প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডাকাতি করতে গিয়ে শিশু হত্যা, ২ হাজার টাকা ভাগ পায় খুনি

রাকিব খান : চার লাখ টাকা ডাকাতির উদ্দেশ্যে ৮ সদস্যের একটি ডাকাত দল গিয়েছিল একটি বাসায়। সেখানে চার লাখ টাকা না পেয়ে মায়ের কোল থেকে কেড়ে নেয় ৯ মাসের শিশু নিঝুম মিত্র তরীকে। এরপর বাথরুমের বালতির পানিতে চুবিয়ে হত্যা করা হয় ফুটফুটে ওই শিশুকে। এমন রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের এক মাস পর খুনের সঙ্গে জড়িত চারজন গ্রেপ্তার হয়েছে। এদের দুজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। বাকি দুজন আজ বুধবার মহানগর হাকিম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

গত ১৫ জুন দুর্বৃত্তরা প্রবেশ করেছিল নগরের পতেঙ্গা থানার সতীশ মহাজন লেনে সাজু মহাজন ভবনের নিচ তলার একটি বাসায়। ওই বাসায় ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকেন চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া উপজেলার বাসিন্দা রিপন মিত্র। তিনি পতেঙ্গা এলাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।

শিশু নিঝুম মিত্র তরী হত্যা রহস্য উন্মোচিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (বন্দর) আরেফিন জুয়েল। তিনি বলেন, ‘৯ মাসের শিশু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রথম দফায় দুজনকে গ্রেপ্তার করে মহানগর হাকিম আদালতে সোপর্দ করা হয়। তারা আটজনের নাম প্রকাশ করে। পরে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আলী আজগর রুবেল ওরফে ভাগিনা রুবেল এবং মোহাম্মদ হাবিবকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বুধবার মহানগর হাকিম আদালতে সোপর্দ করা হবে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যার দায় স্বীকার করেছে এবং কীভাবে হত্যা করেছে সেটা পুলিশকে জানিয়েছে।

সোমবার বিকেলে চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আবু ছালেম মোহাম্মদ নোমানের আদালতে দুজন আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (প্রসিকিউশন) কাজী শাহাবুদ্দিন আহমেদ। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘নিঝুম মিত্র তরী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত আসামি মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন ও সাইফুল ইসলাম স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। পরে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।’

শিশু নিঝুম মিত্র তরী হত্যাকাণ্ডের রহস্য উম্মোচিত হওয়ার পর কারণ জেনে পুলিশ কর্মকর্তাদের চোখ কপালে উঠেছে। আসামিরা জানিয়েছে, ঘটনার আগেই আসামি হাবিব জানতে পারে রিপন মিত্র বাসায় চার লাখ টাকা রেখেছেন। এই তথ্য সহযোগীদের জানায় সে। এর পরই ভাগিনা রুবেল, হানিফ মির্জা, ছোট রুবেল, হাবিব, নজরুল, সাজ্জাদ, সাইফুল ও বাবুসহ আটজন মিলে ওই বাসায় ডাকাতির পরিকল্পনা করে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী ঈদের আগের দিন ১৫ জুন ডাকাতেরা রিপন মিত্রের বাসায় হানা দেয়। এ সময় রিপন মিত্র বাসায় ছিলেন না। রিপনের স্ত্রী চম্পা মিত্র তাঁর ৯ মাসের শিশু নিঝুমকে নিয়ে বাসায় ছিলেন। আটজনের ডাকাত দল বিভক্ত হয়ে ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্ব পালন করে। তাদের মধ্যে শুধু দুজন আলী আজগর রুবেল ও হানিফ মির্জা বাসায় প্রবেশ করে।

বাসায় প্রবেশের পর চম্পার কাছে চার লাখ টাকা কোথায় আছে জানতে চায়। কিন্তু চম্পা চার লাখ টাকার হদিস দিতে পারেননি। চার লাখ টাকা নিয়ে তর্কের এক পর্যায়ে হানিফ মির্জা মা চম্পার কোল থেকে নিঝুম মিত্রকে কেড়ে নিয়ে রুবেলের হাতে তোলে দেয় এবং ধমক দিয়ে বলে, চার লাখ টাকা না দিলে বাচ্চাকে মেরে ফেলবে এরা। এর পরও চম্পা মিত্র বাসায় রক্ষিত চার লাখ টাকার বিষয়ে ডাকাতদের তথ্য দেননি। তখনই রুবেল বাথরুমে গিয়ে পানিভর্তি বালতির ভেতর শিশু নিঝুমকে চুবিয়ে দেয়। আর অন্যজন হানিফ মির্জা টাকার জন্য চম্পাকে ব্যস্ত রাখে। শেষে তারা বাসার আলমারি তল্লাশি করে ২০ হাজার টাকা এবং একটি আংটি পায়। তা নিয়েই ডাকাতেরা বেরিয়ে যায়। পরক্ষণে চম্পা মিত্র দ্রুত বাথরুমে যান এবং সেখানে নিঝুমের মৃতদেহ পান।

ওই ঘটনায় ১৬ জুন রিপন মিত্র বাদী হয়ে পতেঙ্গা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটি তদন্ত করছেন উপ-পরিদর্শক আবদুল মোমেন। প্রায় এক মাস তদন্তকালে তিনি প্রায় দেড় শতাধিক মানুষকে ঘটনার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। শেষে স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছ থেকে একটি তথ্য পান। সেই তথ্য ধরে তদন্ত শুরু করেই তিনি সফল হলেন।

তদন্তের তিন সপ্তাহ সময় পার হয়ে যাওয়ার পর পতেঙ্গার এক লোক পুলিশকে জানিয়েছেন, ‘মাত্র দুই হাজার টাকার জন্য একটি শিশুকে হত্যা করলাম, কাজটি ভালো হলো না।’ এমন তথ্য তিনি যাদের মুখে শুনেছেন তাদের নামই পুলিশকে জানিয়ে দেন ওই ব্যক্তি। পরবর্তীতে সেই দুজন লোকের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে পুলিশ। শেষে তাদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদেই বেরিয়ে আসে আট ব্যক্তির নাম। যারা ওই ঘটনায় সরাসরি জড়িত ছিল। আর জড়িতরা ২০ হাজার টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছে। তবে যে দুজন নিজদের মধ্যে এমন কথা বলাবলি করছিল, তারা নিজদের ভাগে পেয়েছিল দুই হাজার টাকা করে।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ঘটনার দিন রিপনের বাসায় আরো চার লাখ টাকা ছিল। কিন্তু ডাকাতেরা সেই টাকা পায়নি। শুধু ২০ হাজার টাকা এবং চম্পার একটি আংটি পেয়েছিল। বাদীর তথ্য অনুযায়ী, দুজন লোক বাসায় প্রবেশ করেছিল। কিন্তু তদন্ত পর্যায়ে আটজনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এ কারণে মামলাটি ডাকাতিসহ হত্যা মামলায় রূপ নেয়। সূত্র : কালেরকণ্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত