৃষ্টি হওয়ার কোন সম্ভাবনা আছে কিনা? ভদ্রলোক গবেষক, রোহিঙ্গাদের ওপর তাঁর অনেক পড়াশোনা, পড়াশোনা এশিয়ার রাজনীতি নিয়েও। তাই স্বাভাবিকই তিনি এ বিষয়গুলো আমার থেকে বেশি জানেন। তবে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানের এ্যানালিসিস অনুযায়ী আমি তাকে বলি, বাস্তবে আগামী ডিসেম্বর অবধি রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি কোন কাজ হবে না, যেহেতু আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে নির্বাচন। ভদ্রলোক খুব অবাক নন, তবে একটু বিস্ময়ের সঙ্গে জিজ্ঞেস করেন, বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার বিষয়টি জড়াবে কেন? উত্তরে তাকে এমনই বলি, বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনের পরে চীন ও ভারত সিদ্ধান্ত নেবে রোহিঙ্গাদের নিয়ে তারা কোন্ পথে হাঁটবে? রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে এশিয়ার অন্যান্য দেশ ও পশ্চিমারা যতই চাপ দিক না কেন তাতে কোন কাজ হবে না। যতক্ষণ অবধি মিয়ানমারের অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যের মূল মালিক চীন কোন জোরালো সিদ্ধান্ত না নেবে এবং তার সঙ্গে ভারত সহযোগিতা না করবে ততক্ষণ রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার পথ খুলবে না। আর চীনের এই সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনের ভেতর দিয়ে কোন সরকার আসে তার ওপর।

বাংলাদেশে যদি আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার জোট ক্ষমতায় আসে তাহলে তখন রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার বিষয়টি জোরদার হবে। কারণ, আগামী নির্বাচনের ভেতর দিয়ে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশের ইসলামিক মৌলবাদীদের আশ্রয়দাতা রাজনৈতিক দল- বাংলাদেশ ন্যাশনালিষ্ট পার্টি (বিএনপি) একেবারেই নামকাওয়াস্তে একটি রাজনৈতিক দল হয়ে যাবে। তখন একটা বিষয় নিশ্চিত হবে, খালেদা ও তারেক আর বিএনপির নেতৃত্বে ফিরতে পারছেন না। এ অবস্থায় নতুন প্রজন্ম বিএনপির ভেতর আর কোন আশা ভরসা দেখবে না। ব্যবসায়ী কমিউনিটি যারা এখনও অবধি বিএনপিকে সহায়তা করে যাচ্ছেন তারাও তখন হাত গুটিয়ে নেবেন। অন্যদিকে বিএনপির নেতা-কর্মীরাও হতাশ হয়ে পড়বেন। বিএনপির এই বাস্তবতায় বাংলাদেশে তখন রাজনীতি ভিন্নপথে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। যেহেতু শেখ হাসিনার নেতৃত্বের জোটের মতামতের বাইরেও সমাজে ভিন্নমত আছে (তবে সেটা ইসলামিক মৌলবাদ নয়, প্রগতিশীল কিছু) সেহেতু স্বাভাবিকই নতুন প্রজন্মের একাংশ নতুন রাজনীতি নিয়ে আবির্ভূত হতে পারে। এটাই স্বাভাবিক। আর ভিন্ন মতের ওই নতুন রাজনৈতিক দলটি যেহেতু বিএনপির মতো কোন অশুভ শক্তি হবে না, ফলে বাংলাদেশে তখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক স্থিতিশীলতা আসবে। সেক্ষেত্রে তখন চীন, ভারত, মিয়ানমার ও বাংলাদেশকে কানেক্ট করে অর্থনীতির গতি বাড়ানোর চেষ্টা করবে চীন। ওই সময়ে চীন ও ভারতের মধ্যে একটা স্থায়ুযুদ্ধ থাকবে তাতে বাংলাদেশের কোন ক্ষতি হবে না। বরং বাংলাদেশ বৃহত্তর পর্যায়ের অর্থনীতির একটি সুবর্ণ ভূমি হবে। যুক্ত হবে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সঙ্গে। এ ধরনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সময়- যে কোন অর্থনীতির জন্য রিফিউজি একটি বড় সমস্যা। এ কারণে মিয়ানমারের অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যর সঙ্গে বাংলাদেশকে যোগ করার বিষয়ে চীন অগ্রসর হলে তখনই রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান করতে হবে তাদের নিজ গরজে। এজন্য তারা সুচিকেও সেখানে ক্ষমতায় রাখবে। কারণ, সুচি এই সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারের সামরিক জান্তাদের থেকে বেশি কার্যকর হবেন। তিনি সামরিক জান্তাদের তুলনায় অনেকটা নমনীয়ও।

অন্যদিকে চীন যে ঢালাও অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যের পথে হাঁটছে মিয়ানমারে তা যাচাই-বাছাই না করে সবটুকু নিয়ে যাতে বাংলাদেশে না ঢুকতে পারে, অর্থাৎ বাংলাদেশের কোন অংশ লাওস বা শ্রীলঙ্কার কোন কোন এলাকার মতো চীনের অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যের অংশ না হয়ে যায়Ñ এ বিষয়ে নজর রাখা ভারতের নিজের স্বার্থে অনেক বেশি দরকার। চীন কোনভাবে বাংলাদেশে লাওস বা শ্রীলঙ্কার মতো অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য গড়ুক সেটা যেমন শেষ বিচারে বাংলাদেশের জন্য ভাল নয়, তেমনি ভারতের জন্য নয়। তবে ভারত তার আগের পররাষ্ট্রনীতি অনেকখানি ত্যাগ করাতে এখানে ভারত ও চীনের ভেতর একটা সমঝোতা থাকবে। অন্যদিকে বাংলাদেশে এমন একজন রাষ্ট্রনায়ক থাকতে হবে, যিনি চীনের বিনিয়োগ নেবেন তবে অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য গড়তে সুযোগ দেবেন না। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কানেকটিভিটি হবে ঠিকই, তবে সেখানে বাংলাদেশ ও ভারত উভয়েই সমান সুযোগ পাবে। চীনও চাইবে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক এমন থাকুক। কারণ, লাওস, মিয়ানমার বা শ্রীলঙ্কায় চীন যেভাবে অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য স্থাপন করেছে এটা বাংলাদেশে সম্ভব নয়Ñ এটাও চীন এতদিনে বুঝে গেছে। বাংলাদেশের জনগণ আর্গুমেনটেটিভ, মোটেই রেজিমেন্টাল নয়। এখানে কোন ধরনের সাম্রাজ্য গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এজন্য চীনও চাইবে বাংলাদেশে লাভজনক বিনিয়োগ করতেÑ মোটেই অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যের স্থাপনের দিকে যাবে না। এই বিনিয়োগের জন্য চীনের দুটি বিষয় দরকার- এক. বাংলাদেশ যেন ইসলামিক ফান্ডামেন্টালিস্টদের অভয়ারণ্য না হয়। দুই. বাংলাদেশের সরকারের একটা ধারাবাহিকতা। আগামী নির্বাচনের ভেতর দিয়ে চীন তাদের এই আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন চায়। পাশাপাশি মিয়ানমারের অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যের একটি বাজারও বাংলাদেশে চায় চীন। এ সবের নিশ্চয়তা যদি আগামী নির্বাচনের ভেতর দিয়ে আসে, তাহলেই চীন তখন রোহিঙ্গাদের নিজ বাসভূমিতে ফেরার জন্য মিয়ানমারকে চাপ দেবে। চীনের চাপ উপেক্ষা করার কোন ক্ষমতা মিয়ানমারের নেই।

অন্যদিকে শেখ হাসিনার জোট ও তার দলের আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি। নির্বাচনে যদি বিএনপি জয়লাভ করে তখন চীনকে ভিন্নভাবে ভাবতে হবে। এমনকি ভারতকেও ভিন্নভাবে ভাবতে হবে। বিএনপি ক্ষমতায় এলেই বাংলাদেশ আবার ইসলামিক মৌলবাদী জঙ্গী সংগঠনসহ নানান ধরনের জঙ্গীর অভয়ারণ্য হবে। পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দারা আবার বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দারা বাংলাদেশে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই বদলে যাবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চিত্র। তখন তারা শুধু ক্যাম্প পিপল বা রিফিউজি থাকবে না। বরং দিনে দিনে সেখানে জঙ্গী সংগঠন ‘আরসা’র শক্তি বাড়বে। কয়েক মাসের মধ্যে দেখা যাবে আরসার সশস্ত্র জঙ্গীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে কয়েক লাখ। আরসা যখনই এতবড় শক্তির অধিকারী হবে তখন তারা প্রতিদিন মিয়ানমারে হামলা চালাবে। সে অবস্থায় সাধারণ রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরার পথটি একেবারেই বন্ধ হয়ে যাবে।

এ কারণেই রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরার বিষয়টি সম্পূর্ণ নির্ভর করছে শেখ হাসিনার আবার ক্ষমতায় আসার ওপরে। তিনি পুনরায় ক্ষমতায় এলে আগামী পাঁচ বছরে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে একটি সম্মানজনক প্রত্যাবাসন সম্ভব হবে।

[email protected]
সূত্র : জনকণ্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ