প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শুভ জন্মদিন নেলসন ম্যান্ডেলা

মেজর ডা. খোশরোজ সামাদ

১। মানুষ অমৃতের সন্তান। সেই মানুষে মানুষে বিভাজন তুলবার এক দানবের নাম বর্ণবাদ । মেধা, প্রতিভা, শ্রম, সাধনা নয় বরং গাত্রবর্ণের উপর ভিত্তি করে মানবজাতিকে সাদা এবং কালো এই দুইভাগে ভাগ করে ফেলা হয়েছিল। সাদারা উচ্চবর্ণে আর কালোরা নিম্নবর্ণে ঠাই পেল। অথচ গাত্রবর্ণ প্রকৃতি প্রদত্ত। সাদা চামড়ার মানুষ হবার পিছনে যেমন সেই মানুষের কোন কৃতিত্ব নেই, তেমনই কালো হবার পিছনেও কারো হাত নেই । অ্যালেক্স হ্যালির ‘দি রুটস’ অথবা হ্যারিয়েট বিচার স্টো’র লেখা ‘আঙ্কল টমাস কেবিন ‘দেখা যায় শুধু গাত্রবর্ণ সাদা হবার সুযোগ নিয়ে ধূর্ত শ্বেতাঙ্গরা ভয়াবহ নৃশংসতায় কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি কি নির্মম নির্যাতনই না করে এসেছে। মানুষ মানুষকে পণ্যের মত কিনেছে বেঁচেছে, ক্রীতদাস বানিয়ে রেখেছে । সেই ঘৃণ্য বর্ণবাদের বিরুদ্ধে অবিসংবাদিত এক নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা ।

২। কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত অনেক দেশের মত দক্ষিণ আফ্রিকায় একসময় কালো মানুষদের নূন্যতম ভোটদান ক্ষমতাও নিষিদ্ধ ছিল। নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বে বর্ণবাদ বিরোধী তীব্র লড়াইয়ে নতি স্বীকার করে শাসক শ্রেণী এক পর্যায়ে সে অধিকার দিতে বাধ্য হয়। সব বর্ণের অংশগ্রহণে নির্বাচন হয়। নেলসন ম্যান্ডেলা ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার গণতান্ত্রিক উপায়ে সেই নির্বাচনে প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন । বছরটি ১৯৯৯। তখন তাঁর জনপ্রিয়তার সূর্য মধ্য আকাশে জ্বলজ্বল করলেও মেয়াদকাল শেষে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দেন । আরেকবার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হবার শত অনুরোধ সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেন ।

৩। রাজপরিবারে জন্ম হলেও জীবনের প্রয়োজনে খনির শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন । শিশুকালে তাঁর নাম রাখা হয় ‘রালিহ্লাহ্লা’ । যার অর্থ গাছের ডাল যে ভাঙে। মিশনারি স্কুলে ভর্তি হলে তাঁর এক শিক্ষক নাম রাখেন ‘নেলসন’। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সময় ছাত্র আন্দোলনে নিজেকে যুক্ত করে ফেলেন । প্রশাসন তাঁকে কোর্ট হেয়ার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করে । কিন্তু, তাঁর আলোর তৃষ্ণা থামে নি । উইটস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি আইনশাস্ত্রে ডিগ্রী নেন ।

৪। নশ্বর মানুষ বাঁচে কতদিন? মুক্তির স্বাদ তার জন্মগত অধিকার। ম্যান্ডেলাকে ২৭ বছর কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়। কারাগারে আড়াই মিটার লম্বা, দুই মিটার চওড়া একটি প্রকোষ্ঠে রাখা হয়। মেঝেতে ছিল শোয়ার ব্যবস্থা । আর ছিল শুধু মলমূত্র ত্যাগ করবার জন্য একটি মাত্র বালতি ।‘ঝমুচলেকা’ দিয়ে জেল থেকে মুক্তির অন্তত ছয়টি প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।

৫। প্রথম জীবনে মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলন তাঁকে বিশেষ প্রভাবিত করে । শ্বেতাঙ্গ শাসক শ্রেণী অমানসিক দমন-পীড়ন শুরু করলে তিনি সশস্ত্র পথে হাঁটতে থাকেন । ১৯৬১ সালে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (এ এন সি) এর সশস্ত্র শাখার প্রধান নির্বাচিত হন । মরক্কো এবং ইথিওপিয়ায় সশস্ত্র ট্রেনিং নেন। শ্বেতাঙ্গ সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে চোরাগোপ্তা হামলা পরিচালনা করা হয় । ব্যাপক আকারে গেরিলা যুদ্ধের কথা ভাবা হয় । ২০০৮ সাল পর্যন্ত তাঁকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেয়া হয় নি ।

৬। সত্তর দশকে লেখা স্মৃতিকথন ‘লং ওয়াক টু ফ্রিডম’ লেখেন । প্রশাসনের দৃষ্টি এড়িয়ে পান্ডুলিপি পলিথিনে মুড়িয়ে পুঁতে রাখেন । কারারক্ষীরা বিষয়টি জানতে পারলে তাঁর পড়াশুনা লেখালেখি বন্ধ করে দেয় ।

৭। ম্যান্ডেলাকে নোবেল পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। একটি পারমাণবিক কণার নাম রাখা হয়েছে ‘ম্যান্ডেলা পার্টিকেল’। ব্যক্তিজীবনে তিনি তিনবার বিয়ে করেন এবং ছয়জন সন্তানের জনক হন । বাংলাদেশে তিনি শুভেচ্ছা সফর করেন । বাংলার আম্রফলের স্বাদ ও গন্ধের তিনি উচ্ছসিত প্রশংসা করেন ।

৮। আজ ১৮ জুলাই। জাতিসংঘ এই দিবসকে নেলসন ম্যান্ডেলা ইন্টারন্যাশনাল ডে হিসেবে পালন করে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই এই দিবস পালন করা হয় । যতদিন বর্ণে বর্ণে, জাতিতে জাতিতে, ধর্মে ধর্মে, দেশে দেশে বৈষম্য থাকবে ততদিন এই মহান নেতা বাতিঘর হিসেবে অত্যাচারিত মানুষকে পথ দেখাবে।
শুভ জন্মদিন প্রিয় নেলসন ম্যান্ডেলা।

লেখক: উপ-অধিনায়ক, আর্মড ফোর্সেস ফুড এন্ড ড্রাগস ল্যাবরটরী

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ