প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অর্ধশত আসনে জাপাকে ছাড়! : শঙ্কায় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রার্থী নেতারা

ভোরের কাগজ রিপোর্ট : বাংলাদেশের একমাত্র জেলা কুড়িগ্রাম। যেখানে ৪টি আসনই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের হাতছাড়া। আসনগুলো জাতীয় পার্টি (জাপা-এরশাদ) ও জাতীয় পার্টির (জেপি-মঞ্জু) দখলে। দশম সংসদ নির্বাচনে কুড়িগ্রাম-১, ২, ৩ আসনে সাংসদ হয়েছেন জাপার এ কে এম মোস্তাফিজুর রহমান, তাজুল ইসলাম চৌধুরী, এ কে এম মাইদুল ইসলাম (বর্তমানে প্রয়াত) এবং কুড়িগ্রাম-৪ আসনে জাতীয় পার্টির (জেপি-মঞ্জু) রুহুল আমিন। নবম সংসদে দুটি আওয়ামী লীগ ও দুটি জাতীয় পার্টির দখলে ছিল।

আলহাজ মোহাম্মদ জাফর আলী। কুড়িগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে কুড়িগ্রাম-২ (সদর) আসনে নৌকা প্রতীকে সাংসদ হয়েছিলেন। দশম নির্বাচনে দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে জাতীয় পার্টির তাজুল ইসলাম চৌধুরীকে সমর্থন দেন। একাদশ নির্বাচনেও জাফর দলের মনোনয়নের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এলাকায় কাজও করছেন তিনি। জেলায় দলীয় কোনো সাংসদ না থাকায় নেতাকর্মীরা তার কাছেই ছুঁটে আসেন। কিন্তু পুরো জেলার নেতাকর্মীদের সামলানো তার জন্য অনেকটা কষ্টের।

তিনি জানান, দলীয় প্রধানের নির্দেশে বিগত নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছি। জাপার যিনি সাংসদ হয়েছেন, বিজয়ী হওয়ার পর মাত্র ২ থেকে ৩ বার এলাকায় এসেছেন। সাধারণ মানুষ কি অবস্থায় আছে, সেদিকে তার খেয়াল নেই। বন্যা, শীতসহ যে কোনো দুর্যোগে তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। দলীয় নেত্রীর সহযোগিতায় আমরা মানুষের পাশে থাকি। দল ক্ষমতায়, পুরো জেলা ২টি আসনেও যদি নৌকার প্রার্থী সংসদ সদস্য থাকতেন, তাহলে আমাদের সমস্যা হতো না। কাজেই আমাদের চাওয়া, আগামী নির্বাচন জোটগতভাবে হলেও অন্তত কুড়িগ্রামে যেন নৌকা বঞ্চিত না হয়, সে জন্য দলের সভাপতি শেখ হাসিনার প্রতি আমাদের অনুরোধ থাকবে। এতে দলকে অনেকটা চাঙ্গা করা যাবে। কর্মীরা মনোবল পাবেন।

এবারো জোটগত নির্বাচনে আসনটি জাপাকে দেয়া হলে দলের প্রার্থী হিসেবে তার অবস্থান কি হবে জানতে চাইলে জাফর আলী বলেন, দলীয় সভানেত্রীর সিদ্ধান্তই আমাদের সিদ্ধান্ত। তিনিই আমাদের অভিভাবক।

কুড়িগ্রামের পর জেলা হিসেবে বৃহত্তর ময়মনংসিহের ১১টি আসনের ৪টিই জাতীয় পার্টির (এরশাদ) দখলে। বাকি ৭টিতে আওয়ামী লীগ। ময়মনসিংহ-৪ আসনের বর্তমান সাংসদ বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ। এখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী প্রবীণ রাজনীতিবিদ অধ্যক্ষ মতিউর রহমান। নবম সংসদে তিনি সাংসদ ছিলেন। মহাজোটের কারণে জাপাকে আসনটি ছেড়ে দেয়া হয়। পুরস্কার স্বরূপ টেকনোক্রেট কোটায় মতিউর রহমানকে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই নেতা এবার নির্বাচনে অংশ নেবেন না বলে জানা গেছে। তবে তার হয়ে এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে পারেন ছেলে মোহিত উর রহমান শান্ত। ময়মনসিংহ মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তিনি।

স্থানীয়সূত্রে জানা গেছে, বাবা অধ্যক্ষ মতিউর মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকায় এলাকার রাজনীতিতে মোহিত উর রহমান শান্ত বেশ সক্রিয়। দলীয় মনোনয়নের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার বাবা বয়স হলেও শারীরিক ও মানসিকভাবে এখনো অনেক শক্ত। যে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি দক্ষতার সঙ্গে তিনি পালন করেন। কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় আমরাই ক্লান্ত হয়ে যাই, কিন্তু তাকে কখনো ক্লান্ত হতে দেখিনি। তাই দলীয়ভাবে তিনিই মনোনয়ন প্রত্যাশী।

স্থানীয় কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিগত নির্বাচনে জাপার প্রার্থী বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় জয়ী হয়েছেন। এবার তারা সদর আসনে নৌকা প্রতীকে প্রার্থী চান। তাদের ভাষ্য, বিএনপি অংশ নিলে নৌকা প্রতীক ছাড়া অন্য প্রতীকে দল বা জোটের প্রার্থী দেয়া হলে, আসনগুলো হারাতে হতে পারে। তবে তরুণ নেতৃত্ব হিসেবে মোহিত উর রহমান শান্তকে পছন্দ বলেও মতামত অনেকের।

চট্টগ্রাম-৯ আসনে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। আসনটিতে বর্তমান সাংসদ জাতীয় পার্টির জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। জানা গেছে, দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশে নওফেল নিয়মিত এলাকায় যাচ্ছেন, গণসংযোগ করছেন। জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি স্থানীয় রাজনীতিতে বেশ সক্রিয় তিনি। নওফেল চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র প্রয়াত এবি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে। সে হিসেবে স্থানীয় ভোটারদের কাছে তার রয়েছে আলাদা জনপ্রিয়তা। অপরদিকে জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাপার জোট গঠনেও বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। জোটবদ্ধ নির্বাচন হলে মহাজোট থেকে বাবলুকে ফের মনোনয়ন দেয়া হতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে।

এ ব্যাপারে মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল কোনো মন্তব্য করতে না চাইলেও স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয়তা যাচাই-বাছাই করেই যোগ্য প্রার্থীকে দলীয় প্রধান মনোনয়ন দেবেন বলে জানান তিনি।

এদিকে বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে খ্যাত বগুড়ার ৭টি আসনের মধ্যে ১ ও ৫ এ দুটি ছাড়া বাকি ৫টি আসনের ৪টি (২, ৩, ৬ ও ৭) জাপা ও এবং বগুড়া-৪ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের দখলে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় কিংবা ক্ষমতার বাইরে থাকলেও এ জেলার বেশিরভাগ আসনে বিএনপির প্রার্থীরা জয়ী হয়ে থাকেন।

ঢাকার মোট ২০টি আসনের মধ্যে ৩টিতে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য রয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে ঢাকা-৪ (শ্যামপুর-কদমতলী) আসনে আবু হোসেন বাবলা ও ঢাকা-৬ (সূত্রাপুর-কোতোয়ালি-গেণ্ডারিয়া ও ওয়ারী) আসনে কাজী ফিরোজ রশীদ। এ ছাড়া ঢাকা-১ (দোহার-নবাবগঞ্জ) আসনে বিশিষ্ট শিল্পপতি সালমা ইসলাম জাপার সংসদ সদস্য। ঢাকা-৪ ও ৬ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন এডভোকেট সানজিদা খানম (বর্তমানে সংরক্ষিত মহিলা সাংসদ) ও প্রধানমন্ত্রীর সাবেক একান্ত সহকারী সচিব ড. আওলাদ হোসেন। বিগত নির্বাচনেও তিনি স্বতন্ত্রপ্রার্থী হয়েছিলেন। এবারও এই আসনটি জাপাকে ছেড়ে দেয়া হলে রাজনৈতিক ও অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে কি হতে পারে, প্রশ্ন করলে ড. আওলাদ হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। একই আসন ঢাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে অন্য দলের প্রার্থীকে বারবার ছাড় দেয়া ঠিক হবে না। এতে সাংগঠনিক ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগকে অনেকটা পিছিয়ে থাকতে হয়। কারণ মহাজোট থেকে অন্য দলের প্রার্থীরা একাধিকবার সংসদ সদস্য হলে দলের সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। কর্মীরা হতাশ হয়ে যায়। জাপার সাংসদরা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করেন না। মনে হয় যেন আমরা বিরোধী দলে আছি। আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, তারা এলাকার উন্নয়নের তেমন মনোযোগী নন। ফলে তেমন উন্নয়ন হয় না, মানুষ কিন্তু ভোগান্তির কারণে আওয়ামী লীগকেই দোষারোপ করবে। কাজেই তার দাবি এবার নির্বাচনে ঢাকা-৪ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়া হোক।

অন্যান্য বিভাগীয় শহর ও মহানগরীগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামের ৫ আসনে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, পূণ্যভূমি সিলেটের ২ ও ৫ আসনে ইয়াহ্ইয়া চৌধুরী ও সেলিম উদ্দিন, রংপুর ১ ও ৩ আসনে এলজিআরডিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা ও জাপা চেয়ারম্যান হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ, নারায়ণগঞ্জ ৩ ও ৫ আসনে লিয়াকত হোসেন এবং এ কে এম সেলিম ওসমান, কুমিল্লা ২ ও ৮ এ মোহাম্মদ আমির হোসেন এবং নুরুল ইসলাম মিলন ও বরিশাল-৬ আসনে নাসরিন জাহান রত্না জাপার সংসদ সদস্য।

নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির শওকত চৌধুরী। এর আগে ছিলেন আওয়ামী লীগের কর্নেল (অব.) মারুফ সাকলান। বর্তমানে তিনি প্রয়াত। একাদশ নির্বাচনেও শওকত প্রার্থী হতে চান। তবে স্থানীয় আওয়ামী লীগ হাতছাড়া করতে চায় না আসনটি। দল ও নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই আসনটিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা। এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সৈয়দপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোকছেদুল মোমিন। তিনি বলেন, উত্তরাঞ্চলের মধ্যে (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) এ আসনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে এয়ারপোর্ট, রেলওয়ে কারখানাসহ অনেক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। এসব বিবেচনায় নৌকার একক প্রার্থী অথবা ২০০৮ এর মতো এটি উন্মুক্ত করে দেয়া হোক।

আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী কিশোরগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন বলেন, দলের অস্তিত্ব টেকাতে এ আসনটিতে এবার নৌকার প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়া হোক।

এদিকে তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে গত তিন সপ্তাহে ৩টি বিশেষ বর্ধিত সভা করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নির্বাচনকে সামনে রেখে এ সময় তৃণমূল নেতাদের বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেন তিনি। সেইসঙ্গে আগামী নির্বাচনে জোটবদ্ধভাবে অংশ নেয়ারও ইঙ্গিত দেন তিনি।

এ ছাড়া বর্তমানে যেসব আসনে জাপার প্রার্থী রয়েছে এবং আগামী নির্বাচনেও জাপার চাহিদা সেগুলো হলো এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার পটুয়াখালী-১, কিশোরগঞ্জ-৩ আসনে শ্রম প্রতিমন্ত্রী মজিবুল হক চুন্নু, ব্রাক্ষণবাড়িয়া-২ আসনে জিয়াউল হক মৃধা, চাঁদপুর-৪ আসনে মনিরুল ইসলাম মিলন, খুলনা-১ আসনে শুনিল শুভ রায়, ব্রাক্ষণবাড়িয়া-৩ আসনে রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া, ডেমড়া-যাত্রাবাড়ী-কদমতলী মিলিয়ে ঢাকা-৫ আসনে মীর আব্দুস সবুর আসুদ, রংপুর অথবা লালমনিরহাট থেকে জি এম কাদের, জামালপুর-৪ মামুনুর রশীদ, সুনামগঞ্জ-৪ পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ, হবিগঞ্জ-১ মুনিম চৌধুরী বাবু, লক্ষীপুর-২ মোহাম্মদ নোমান, জকিগঞ্জে আমিনুর রহমান তাজসহ অনেকের নাম তালিকায় রয়েছে।

নীলফামারী-৩, লালমনির হাট-১ ও ৩, রংপুর-২, গাইবান্ধা-১ ও ৩ এবং পঞ্চগড় ও দিনাজপুর থেকে একাধিক আসন জাপাকে ছেড়ে দেয়া হতে পারে বলে বিভিন্নসূত্রে জানা গেছে।

এ বিষয়ে নীলফামারী-৩ এর আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা জানান, এই আসনটি জামায়াত অধ্যুষিত ছিল। গত নির্বাচনে আমরা সেটি উদ্ধার করতে পেরেছি। বিগত ৫ বছরে এ এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে, যা স্বাধীনতার পর কোনো সরকার করেনি। কাজেই আমার বিশ^াস এ আসনটি নেত্রী হাতছাড়া করতে চাইবেন না। তারপরও দল ও জাতির বৃহৎ স্বার্থে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তই আমাদের সিদ্ধান্ত।

আওয়ামী লীগ সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য রশিদুল আলম বলেন, মনোনয়ন বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন হলে, যারা বিজয়ী হয়ে আসার মতো প্রার্থী, তারাই মনোনয়ন পাবেন। এর বেশি মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ