প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মেজর মিজানকে ‘এমপি’ মনোনয়নের টোপ দিয়েছিল বিএনপি

ডেস্ক রিপোর্ট : বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মেজর (অব) মিজানুর রহমান মিজানকে সাভার-আশুলিয়া সংসদীয় নির্বাচনী এলাকায় জাতীয় সংসদের মনোনয়ন দেয়ার প্রলোভন দেখিয়েছিল বিএনপি।

এই টোপ গিলে গাজীপুর সিটি নির্বাচনে বড় ধরনের নাশকতা, ধ্বংসাত্মক কর্মকা-, বিএনপির কর্মীদের আওয়ামী লীগের কর্মী সাজিয়ে জাল ভোট প্রদান, অপপ্রচারের মাধ্যমে নির্বাচন বানচাল, বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য ছক কষেছিলেন তিনি। আদালত থেকে দুই দিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ ও জবানবন্দী গ্রহণের পর মেজর (অব) মিজানুর রহমানকে আদালতের মাধ্যমে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। সাভার-আশুলিয়া সংসদীয় আসনে বিএনপির সাবেক এমপি ডাঃ দেওয়ান সালাউদ্দিনের পরিবর্তে অবসরপ্রাপ্ত মেজর মিজানকে এমপি পদে মনোনয়ন দেয়ার প্রলোভনের টোপ গিলতে বিএনপির অনেক কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে কথাবার্তা হয়েছে তার।

দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করে ঘনিষ্ঠ হওয়ার জন্য গাজীপুর সিটি নির্বাচনে ষড়যন্ত্রকে বেছে নেন তিনি। লন্ডনে অবস্থানরত সাজাপ্রাপ্ত আসামি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে কথাবার্তা হয়েছে তার। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন কেন্দ্র করে মেজর অবসরপ্রাপ্ত মিজান যে ষড়যন্ত্র করেছেন সেই বিষয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে শফিকুল ইসলাম ও জিন্নাত আলী নামের দুই বিএনপি কর্মী।

ডিবি সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মেজর (অব) মিজানুর রহমানকে আদালত থেকে দুই দিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ ও জবানবন্দী গ্রহণ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে আসাদ আলীকেও। এর আগে শফিকুল ইসলাম ও জিন্নাত আলী বৃহস্পতিবার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়ার পর তাদেরকেও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। রাজধানীর কলাবাগান ক্লাবে ৪ যুবকের সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপি নেতা মেজর (অব) মিজানুর রহমান মিজান। ওই ৪ যুবকের নাশকতায় অংশ নেয়ার কথা ছিল। নাশকতার ভিডিও ও ছবি ধারণ করতে তাদের হাতে ‘স্পাইক্যাম’ সংযুক্ত হাতঘড়ি দেন মেজর মিজান। ইউটিউবে ফাঁস হওয়া অডিও ক্লিপেও এ তথ্য পাওয়ার পর আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন ডিবির ডিসি (উত্তর) মশিউর রহমুান।

তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডিবি সূত্র জানায়, মেজর মিজান গাজীপুর সিটি নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত করার বিষয়ে বিএনপির কর্মীদের সঙ্গে টেলিফোনে যে কথোপকথন করেছেন সেই অডিও টেপ ও যার সঙ্গে কথোপকথন করেছেন সেই শফিকুল ইসলাম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে ষড়যন্ত্রের পুরো ঘটনার বর্ণনা করেছেন। আদালতে দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে শফিকুল ইসলাম ও জিন্নাত আলী বলেছেন, কলাবাগান ক্লাবে বসে যে ৪ যুবকের সঙ্গে গোপন বৈঠক করে গাজীপুর সিটি নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত করার ষড়যন্ত্র করা হয়। এই দুই জন স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন ঢাকা মহানগর মুখ্য হাকিমের আদালতের বিচারক আহসান হাবিব ও একেএম মঈনুদ্দিনের আদালতে। স্বীকারোক্তিমূূূূূলক জবানবন্দী দেয়ার পর তাদেরকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে ওই দুজন তাদের নিয়ে মেজর মিজান যে নীলনক্সা তৈরি করেছিলেন তার বর্ণনায় বলেছে, মেজর মিজান গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ক্ষতিকর উপাত্ত উপস্থাপন করে উস্কানি প্রদান করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও জনগণের মাঝে ভীতি ও সন্ত্রাস ছড়িয়ে দিয়ে নিজস্ব রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সফলের জন্য একটি কুচক্রী মহলের সঙ্গে প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। গত ২৬ জুন গাজীপুর সিটি নির্বাচন নিয়ে জনগণের মাঝে বিভ্রান্তি ও নাশকতা সৃষ্টির জন্য বিএনপি কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য গ্রেফতারকৃত প্রধান আসামি মেজর মিজানসহ অন্যরা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ষড়যন্ত্র করেন।

নির্বাচনের আগের দিন গত ২৫ জুন ধানম-ির কলাবাগান ক্লাবে বসে বিকেল সাড়ে চারটায় মেজর মিজান অন্যদের নিয়ে বৈঠক করে এবং ভোটকেন্দ্রের ব্যালট পেপার দখল করে নৌকায় সিল মেরে সেই দৃশ্য রিস্টওয়াচের ভিডিও ক্যামেরায় ধারণ করে পরে তা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারের দিক নির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন মেজর মিজান। নির্বাচনের দিন গাজীপুরের কাশিমপুর ইউনিয়নের তিন ভোটকেন্দ্রে ‘আওয়ামী লীগের ব্যাজ ও নৌকার ব্যানার’ নিয়ে ঘুরতে পারবে এ রকম তিনজনকে ‘ম্যানেজ’ করতে বলেন। সেজন্য টাকাপয়সা ও ভোটের দিন ‘যন্ত্রপাতি’ দেয়া হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি। তিনি নির্দেশ দেন যে, পোলিং সেন্টার তিনটার যে কোন একটা এই পোলিং সেন্টারের পাশে থাকতে হবে। যে বাড়ির ভেতরের জানালার ভেতরে কিংবা দোতলা বাড়ি থাকলে সেখান থেকে ভিডিও করে ছবি তুলে তা প্রচার করে দিতে হবে।

ঢাকা মহানগর ডিবির এক কর্মকর্তা বলেন, বিএনপি নেতা মিজানকে গ্রেফতারের পর রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর ৪ জনকে গ্রেফতার করার পর তাদের জবানবন্দীতে জানা যায়, ২০০৮ সাল থেকে মেজর মিজানের সঙ্গে আশুলিয়ার শিমুলিয়া ইউনিয়নের যুবদল নেতা শফিকুল ইসলামের পরিচয়। তাদের মধ্যে প্রায়ই ঢাকায় দেখা হতো। তারা নিয়মিত ফোনেও যোগাযোগ রাখেন। গাজীপুর সিটি নির্বাচন কেন্দ্র করে মেজর মিজান নতুন নাশকতার চক্রান্ত করেন। ৩ দিন আগে গত ২৩ জুন মিজান তার নিজের মোবাইল ফোন থেকে শফিকুলকে ফোন দেন এবং গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে তার নাশকতার ষড়যন্ত্রের কথা জানান। শফিকুল ফোনেই মিজানকে সহযোগিতা ও নাশকতা করার জন্য সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শফিকুলের সহযোগিতা চান মিজানুর রহমান। মিজানের কথামতো শফিকুল টাকার বিনিময়ে ৪ তরুণের সঙ্গে চুক্তি করে। কাজ বুঝে নিতে ঢাকায় মিজানের কাছে পাঠানো হয় তরুণদের। গত ২৫ জুন একটি প্রাইভেট কারে করে ৪ যুবককে মিজানের কাছে পাঠায় শফিকুল। ওই চার যুবক হলো কফিল উদ্দিন, জয়, আসাদুল ও জিন্নাহ। মিজান এসময় কলাবাগান ক্লাবে ছিলেন। কলাবাগান ক্লাবে তাদের মধ্যে বৈঠক হয়। বৈঠকের সময় মিজান ১০ হাজার নগদ টাকা দেন তাদের। কাজ হওয়ার পর তাদের আরও টাকা দেয়ার কথা ছিল। টাকা দেয়ার পর ‘স্পাইক্যাম’ সংযুক্ত হাতঘড়িও দেয়া হয় তাদের। তাদের বিরুদ্ধে নাশকতার চক্রান্ত বাস্তবায়নের অভিযোগ আনা হয়েছে যাতে কলাবাগান ক্লাবে মিজান এবং ওই ৪ তরুণের গোপন বৈঠকের সময়ে আরও কয়েক ব্যক্তি ছিল।

তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, গাজীপুর সিটি নির্বাচনে বিএনপির কর্মীদের ‘আওয়ামী লীগের ব্যাজ ও নৌকার ব্যানার’ দিয়ে কর্মী সাজিয়ে ভোট কেন্দ্রে ঢুকে বড় ধরনের নাশকতা, ধ্বংসাত্মক কর্মকা-, জাল ভোট প্রদান, অপপ্রচারের মাধ্যমে নির্বাচন বানচাল, বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য ছক কষে বিএনপি। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক ও সজাগ থাকায় বিএনপির এই ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে যাওয়ায় গাজীপুর সিটি নির্বাচন বানচাল, বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করা থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হওয়া যায়। মিজানকে গ্রেফতারের পর মঙ্গলবার রাতে বিশেষ ক্ষমতা আইনে ধানম-ি থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। গোয়েন্দা পুলিশের (উত্তর) উত্তরা জোনাল টিমের এসআই সাইফুল ইসলাম ওই মামলার বাদী। গাজীপুর সিটি নির্বাচনের আগের রাতে গুলশানের বাসা থেকে মিজানকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। এরপর মঙ্গলবার ভোটের দিন সকাল ছয়টায় আশুলিয়ায় বিকেএসপির মূল ফটকের সামনের রাস্তায় জড়ো হওয়ার সময় মামলার বাকি চার জনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃত ৪ জন হচ্ছে শফিকুল ইসলাম (৪৩), মো. জিন্নাত (২৬), জুনায়েদ হোসেন জয় (১৬) ও আসাদ আলী (২২)। মেজর মিজানসহ চার জনকেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পঠিয়ে দেয়া হয়েছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, মেজর মিজান ডিবির কাছে দেয়া জবানবন্দীতে বলেছেন, সাভার-আশুলিয়া সংসদীয় আসনে তাকে এমপি পদে মনোনয়ন দেয়ার প্রলোভন দেয়া হয়। এ জন্য গাজীপুর সিটি নির্বাচনকে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য আশুলিয়া এলাকাকে বেছে নেয় হয়, যা গাজীপুর সিটিতে অন্তর্ভুক্ত। এই নির্বাচনী এলাকায় নির্বাচনের সময়ে কিছু একটা করা গেলে কারাবন্দী খালেদা জিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাবে বলে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ থেকে আশ্বাস দেয়া হয়। এ ছাড়া লন্ডনে অবস্থানরত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তার ওপর সন্তুষ্ট হলে সাভার-আশুলিয়ায় এমপি পদে মনোনয়ন পাওয়াটা খুব সহজ হবে বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানান তিনি। গাজীপুর সিটি নির্বাচন নিয়ে নীলনক্সা করার পর আশুলিয়ার বিএনপির কর্মী শফিকুল ইসলামের সঙ্গে টেলিফোনে যে কথোপকথন হয়েছে ডিবির কাছে দেয়া জবানবন্দীতে টেলিফোনের অডিওর কণ্ঠস্বরটি মেজর (অব) মিজানেরই বলে স্বীকার করেছেন তিনি। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা মেজর মিজানকে কারাগারে পাঠানোর আগে দুই দিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে ১৬১ ধারায় তার জবানবন্দী রেকর্ড করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। সূত্র : জনকণ্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত