প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রাইফার চিঠি : তোমরা কি কেউ ভাবছ, আমি কেন মরে গেলাম?

কামাল হোসেন মিঠু, নিউইয়র্ক থেকে : তোমরা কেমন আছো? আমাকে চিনতে পারছ? আমার নাম রাফিদা খান রাইফা। মাত্র আড়াই বছর আমি তোমাদের পৃথিবীতে ছিলাম। বাবা মায়ের ফুলের বাগানে আমি ছিলাম একটা ছোট্ট বাটারফ্লাই। এখন আমি আরেকটা ফুলের বাগানে এসেছি। এই ফুলের বাগানটা খুব সুন্দর কিন্তু এখানে বাবা-মা নেই। তাই আমার মন খারাপ হয়। ভীষণ কান্না পায়। আমার বাবাইটা আমাকে গল্প বলে ঘুম পাড়াত। আমি মাকে জড়িয়ে ধরে বাবার গল্প শুনতাম আর মায়ের গায়ের গন্ধ নিতে নিতে ঘুমিয়ে পড়তাম। ওদের ছাড়া আমার একটুও ঘুম আসে না!!

তোমরা কি জানো আমার বাবাই আর মামনিও ঘুমায় না। আমার ছোট্ট বালিশটা জড়িয়ে ধরে সারারাত কান্না করে। আমার যে ফুল আঁকা জামাটা আছে, আমার মা সেই জামাটা জড়িয়ে ধরে ‘রাইফা’ ‘রাইফা’ বলে কাঁদে। আমি মা বলে এত্ত ডাকি কিন্তু মা শুনতেই পায় না।

আমার মায়ের স্বপ্ন ছিল ডাক্তার চাচ্চুদের মতো আমিও বড় হলে ডাক্তার হবো। যারা ডাক্তার তারা তো অনেক ভালো!! মানুষের যখন অসুখ হয় তখন ডাক্তারের কাছে গেলে ওষুধ দিয়ে ওদের সব অসুখ সারিয়ে দেয়। মা আমার দুই গালে চুমু খেয়ে বলত আমার রাইফা ডাক্তার হয়ে বাংলাদেশের সব মানুষের অসুখ ভালো করে দেবে। বাবাই চাইত বড় হয়ে আমি সাংবাদিক হই। বাবাই আমার মা’কে বলত, সাংবাদিকতা মহান পেশা। কলমে সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। আমি আমার রাইফাকে সাংবাদিক বানাব। আমি তো ছোট মানুষ, তাই মহান পেশা, সত্য প্রতিষ্ঠার মতো কঠিন কথা বুঝতে পারতাম না। এইটুকু শুধু বুঝতাম, যারা সাংবাদিক তাদের অনেক সাহস। ওরা কাউকে ভয় করে না। কারও কাছে মাথা নিচু করে না। আমি ডাক্তার সাংবাদিক কিছুই হতে চাইতাম না। আমি সারাক্ষন পুতুল খেলতে চাইতাম, আর টিভিতে কার্টুন দেখতে চাইতাম।

এই ফুলের বাগান থেকে আমি যে তোমাদের দেখতে পাচ্ছি তোমরা কি সেটা জানো? এই যে আমি দেখতে পাচ্ছি আমার সাংবাদিক আর ডাক্তার চাচ্চুরা সব কাজ ফেলে একজন আরেকজনের সাথে শুধু ঝগড়া আর মারামারি করছে। তোমাদের মারামারি দেখে আমার খুব মন খারাপ হচ্ছে। তোমরা কিছুতেই থামছ না। আচ্ছা, তোমরা নাকি আমার জন্য ঝগড়া করছো? তোমরা তো কেউ আমার কথা বলছ না! আমার কথা ভাবছ না! তোমরা শুধু তোমাদের কথাই বলছো।

ডাক্তার চাচ্চুরা বলছ, আমরা ভালো, তোমরা পচা। আর সাংবাদিক চাচ্চুরা বলছ, আমরা ভালো, তোমরা পচা। তোমাদের দুই দলের মধ্যে কে ভালো আর কে পচা এই নিয়ে মারামারি। তোমরা কি কেউ ভাবছ, আমি কেন মরে গেলাম?

প্রিয় চাচ্চুরা, তোমরা তো চাইলেই খুব সহজে বুঝতে পারতে আমাকে কেন বাবা মায়ের কোল থেকে এখানে এত দূরে আসতে হলো? তুমি যদি ডাক্তার হও তবে সত্যিটা বুঝি স্বীকার করা যাবে না? তুমিও ডাক্তার শুধু এই কারণে খুনি ডাক্তারদের পক্ষে সাফাই গাইতে হবে? আর তুমি যদি সাংবাদিক হও তবে বুঝি তেড়েমেড়ে ওদের সবার বিপক্ষে দল পাকাতে হবে? আমার কথাটা বেমালুম ভুলে গিয়ে তোমরা শুধু ব্যস্ত হচ্ছো তোমাদের নিয়ে।

আমার লক্ষী চাচ্চুরা, এটা কেমন কথা!! তোমরা হাসপাতাল বন্ধ করে দিয়েছো। বলছো, তোমরা আর অসুখ সারাবে না। আমার খুব ভাবনা হয়। আমার মতো হাজার হাজার ছোট্ট রাইফাদের তাহলে কি হবে? অসুখ হলে তোমরা ওদের বলবে, আমি তোমার অসুখ সারাবো না। তুমি মরে গেলে আমার কিচ্ছু যায় আসে না? বলবে? আমি তো এই ফুলের বাগানে আর কোনো রাইফা কে চাই না। আমি চাই না আমার বাবা মায়ের মতো আর কোন রাইফার বাবা মা কাঁদুক। আমি তো মরেই গেছি। আমার তুলতুলে ফ্রকটা খুলে একটা সাদা কাপড়ে মুড়িয়ে আমার বাবা মাটির নিচে রেখে এসেছে আমাকে। আমার কথা না হয় তোমরা নাই ভাবলে। কিন্তু তোমাদেরও তো রাইফা আছে। ওদের কথাও কি ভাববে না?

আমার ডাক্তার ও সাংবাদিক চাচ্চুরা, চোখটা বন্ধ করে তোমাদের ঘরের রাইফার মুখটা একবার মনে করো তো!! আমার মতো যদি ওরাও ভুল চিকিৎসায় মরে যায়? আজ তোমার রাইফা ভালো আছে, তোমার রাইফা তোমার গল্প শুনে মায়ের আচল জড়িয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে, তাই তোমাদের কিছু আসে যায় না? আমি তোমাদের রাইফা না তাই তোমরা আমার কথা ভুলে গিয়ে শুধু নিজেদের ভালো প্রমাণ করতেই ব্যস্ত হলে? ঠিক আছে। ভুলে যাও আমাকে। ভুলে যাও আমার সাথে কি হয়েছে। প্রমাণ করো, কে ভালো আর কে খারাপ। ডাক্তার না সাংবাদিক। আর তোমাদের ঝগড়াঝাটির ফাঁকে পালিয়ে যাক আমার খুনীরা। তবে তাঁর আগে নিজেকে একবার প্রশ্ন করো। তোমাদের রাইফার ছোট্ট শরীরটা কাফনে মুড়িয়ে অন্ধকার কবরস্থানে বয়ে নিয়ে যাওয়ার শক্তি ও সাহস তোমাদের আছে তো?

আমার বাবা কাঁদছে। আমার মা কাঁদছে। ওদের এই কান্না কোনোদিন থামবে না। তোমাদের রাইফার জন্মদিনে কেক কাটা হবে, রঙিন বেলুনে ঘর সাজানো হবে, উৎসব হবে। আমার জন্মদিনে ঘর থাকবে অন্ধকার। সেই অন্ধকার ঘরে দুটো মানুষ একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে হাহাকার করবে। ঈদের দিন বা দুর্গা পুজোয় তোমাদের রাইফারা নতুন জামা পরে ঝলমল করবে, আর তোমরা ওদের বুকে জড়িয়ে ধরবে। আমার বাবা মা আমার পুরোনো ফুল আঁকা জামাটা বুকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে আমার নাম ধরে ডাকবে।

মারামারি শেষ করে আজ বাড়ি ফিরলে তোমাদের রাইফা কন্যাদের মাথায় হাত রেখে একবার অন্তত কাফনে মোড়ানো আমার শরীরটার কথা ভেবো। যত অন্ধকার, যত অশ্রু, আমার ঘরেই থাক। তোমাদের ঘরে থাকুক আলোক সজ্জা। তোমাদের রাইফা’রা নিরাপদে বড় হোক। আমি ছোট মানুষ। তবু বলি, প্রিয় ডাক্তার ও সাংবাদিক চাচ্চুরা, তোমরা বড় হও। তোমাদের বোধোদয় হোক। সুবুদ্ধি হোক।

ইতি,
রাফিদা খান রাইফা
বয়স: আড়াই বছর
বর্তমান ঠিকানা: পৃথিবী থেকে বহুদূরে এক নির্জন ফুলের বাগান।

নোট : শিশু রাইফা দৈনিক সমকালের চট্টগ্রাম ব্যুরোর স্টাফ রিপোর্টার রুবেল খানের মেয়ে। চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাইফার মৃত্যু হয়। রাইফার মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসকদের গাফিলতির প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। আলোচিত এই ঘটনায় বিভাজন দেখা দেয় চট্টগ্রামের সাংবাদিক ও চিকিৎসকদের মধ্যে। রাইফার কাল্পনিক এই চিঠিটি সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দুই পেশার মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও অটুট বন্ধনের তাগিদ দেয়। কাল্পনিক চিঠিটি প্রাসঙ্গিক হওয়ায় তা পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।-সারাবাংলা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ