প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সর্বত্রই নৌকা, ধানের শীষের দেখা নেই

ডেস্ক রিপোর্ট : ভোরে ট্রেন থেকে নেমে রাজশাহীর পরিপাটি স্টেশন চত্বরে পা রেখেই বোঝা গেল, সিটি নির্বাচনের প্রচারে আওয়ামী লীগই এগিয়ে আছে। যে দিকে চোখ যায়, সেদিকেই দলটির মেয়র প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের পোস্টার-ব্যানার-ফেস্টুন। রিকশায় যেতে স্টেশন থেকে আধা কিলোমিটার দূরের সাগরপাড়ায় প্রথম চোখে পড়ল বিএনপির প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের পোস্টার। সব মিলিয়ে গতকাল রোববার ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত রাজশাহীর অলিগলি ঘুরে দেখা গেছে প্রচারে আওয়ামী লীগের তুলনায় বিএনপি পিছিয়ে আছে।

তবে বিএনপি দাবি করছে, আওয়ামী লীগের বাধার কারণে পোস্টার, ব্যানার লাগাতে পারেনি তারা। আওয়ামী লীগের লাগানো পোস্টার-ব্যানার-ফেস্টুনের পেছনে যত ব্যয় হয়েছে, কমিশনে দাখিল করা নির্বাচনী সম্ভাব্য ব্যয় বিবরণীর সঙ্গে তা অসামঞ্জস্যপূর্ণ কি-না, জানতে চাইলে দলটির নেতারা বলেন, তারা আচরণবিধি লঙ্ঘন করেননি- এসব লাগিয়েছে নগরবাসী।

কোনো কোনো সূত্র জানাচ্ছে, প্রতীক বরাদ্দের আগেই প্রচার উপকরণ প্রস্তুত রেখেছিল আওয়ামী লীগ। প্রচার শুরুর প্রথম প্রহর ১০ জুলাই রাতেই পুরো নগর নৌকার পোস্টারে ছেয়ে যায়। বিএনপি এর জন্য প্রস্তুতই ছিল না। পরে পোস্টার লাগানোর মতো দেয়াল বা স্থান পেতে হিমশিম খেয়েছে তারা।

নির্বাচনী হাওয়ার গতি বুঝতে রাজশাহীর আলুপট্টির পদ্মার পাড়ে কথা হলো হাওয়া খেতে আসা লোকজনের সঙ্গে। রাজশাহী পলিটেকনিক্যালের ছাত্র সাব্বির রহমান বললেন, নগরজুড়েই নৌকার হাওয়া। প্রচারে তারা একচেটিয়াভাবে এগিয়ে আছে। তবে বাইরে থেকে বিএনপিকে দুর্বল ও নীরব মনে হলেও তাদের অবস্থানও বেশ মজবুত। একই মতামত দিলেন আরও অনেকে।

সুশসানের জন্য নাগরিকের (সুজন) রাজশাহীর সমন্বয়ক সুব্রত কুমার পালেরও একই অভিমত। সমকালকে তিনি বলেন, ব্যানার-পোস্টারের সংখ্যায় ভোট হয় না। প্রচার মাত্র ছয় দিন ধরে চলছে। চলবে আরও ১৩ দিন। প্রভাবমুক্ত নির্বাচন হলে শেষ পর্যন্ত তুমুল লড়াই হবে বলেই ধারণা করছেন সুব্রত পাল। তার মতে, প্রার্থীরা আচরণবিধি মেনে চললে নির্বাচন উৎসবমুখর হবে।

নির্বাচন কমিশনে খায়রুজ্জামান লিটন তার নির্বাচনী ব্যয়ের সম্ভাব্য বিবরণীতে বলেছেন, পোস্টার ছাপাবেন দেড় লাখ। ডিজিটাল ব্যানার লাগাবেন ৪০০। ডিজিটাল ফেস্টুন সংখ্যার অবশ্য কোনো উল্লেখ নেই। সরেজমিন দেখা গেছে, পোস্টারের সংখ্যা যেমন তেমন, ডিজিটাল ব্যানার ব্যয় বিবরণীতে উল্লেখিত সংখ্যার চেয়ে বহুগুণ বেশি। আর ডিজিটাল ফেস্টুনও আছে প্রচুর। নগরীর কাজীরহাটা থেকে কুমারপাড়ার মহানগর আওয়ামী লীগ কার্যালয় পর্যন্তই ডিজিটাল ব্যানার-ফেস্টুন রয়েছে হাজারের বেশি।

গতকাল দুপুরে মহানগর আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে দেখা গেল পাঁচ পিকআপ বোঝাই ডিজিটাল ফেস্টুন। ‘অমিত আর্ট ডিজিটাল সাইন’ থেকে ছাপানো এসব ফেস্টুনের নিচে লেখা হয়েছে সর্বসাকুল্যে ৩০০ কপি ছাপানোর কথা। তবে ছাপখানাটির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার আবুল বাসার জানালেন, মহানগর আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য নেতারা মিলিয়ে নৌকা মার্কার ফেস্টুন-ব্যানারের অর্ডার দিয়েছেন ১০ হাজারের মতো। পরে আবারও ফোন করে প্রকৃত সংখ্যা জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানের মালিকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।

হলফনামায় দেওয়া সম্ভাব্য ব্যয় বিবরণীর তুলনায় বেশি পোস্টার-ব্যানার ছাপানোর অভিযোগের জবাবে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আহসানুল ইসলাম পিন্টু বলেন, তারা আচরণবিধি লঙ্ঘন করেননি। খায়রুজ্জামান লিটন সম্ভাব্য বিবরণী মেনেই পোস্টার-ব্যানার ছাপিয়ে লাগিয়েছেন। আচরণবিধি মেনেছেন। বাকিগুলো নগরবাসী স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে লাগিয়েছে।

বিএনপি অভিযোগ করছে, এভাবে আওয়ামী লীগ ‘পোস্টার-সন্ত্রাস’ করেছে। নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে চার কোটি টাকার ব্যানার-পোস্টার লাগিয়েছেন লিটন। এ অবস্থায় বিএনপি ব্যানার পোস্টার লাগানোর জায়গা পাচ্ছে না। মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল অভিযোগ করে বলেন, তার পোস্টার লাগাতে দেওয়া হচ্ছে না। লাগালেও ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে। তবে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী খায়রুজ্জামান লিটনও একই অভিযোগ করেছেন। গতকাল রিটার্নিং অফিসারের কাছে তিনি লিখিত অভিযোগও করেন।

গণসংহতি আন্দোলন সমর্থিত মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট মুরাদ মোর্শেদের অভিযোগ, ‘রুচিহীনতার’ পরিচয় দিয়েছে আওয়ামী লীগ। নগরীর একটি মোড়েও এক ইঞ্চি জায়গা ফাঁকা রাখেনি। সবখানে আওয়ামী লীগের ব্যানার-ফেস্টুন। প্রতিপক্ষ প্রচারের সুযোগই পাচ্ছে না।

শুধু পোস্টার-ব্যানারে নয়, গণসংযোগেও আওয়ামী লীগের উপস্থিতি সরব। গতকাল দুপুরে গিয়ে দেখা গেল, কর্মীতে সরগরম মহানগর আওয়ামী লীগ কার্যালয়। মালোপাড়ার বিএনপি কার্যালয়ে ধানের শীষের ব্যানার-পোস্টার থাকলেও কর্মীর দেখা পাওয়া গেল না তেমন। মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম মিলন অভিযোগ করলেন, তাদের কর্মীদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। পুলিশও হয়রানি করছে। তিনি জানালেন, তারপরও কর্মীরা মাঠে আছেন। প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।

ব্যানার-পোস্টারে যেমন একচেটিয়া এগিয়ে, তেমনি নির্বাচনি প্রস্তুতিতেও এগিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। ওয়ার্ডভিত্তিক নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠনের পর তারা এখন কেন্দ্রভিত্তিক কমিটি গঠনের কাজ করছে। বিএনপি এখনও ওয়ার্ড কমিটিও পূর্ণাঙ্গ করতে পারেনি। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি ছাড়াও মেয়র পদে প্রার্থী রয়েছেন আরও তিনজন। রাশাহীতে এখন দিনভর খায়রুজ্জামান লিটনের পক্ষে ভোট প্রার্থনা করে মাইকিং হয়। মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের পক্ষেও মাইকে প্রচার চলছে। বাকিদের সাড়াশব্দ তেমন নেই বললেই চলে।

বুলবুল পিছিয়ে থাকলেও নগরবাসীর কথায় স্পষ্ট, প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে। মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন থেকে ১৯৯০ সালে সিটি করপোরেশনে উন্নীত রাজশাহীতে গত ২৪ বছরে মেয়র পদে ভোট হয়েছে চারবার। তিনবারই জিতেছে বিএনপি। ২০০৮ সালে জয়ী আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে গতবার প্রায় ৫০ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন বিএনপির মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। তাই তার পোস্টার-ব্যানার সংখ্যায় কম হলেও ভোটের মাঠে তিনি দুর্বল প্রার্থী নন। তিন লাখ ১৮ হাজার ভোটার কাকে নগর পিতা হিসেবে বেছে নেবেন সেই জবাব পেতে অবশ্য অপেক্ষা করতে হবে ৩০ জুলাই ভোটের দিন অবধি।
সূত্র :সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত