প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

হাসপাতালে কারাবন্দির ‘মুক্ত’ জীবন

ডেস্ক রিপোর্ট : ঢাকা মেডিকেল কলেজে ‘মুক্ত পরিবেশে’ হাজত খাটছেন বহুল আলোচিত ফারমার্স ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির আসামি রাশেদুল হক চিশতী। কারারক্ষীদের উপস্থিতিতে হাসপাতালে বহিরাগতদের সঙ্গে বৈঠক করছেন তিনি। তার ‘সেবার’ জন্য রয়েছেন চারজন লোক। কারাবন্দি রাশেদ হাসপাতালে ‘দর্শনার্থী’দের সাক্ষাৎ দিচ্ছেন। সমকাল তার ওপর নজর রাখছে- তা টের পেয়ে বদলেছেন ওয়ার্ডও।

ঋণ জালিয়াতির মামলায় গত ৮ এপ্রিল ফারমার্স ব্যাংকের অডিট কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতী (বাবুল চিশতী), তার ছেলে রাশেদুল হক চিশতীসহ চারজনকে গ্রেফতার করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ঋণ সুবিধা দিয়ে ১৪৫ কোটি টাকা ঘুষ নিয়েছেন। ঘুষের ১৩৮ কোটি ৮২ লাখ ৯২ হাজার ৬৪২ টাকা বাবুল চিশতী, রাশেদ চিশতীর মালিকানাধীন বখশীগঞ্জ জুট স্পিনার্স মিলের ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে। ঋণ কেলেঙ্কারিতে প্রতিষ্ঠার চার বছরের মধ্যেই ধুঁকছে ফারমার্স ব্যাংক। ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ ছাড়তে হয়েছে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরকে।

আলোচিত ঋণ কেলেঙ্কারির মামলায় গ্রেফতারের দুই সপ্তাহ পর ‘চোখের চিকিৎসার জন্য’ রাশেদ চিশতীকে কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ঢাকা মেডিকেলে আনা হয়। হাসপাতালের ৩০১ নম্বর ওয়ার্ডে ‘চিকিৎসাধীন’ ছিলেন তিনি। গত ১২ জুন ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে দেখা যায়, আট শয্যার ওই ওয়ার্ডে রাশেদ ছাড়াও রোগী রয়েছেন দু’জন। বাকি বেডগুলোতে থাকেন রাশেদের সেবাযত্নের জন্য নিয়োজিতরা।

বেলা ৩টার দিকে দেখা যায়, রাশেদ মুক্ত অবস্থায় পায়চারী করছেন। বাম হাতে লাগানো হাতকড়া লাল গামছায় মোড়ানো। সাদা লুঙ্গি ও গেঞ্জি পরিহিত রাশেদ ওয়ার্ডের লাগোয়া বেলকনিতে বসে ধূমপানের পর ওয়ার্ডের বাইরে হাসপাতালের করিডরে হাঁটতে বের হন। কারারক্ষী জাহিদ হোসেন জামান ওয়ার্ডে বসে পত্রিকা পড়ছিলেন। রাশেদের সঙ্গে হাসপাতালের একজন কর্মচারীসহ তিন বহিরাগত ছিলেন।

রাশেদের সঙ্গে পালাক্রমে হাসপাতালে থাকেন সাইফুল ইসলাম সবুজ, হিরনসহ চার যুবক। কারাবন্দি আসামির সঙ্গে থাকার সুযোগ কীভাবে পেয়েছেন জানাতে চাইলে তাদের একজন সমকালকে বলেন, ‘বড় মানুষদের জন্য সব জায়গায় সুবিধা আছে। তারা হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক। তারা কী জেলে পচে মরবে!’

করিডরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে প্রায় আধাঘণ্টা সঙ্গীদের আলাপ শেষে আবার ওয়ার্ডে ফেরেন রাশেদ। কারারক্ষী তখন ওয়ার্ডের দরজায় দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন। ওয়ার্ডে ফিরে আবারও বেলকনিতে বসে ধূমপান করেন। গোপন ক্যামেরায় মুক্ত অবস্থায় রাশেদের ঘোরাফেরা রেকর্ড করেন এ প্রতিবেদক। এক মিনিট এক সেকেন্ড ও তিন মিনিট ছয় সেকেন্ডের দুটি ভিডিও ক্লিপ সমকালের কাছে রয়েছে।

সাংবাদিক পরিচয় না দিয়ে হাসপাতালের কর্মচারীর সঙ্গে কথা হয়। রাশেদের কী রোগ, কেন হাসপাতালে আছেন তা জানতে চিকিৎসকের সন্ধান করলে তিনি ওয়ার্ডের বিপরীতে একটি কক্ষে নিয়ে যান। সেখানে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে রাশেদের রোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে মেডিকেল অফিসার বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান।

সাংবাদিক পরিচয়ে রাশেদের মুক্তভাবে ঘুরে বেড়ানোর বিষয়ে কারারক্ষী জাহিদ হোসেন জামানের সঙ্গে কথা হয়। তিনি রাশেদের সঙ্গের ‘আলোচনায়’ বসার প্রস্তাব দেন। ওয়ার্ডের বেলকনিতে বসে রাশেদের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানালেন, লিমন নামের একজন চিকিৎসকের অধীনে তিনি চিকিৎসাধীন। তার বাম চোখের কর্নিয়া ‘পাতলা’ হয়ে গেছে। রাশেদের চোখে ব্যান্ডেজ বা কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা না গেলেও তিনি দাবি করেন, অন্ধত্বের ঝুঁকি রয়েছে তার। কারাগারে যাওয়ার পর তিনি বুকব্যথা ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন। জেলের পরিবেশের সঙ্গে কিছুতেই মানিয়ে নিতে পারছেন না।

রাশেদ দাবি করেন, ফারমার্স ব্যাংকের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক ছিল না। তার বাবা বাবুল চিশতীর মালিকানাধীন বখশীগঞ্জ জুট স্পিনার্স মিল দেখাশোনা করতেন। ফারমার্স ব্যাংকের ঋণগ্রহীতারা জুট মিলের ব্যাংক হিসাবে যে ১৩৮ কোটি টাকা দিয়েছেন এ বিষয়েও তার ধারণা নেই। মামলার তথ্যানুযায়ী, ঘুষের টাকায় ব্যাংকের শেয়ার কিনেছিলেন চিশতী ও তার পরিবারের সদস্যরা। গত বছরের ৭ মার্চ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত এক কোটি ৩০ লাখ টাকার শেয়ার কেনা হয়। রাশেদের নামে কেনা হয় ১০ লাখ টাকার শেয়ার। রাশেদের দাবি, এ বিষয়েও তিনি কিছু জানতেন না।

হাসপাতালে থেকে বহিরাগতদের সঙ্গে বৈঠক, মুক্ত পরিবেশে ঘুরে বেড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে রাশেদ অনুরোধ করেন এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ না করতে। ধারণকৃত ভিডিও মুছে ফেলার বিনিময়ে এ প্রতিবেদককে ঘুষের প্রস্তাব দেন।

এর দু’দিন পরই ওয়ার্ড বদল করেন রাশেদ। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৬০২ নম্বর ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয় তাকে। এই মেডিসিন ওয়ার্ডের ৯ নম্বর ইউনিটের ১৮ নম্বর (অতিরিক্ত) শয্যায় ভর্তি রয়েছেন তিনি। এক সপ্তাহ খোঁজ করে তার নতুন অবস্থান জানা যায়। গত শনিবার (২৩ জুন) সেখানে গিয়ে দেখা যায়, রাশেদ আগের মতোই ‘মুক্ত পরিবেশে’ রয়েছেন। বারান্দায় চেয়ারে বসেছিলেন। এ প্রতিবেদকের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি বিছানায় চলে যান। এর কয়েক ঘণ্টা পর রাশেদের এক আত্মীয় ফোন করে জানতে চান, এই প্রতিবেদক হাসপাতালে গিয়েছিলেন কি-না। তিনিও অনুরোধ করেন সংবাদ প্রকাশ না করতে।

ঢাকা মেডিকেলের ৬০২ নম্বর ওয়ার্ডে জাহিদ হোসেন হিমেলের অধীনে চিকিৎসাধীন রাশেদ চিশতী। তিনি সেদিন হাসপাতালে ছিলেন না। কর্তব্যরত মেডিকেল অফিসার আরমান হোসেন জানান, সংশ্নিষ্ট চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে দেখছেন রাশেদ কী কী সমস্যায় ভুগছেন। সে অনুযায়ী তাকে চিকিৎসা দেওয়া হবে। রাশেদের বুকে ব্যথা আছে কি-না? এ প্রশ্নে তিনি জানান, বুকের ব্যথার রোগীকে করোনারি কেয়ার ইউনিটে নেওয়া হয়। মেডিসিন ওয়ার্ডে নয়।

ময়মনসিংহ মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক শাহীনুর রহমান অভিযোগ করেছেন, হাসপাতাল থেকে তাকে হুমকি দিচ্ছেন রাশেদ। ফারমার্স ব্যাংক থেকে ঋণ দেওয়ার কথা বলে বাবুল চিশতী ও রাশেদ চিশতী তার কাছ থেকে সাড়ে আট কোটি টাকা ঘুষ নিয়েছেন। পৈতৃক জমি বন্ধক রেখে এক কোটি ৩০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। সেখান থেকে ৭০ লাখ টাকা তুলে নেন বাবুল চিশতী। রাশেদের উপস্থিতিতে বাবুল চিশতীকে দুই কোটি টাকা দেন তিনি। টাকা ফেরত না পেয়ে ময়মনসিংহ জেলা জজ আদালতে মামলা (মামলা নম্বর ০৫/২০১৭) করেন শাহীনুর রহমান।

শাহীনুর জানান, আদালত দুদককে অভিযোগ তদন্ত করার নির্দেশ দেন। শাহীনুরের অভিযোগ, মামলা করায় তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করেন বাবুল চিশতী। ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। হাসপাতালে অবস্থান করে বহিরাগতদের সঙ্গে বৈঠক ও মোবাইল ব্যবহারের বিষয়ে জানতে বারবার চেষ্টা করেও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবিরের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সূত্র : সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত