প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মানুষ কি গুজবেই বিশ্বাস করতে চায়?

মাসুদা ভাট্টি: পাকিস্তানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো একটি গুজবের সূত্র ধরে ভারতে ইতোমধ্যে ২৫ ব্যাক্তিকে পিটিয়ে হত্যার খবর পাওয়া গেছে। পাকিস্তানে ছড়ানো ওই গুজবে বলা হয়েছিল যে, শহরে একদল মানুষ বেরিয়েছে যারা আসলে ‘ছেলেধরা’ বা শিশুদের ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। কিন্তু ভারতে এই গুজবটিই চালু হয়েছে যে, পাকিস্তান থেকে আসা একদল মানুষ ভারতীয় শিশুদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে ভারতের একাধিক রাজ্যে ছেলেধরা সন্দেহে এরই মধ্যে এতোগুলো প্রাণহানির ঘটনা সর্বত্র এই প্রশ্নেরই জন্ম দিয়েছে যে, তাহলে কি মানুষ গুজবেই বিশ্বাস করে? কারণ, ভারতের মূলধারার গণমাধ্যম বার বার এই গুজব সম্পর্কে খবর প্রকাশ করেছে এবং এটি যে গুজব সেটি সরকারি কর্তৃপক্ষের বরাতে বলেছে, কিন্তু তারপরও ছেলেধরা সন্দেহে জনতার কাউকে পিটিয়ে মারার ঘটনাকে বন্ধ করা যাচ্ছে না। মূলধারার গণমাধ্যমের চেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত গুজবের এই যে শক্তি, তাকে অপশক্তিই বলা হচ্ছে সর্বত্র, তার ক্ষমতাকে যে এখন আর অস্বীকার করা যাচ্ছে না সেকথা নতুন করে বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। প্রশ্ন হলো, এর সমাধান কি?

বাংলাদেশের দিকে তাকাই। যুদ্ধাপরাধের বিচার চলাকালে তৎকালে ফাঁসির দ-প্রাপ্ত আসামী মাওলানা সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে, এই গুজবের ফলে যে হত্যালীলা এদেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে তাকে অবহেলা করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু তারপরও আমাদের কর্তৃপক্ষ খুউব একটা তৎপর হয়নি। বরং পরবর্তীতে আমাদের দেশেই ফেইসবুকে ধর্ম অবমাননার পোস্ট দিয়ে তা অন্য একজনের নামে চালিয়ে পুরো সম্প্রদায়কে বিপদগ্রস্ত করার অপচেষ্টায় প্রাণহাণির সংখ্যাও কম নয়। সর্বশেষ, আমরা জানি যে, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে গুজব ছড়ানোর বার বার চেষ্টা চলেছে। সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষতো বটেই, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কেউ কেউও নিরীহ ছাত্রদের উস্কে দিয়ে এই কোটা আন্দোলন থেকে ফায়দা লোটার চেষ্টা করেছেন। রাস্তার বাতি নিবিয়ে দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে বলে গুজব ছড়ানো হয়েছে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বশীল শিক্ষকের ফেইসবুক থেকে। এই লেখাটি যখন লিখছি তখনও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে কোটা আন্দোলনের একজন নেতাকে তুলে নেওয়ার গুজব ছড়িয়ে উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। পুলিশ বলেছে, তাকে আটক করে শাহবাগ থানায় রাখা হয়েছে।

এমন নয় যে, বাংলাদেশে গুম-খুনের ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব গুজব ছড়ানোর মধ্য দিয়ে যে, সত্যিকারের গুম-খুনের বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ হয় তার প্রমাণ আমরা দেখেছি যখন কবি ও এনজিও-নেতা ফরহাদ মযহার নিজেই উধাও হয়ে গেলে তার পরিবারের পক্ষ থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অভিযুক্ত করা হয় তাকে তুলে নেয়ার জন্য। আমরা এখনও পর্যন্ত জানতে পারিনি, আসলেই কী ঘটেছিল ফরহাদ মযহারের সঙ্গে। না তিনি বলছেন, না আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আমাদের জানাচ্ছে। ফলে সর্বত্রই একটি অবিশ্বাসের জায়গা তৈরি হচ্ছে। জমা হচ্ছে প্রশ্ন কিন্তু কোনো পক্ষই আমাদেরকে সঠিত উত্তরটি জানাচ্ছেন না।

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম মানুষকে অনেক ক্ষেত্রেই শক্তিশালী করেছে, বিশেষ করে দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে মানুষকে একত্রিত করার ক্ষেত্রে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম মানুষকে যে সত্যিই অতি মাত্রায় সংবেদনশীল, গুজব-প্রবণ এবং স্বার্থপরও করে তুলছে সেটিও এখন গবেষকরা জানাচ্ছেন আমাদের। সবচেয়ে বড় কথা হলো, মূলধারার গণমাধ্যমের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম অত্যন্ত নিম্নমানের মিথ্যাচারের পথকে বেছে নিয়েছে এবং এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত মানুষ, যাদেরকে গুজবে বিশ্বাস করানো খুউব সোজা। গণমাধ্যমের জবাবদিহিতা ও দায়িত্বশীলতা সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার নেই, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের সেটি নেই। যদিও ফেইসবুকের প্রতিষ্ঠাতা জাকারবার্গ সেটি নিশ্চিত করার কথা বলছেন, কিন্তু কী ভাবে করবেন সেটি এখনও স্পষ্ট নয়। কিন্তু ততোদিন কি মানুষ এরকম গুজবের ভিত্তিতে স্বগোত্রীয় মানুষকেই হত্যা করবে? হত্যার মিছিল কি দীর্ঘায়িতই হবে? আগেই বলেছি প্রশ্ন অনেক, কিন্তু উত্তরটাও যে মানুষকেই খুঁজে বের করতে হবে সেটাওতো সত্যি, তাই না?

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ