প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রকল্প শেষের ৫ বছর পর জানা গেল কাজই হয়নি

ডেস্ক রিপোর্ট : রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের এসআরভি স্টেশনের দুটি ট্র্যাক সংস্কারে প্রকল্প নেয়া হয় ২০০৭ সালে। ১৭ কোটি টাকার প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয় ২০১৩ সালে। নির্ধারিত ওই সময়ে কাজ না হলেও এ বিষয়ে ভ্রূক্ষেপ ছিল না প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রকৌশল দপ্তরের। প্রকল্পে কোনো কাজ হয়নি বলে জানতে পেরে সম্প্রতি ১৭ কোটি টাকা ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় প্রকৌশলী। এ-সংক্রান্ত চিঠি পেয়ে দায়সারাভাবে স্টেশনটি চালুর লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর।

জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে এসআরভি স্টেশনের কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও এ প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি নজরে আসতে সময় লেগেছে প্রায় পাঁচ বছর। স্টেশন পুনর্বাসন প্রকল্পের মেয়াদ শেষের পরও তেমন অগ্রগতি না হওয়ায় সেখানে লোডিং-আনলোডিং বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৬ সালে রেলের পরিবহন বিভাগ এসআরভি স্টেশনের নামে আসা পণ্য সিজিপিওয়াই (চিটাগং পোর্ট ইয়ার্ড) স্টেশনের মাধ্যমে লোডিং-আনলোডিং শুরু করে। রেলের পরিবহন ও বাণিজ্য বিভাগ স্টেশনটি অকার্যকর বলে দাবি করেছে। কিন্তু ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ের পরও এসআরভি স্টেশন অকার্যকর থাকলেও এ নিয়ে তত্পরতা ছিল না প্রকৌশল দপ্তরের। বিষয়টিতে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় প্রকৌশল দপ্তরকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কাজ না করেই প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ হওয়ার বিষয়ে সম্প্রতি রেলওয়ের বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দিয়েছেন বিভাগীয় প্রকৌশলী-৩। অন্যান্য দপ্তর কাজের নামে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ তুলেছে প্রকৌশল দপ্তরের বিরুদ্ধে। এমন পরিস্থিতিতে সম্প্রতি এসআরভি স্টেশনের একটি ট্র্যাক চালু করে বিষয়টি সামাল দেয়ার চেষ্টা চালায় প্রকৌশল বিভাগ। যদিও ভারী মালপত্র খালাস-বোঝাইয়ের জন্য বিশেষায়িত স্টেশনটির অবকাঠামোর উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন জরুরি বলে মনে করছেন রেলকর্মীরা।

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, স্ট্যান্ড রোড ভিক্টোরিয়া (এসআরভি) স্টেশনটি রেলওয়ের পুরনো স্টেশনগুলোর অন্যতম। ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত এ স্টেশনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য চলত। আমদানিকৃত পাথর, খাদ্যপণ্য, সার, ভারী মূলধনি যন্ত্রপাতি ইত্যাদি এখনো বন্দর থেকে খালাসের পর এসআরভি স্টেশনে বোঝাই হয়ে গন্তব্যে পৌঁছে। রেল অবকাঠামো নির্মাণের ভারী কাঁচামালও এ স্টেশনেই লোডিং-আনলোডিং হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের কাছের স্টেশন হওয়ায় আমদানিকারকরাও এসআরভি স্টেশনে মালপত্র বোঝাইয়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন কার্যক্রম বৃদ্ধির জন্য স্টেশনটি সংস্কারের প্রকল্প নেয়া হয়। কিন্তু মেয়াদ শেষের প্রায় পাঁচ বছর পর সম্প্রতি বিভাগীয় প্রকৌশলীর পর্যবেক্ষণে ওই প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি উঠে আসে।

রেলের নথি অনুযায়ী, ফৌজদারহাট-সিজিপিওয়াই-এসআরভি-চট্টগ্রাম সেকশনের রেলপথ ও অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় স্টেশনটির ক্ষয়ে যাওয়া রেল, অকেজো স্লিপার, টার্ন আউট, সিগন্যালিং ও টেলিকমিউনিকেশন সিস্টেমসহ সেতু ও অন্যান্য ভৌত অবকাঠামো সংস্কারের কথা ছিল। প্রকল্পের নথিতে এসআরভি স্টেশনের অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়াও কংক্রিট স্লিপার, চুরি প্রতিরোধক ইলাস্টিক ফিটিংস, ফাস্টেনিং, পয়েন্টস অ্যান্ড ক্রসিং, মেশিন প্যাকিংসহ বেশকিছু শর্ত দেয়া ছিল।
গত ১০ মে রেলওয়ের বিভাগীয় প্রকৌশলী-৩ আতাউল হক ভুঁঞা স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এসআরভি স্টেশন অকার্যকর থাকার বিষয়টি উঠে আসে। বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপককে (ডিআরএম) দেয়া ওই চিঠিতে প্রকল্প শেষের পরও স্টেশনটি চালু না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশের পাশাপাশি দ্রুত স্টেশনটি চালু ও সরকারের বিনিয়োগকৃত অর্থের অপচয়ের বিষয়টি তদন্তের আহ্বান জানানো হয়। চিঠিতে স্টেশন পুনর্বাসনের ১৭ কোটি টাকা কোথায় ব্যয় হয়েছে, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন রেলের বিভাগীয় প্রকৌশলী।
এর আগে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল ও ৩ মে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীসহ (পথ) রেলের প্রকৌশল বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা প্রকল্প এলাকাটি পরিদর্শন করেন। এ সময় পুনর্বাসিত সাইডিং ও অ্যাপ্রোচসহ ১০টি লাইনে বিক্ষিপ্তভাবে ২৯১টি খালি ওয়াগন পড়ে থাকতে দেখা যায়। এর জেরে গুরুত্বপূর্ণ রেলপথটি সংস্কারের ব্যবস্থা নিতে ডিআরএমকে চিঠি দেন বিভাগীয় প্রকৌশলী।

অর্থ ব্যয় হলেও প্রকল্পের কাজ না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পথ) তানভিরুল ইসলামবলেন, ‘আমি ট্রলি করার সময় এসআরভি স্টেশনে সরেজমিন প্রকল্প এলাকাটি দেখে এসেছি। কিন্তু বিষয়টি আমার তত্ত্বাবধানে নেই। সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে প্রকল্প ও অন্যান্য বিষয়ে জানতে পারবেন।’

রেলের পরিবহন ও বাণিজ্যিক বিভাগের নথিতে দেখা গেছে, এসআরভি স্টেশনটি অকার্যকর থাকায় ২০১৬ সালে এ স্টেশনের কার্যক্রম সিজিপিওয়াইতে স্থানান্তর করা হয়। এতে রেলওয়ের আয় হয় ২ কোটি ১৩ লাখ ৯৫ হাজার ২৮১ টাকা। একইভাবে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ২৬ জুন পর্যন্ত আয় হয়েছে ৩ কোটি ৯৯ লাখ ৯৭ হাজার ১৫০ টাকা। এসআরভি স্টেশন সচল থাকলে পণ্যের পরিমাণ ও সরকারের আয় আরো বাড়ত।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে রেলের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, স্টেশন পুনর্বাসন করতে নেয়া প্রকল্পটিতে হরিলুট হয়েছে। কাজ না করেই প্রকৌশলীদের যোগসাজশে অর্থ সরিয়ে নেয়া হয়েছে। কিন্তু তদারককারী প্রকৌশল দপ্তর এ নিয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। প্রকল্প শেষের পাঁচ বছর পর বিভাগীয় প্রকৌশলীর নজরে আসায় এখন বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চলছে। এভাবে রেলের বরাদ্দ ব্যয় করে প্রকল্প নেয়া হলেও সঠিক তদারকি না থাকায় সংস্থাটি লোকসানে পড়ছে বলে মনে করেন তারা।
জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজার (ডিআরএম) মো. জাহাঙ্গীর আলমবলেন, প্রকল্পটি সম্পর্কে আমার ধারণা নেই। তবে প্রকল্প শেষ হয়ে থাকলে নিশ্চয়ই কাজ হয়েছে। হয়তো কোনো কারণে ফাংশন করছে না। এসআরভি স্টেশনের দুটি রেলপথই নতুন রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রকল্প শেষ হলেও কাজ হয়নি, এটা বলা ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। সূত্র : বণিক বার্তা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ