প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিএনপির সঙ্গে আন্দোলনে রাজি উদারপন্থী ৫ দল

ডেস্ক রিপোর্ট : বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী জোট হবে কি না সে প্রশ্নের মীমাংসা এখনো না হলেও মৌলিক বা গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইস্যুতে আপাতত দলের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে যেতে সম্মত হয়েছে বিকল্পধারা, গণফোরামসহ উদারপন্থী হিসেবে পরিচিত পাঁচটি দল। অন্য দলগুলো হলো জেএসডি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও নাগরিক ঐক্য।

নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী আগস্ট মাস থেকে ভিন্ন মঞ্চ থেকে দলগুলো একই কর্মসূচি পালন করতে যাচ্ছে। ওই কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে ঘনিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারলে প্রথম ধাপে একমঞ্চে এবং দ্বিতীয় ধাপে নির্বাচনী জোটে রূপ লাভ করবে। সূত্রমতে, জোটের নাম হতে পারে ‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট’ বা ‘বৃহত্তর যুক্তফ্রন্ট’। তবে নামকরণ যাই হোক না কেন সম্ভাব্য ওই ফ্রন্টের নেতৃত্বে কে থাকবেন বা আহ্বায়ক কে হবেন তা নিয়ে কিছুটা অস্পষ্টতা রয়েছে। রয়েছে নানামুখী আলোচনাও।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বৃহত্তর ঐক্যের প্রচেষ্টা অনেক দিন ধরেই চলছে। ওই ঐক্য প্রতিষ্ঠা হলে যুগপৎ আন্দোলন তো হতেই হবে।’ তিনি বলেন, ‘ধাপে ধাপে বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠাসহ কতগুলো বিষয়ে আমরা প্রায় ঐকমত্যের কাছাকাছি।’

দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম জানান, বৃহত্তর ঐক্য প্রচেষ্টার কাজ এগিয়ে চলছে। সময়ে তা রূপ লাভ করবে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠাসহ নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ছাড়া দেশের রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হবে না—এ বাস্তবতা এখন বিএনপির পাশাপাশি দেশের অন্য দলগুলোও অনুধাবন করতে শুরু করেছে। ফলে আমাদের একত্রিত হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।’

গত বছরের ৪ ডিসেম্বর অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে চেয়ারম্যান করে চারটি দলের সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে যুক্তফ্রন্ট। বি. চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারা ছাড়া জোটের অন্য দলগুলো হলো জেএসডি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও নাগরিক ঐক্য। ওই সময় ড. কামাল হোসেনের দল গণফোরাম যোগ না দিলেও সম্প্রতি তিনি যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে কাজ করতে রাজি হয়েছেন বলে জানা যায়।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনের আগে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে পাঁচটি দলের সমন্বয়ে গঠিত যুক্তফ্রন্ট সেই নির্বাচনে ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৮টিতেই জয়ী হয়েছিল।

বিএনপিসহ সংশ্লিষ্ট দলগুলোর মধ্যে আলোচনা হলো বৃহত্তর ঐক্য বা যুক্তফ্রন্টের আদলে কোনো মোর্চা হলে তার একজন আহ্বায়ক থাকতে হবে। আর বড় দল হিসেবে বিএনপির একজন নেতারই ওই পদ পাওয়ার কথা। কিন্তু বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে, দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও লন্ডনে। সংগত কারণেই তাঁরা হাল ধরতে পারছেন না। এঁদের বাইরে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মধ্যে রয়েছেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ দুজনের একজনকে প্রধান হিসেবে উদারপন্থীরা মেনে নেবে কি না সে প্রশ্ন যেমন রয়েছে, তেমনি সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিকল্পধারার সভাপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী আহ্বায়ক হলে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের অবস্থান কী হবে সে প্রশ্নও আছে। পাশাপাশি নির্বাচনে জয়লাভ করলে কার কী অবস্থান হবে এ প্রশ্নও নিষ্পত্তি হতে হবে। কিন্তু বি. চৌধুরীর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিএনপির মধ্যে অনেকের প্রশ্ন আছে। আবার বি. চৌধুরী এ ধরনের জোটের প্রধান হলে কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন এলডিপির ২০ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। কারণ অলি ও বি. চৌধুরীর মধ্যে অত্যন্ত বৈরী সম্পর্ক বিদ্যমান বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা আছে। অলি আহমেদ বেরিয়ে গেলে তাঁর সঙ্গে ২০ দল থেকে আরো দু-একটি ছোট দল বেরিয়ে যেতে পারে বলে আলোচনা আছে। শুধু তাই নয়, উদারপন্থী বলে পরিচিত ওই দলগুলোর সঙ্গে শেষ পর্যন্ত ঐক্য হলে জামায়াত আনুষ্ঠানিকভাবে জোট থেকে বেরিয়ে যাবে বলে সবাই নিশ্চিত। ফলে শেষ পর্যন্ত কী হবে সে নিয়ে কিছুটা সংশয় রয়েছে।

অবশ্য এর বিপরীত আলোচনাও আছে ওই দলগুলোর মধ্যে। কেউ কেউ মনে করেন, এ ধরনের ফ্রন্টের প্রধান বা আহ্বায়ক হওয়ার প্রয়োজনই নেই। তাঁদের মতে, ১৪ দলীয় জোটের মুখপাত্র হলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহম্মদ নাসিম; আর সমন্বয়ক হলেন সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। এতে কাজ চালিয়ে নেওয়া কঠিন কিছু নয়। তা ছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব পদ নিয়ে প্রতিযোগিতা করার সময় নয় বলেও অনেকে যুক্তি দিচ্ছেন। বিএনপি ও উদারপন্থী দলগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিচিত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী কিছুদিন আগে বি. চৌধুরীর বাসায় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে সবাইকে ‘ছাড়’ দিয়ে বৃহত্তর ঐক্যে শামিল হওয়ার কথা বলেছেন।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করে দেশে ফিরেছেন। তারেক রহমান বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন বলে সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকে জানিয়েছেন ফখরুল। বিএনপি সূত্রের দাবি, ওই বৈঠক থেকেই ঐক্য প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার জন্য ফখরুলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এরপরই সম্ভাব্য ওই প্রক্রিয়া কিছুটা গতি পেয়েছে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়া, নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন—এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অভিন্ন ইস্যুতে একসঙ্গে আন্দোলন করতে সম্মত হয়েছে সরকারের বাইরে থাকা উদারপন্থী ওই দলগুলো। তবে এর সঙ্গে বিএনপির নতুন একটি দফা বা পয়েন্ট যুক্ত হয়েছে, সেটি হলো খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি। উদারপন্থী দলগুলো ওই দাবির যৌক্তিকতা মেনেও নিয়েছে। অন্যদিকে উদারপন্থী দলগুলোর মধ্যেও আবার মৌলিক কিছু দাবি রয়েছে। যেমন দুই-একটি দল প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানোর পক্ষে। ফলে শেষ পর্যন্ত কত দফা বা পয়েন্টে দলগুলো একমত হবে সে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়।

বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা জানিয়েছেন, ৯ বা ১১ দফা দাবিতে ঐকমত্য হতে পারে। ওই নেতা বলেন, বিএনপিসহ সংশ্লিষ্ট সব দলকে একটি করে খসড়া প্রস্তাব তৈরি করতে বলা হয়েছে। ওই সব প্রস্তাবের মধ্যে কমন ইস্যুগুলোতে ঐকমত্যের ভিত্তিতে যুগপৎ আন্দোলনের সূচনা করা হবে।

গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কমন কিছু ইস্যুতে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করে যুগপৎ আন্দোলন হবে বলে শুনছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘বিএনপি এবার খুব আন্তরিক। প্রস্তাবনাগুলো তৈরি হচ্ছে। তবে দুই-একজন নেতা খুব ভীতু, এ জন্যই দেরি হচ্ছে।’

সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী অবশ্য কালের কণ্ঠকে বলেন, এ বিষয়ে বলার মতো সময় এখনো হয়নি, হলে তিনি জানাবেন।

গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘যুগপৎ আন্দোলন যদি হয় হতে পারে। কিন্তু এখনই বলার মতো কিছু হয়নি।’ তবে দলটির নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী কালের কণ্ঠকে স্পষ্ট করেই বলেন, বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন এখন সময়ের দাবি এবং পরিস্থিতি ওই দিকেই যাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনসহ বেশ কিছু দাবির ভিত্তিতে আমরা একমত হয়েছি। এসব ইস্যুতে প্রথমে যুগপত্ভাবে কর্মসূচি পালন করা হবে। পরে রাজনৈতিক জোটও হতে পারে।’

জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যুগপৎ আন্দোলনের বিষয়ে আলোচনা চলছে। বিস্তারিত পরে জানাব।’

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘যুগপৎ আন্দোলন হতেই পারে। কারণ আমরা বহু দিন ধরে ঐক্যের কথা বলছি। এরই মধ্যে যুক্তফ্রন্টও গঠন হয়ে গেছে।’
সূত্র : কালের কন্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত