প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

ফুটবলের বুট, গাজীপুরের ভোট আর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট

কাকন রেজা : নচিকেতা গানে বলেছেন অন্ধের দেশে চশমা বিক্রির কথা। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক পরিমন্ডলের প্রকৃত চিত্রটি তাই। ২৬ জুন গাজীপুর সিটির নির্বাচন ছিল। নির্বাচনের কেচ্ছা-কাহিনি দেশিয় সকল গণমাধ্যম কমবেশি প্রকাশ করেছে, বাদ যায়নি বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোও। রাতে আর্জেন্টিনার খেলাও ছিল। আর্জেন্টিনার জীবনমরণের লড়াই ছিল সেদিন, জিতে গিয়েছিল আর্জেন্টিনা। অথচ সেদিন গাজীপুরের নির্বাচনে শাসকদলের জীবনমরণের লড়াই ছিল না, হেরে গেলেও নকআউট পর্বে যাওয়া ছিল নিশ্চিত। কিন্তু তারপরেও কেন এমন মরিয়া চেষ্টা! এ যেন রবীন্দ্রনাথের কাদম্বিনীর দশা, ‘কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল সে মরে নাই’। জীবিত থাকার প্রমান করার জন্য যদি মরতেই হলো তবে সেই জীবিত থাকার মূল্য কী!

যাক গে, রাজনীতি নিয়ে যত কম কথা বলা যায় ততই মঙ্গল। যেখানে রাজ ও নীতি দুটি আলাদা বিষয় দাঁড়ায় সেখানে মূলত বলার কিছু থাকে না, দেখার থাকে। রাজনীতি উপলক্ষে আলাপের মূল বিষয়টি হলো কিছু মানুষের চিন্তার জগত নিয়ে। হালের সামাজিকমাধ্যমগুলো হয়েছে মানুষ চেনার চমৎকার ক্ষেত্র। একজন মানুষের ‘টাইমলাইন’ ঘুরে আসলে মোটামুটি তার সম্পর্কে ধারণা দাঁড় করানো যায়। সে কারণেই গাজীপুরের নির্বাচন ও আর্জেন্টিনার খেলার বিষয়টি নিয়ে আসা।

আমাদের রাজনৈতিক যে দ্বন্দ্ব তা মূলত নির্বাচনকে ঘিরেই এবং সারা বিশ্বও সে সম্পর্কে অবহিত। জাতিসংঘের আলোচনাতেও বাংলাদেশ প্রসঙ্গে উঠে আসছে নির্বাচনের বিষয়টি। কিন্তু দেশের এক শ্রেণির দাবীকৃত ইন্টেলেকচুয়ালের মনোজগতে এ নিয়ে সিরিয়াস কোনো ভাবনা নেই। যদি থাকতো, তাহলে গাজীপুর নির্বাচন নিয়ে টুকরোটাকরা স্ট্যাটাস, বক্তব্য, মন্তব্য সন্ধ্যা পর্যন্ত ছিল ‘ফেসবুক’সহ অন্যান্য সামাজিকমাধ্যমে। কিন্তু রাত গড়াতেই গাজীপুর বেমালুম উধাও, জায়গা করে নিল আর্জেন্টিনা। নির্বাচন হলো সমস্যা, যার সমাধানের উপর নির্ভর করছে ভবিষ্যতের জীবনযাপন। বিপরীতে খেলা হলো ¯্রফে মনোরঞ্জন, আবেগজনিত ক্রিয়াকলাপ।

দক্ষিণ এশিয়ার ইন্টেলেকচুয়ালদের সমস্যাটা এখানেই। এদের বড় একটা অংশ জীবনমান বলতে বোঝেন মনোরঞ্জনের বিষয়টি। রাজনৈতিক, সামাজিক সমস্যার চেয়ে এদের কাছে বড় দাঁড়ায় শ্রীদেবীর মৃত্যু, সানি লিওনের ঠেঁটের রঙ। এরা শাকিব খান ও অপুর সংসার নিয়ে মেতে থাকেন, উল্টোদিকে রাজনৈতিক খেয়ালিপনায় নিজেদের সংসারের বারোটা বেজে সারা। এক ইন্টেলেকচুয়াল ‘ফেসবুকে’ লিখলেন, আর্জেন্টিনার জন্য তার দোয়া বৃথা যায়নি, এমনটা। বিজ্ঞানমনষ্কতার দাবীদার আরেকজনতো বিজ্ঞানের বারোটা বাজিয়ে ভবিষ্যত বাণী করে ফেললেন, আর্জেন্টিনা জিতবে। তার ভবিষ্যত বাণীকে স্বার্থক করেছে আর্জেন্টিনা। এমন বিজ্ঞানমনষ্কের এবার বিজ্ঞান ছেড়ে দিয়ে যোগী আদিত্যনাথের শিষ্য যাওয়াই ভালো।

মানুষের জীবনে মনোরঞ্জনের প্রয়োজনীয়তা অবশ্য স্বীকার্য, কিন্তু তা কখন? আপনার স্ত্রী অসুখে কষ্ট পাচ্ছেন, তাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাবেন, না সিনেমায়? জটিল বিষয়ের সহজ উদাহরণ এবং প্রশ্ন, বুঝতে পারলে এমন প্রশ্নের উত্তরটুকুই জটিলতা নিরসনে যথেষ্ট। জানি, যুদ্ধের মাঝেও মানুষ যৌনতা খোঁজে, সৈনিকরা যুদ্ধের অবসরে খেলে, গান গায়- এমন কথা বলবেন অনেকে। এখানে যৌনতার বিষয়টি মনোরঞ্চন নয় শারীরিক প্রয়োজন। যোদ্ধারা, যারা হয়তো কালই শেষ হতে পারে তার যাপিত জীবন, এমন অবস্থায় তাদের খেলা-গানকে বলা যায় ‘বিষাদের হাসি’। এর সাথে চা-কফি-সিগারেট আর বিরিয়ানি সহকারে জম্পেশ খেলা দেখার তুলনা করতে যাওয়া চিন্তার দৈন্যতা।

বিশ্বকাপে সারা বিশ্বই মেতেছে, মাতবেই। খেলাধুলার সবচেয়ে আবেদনময় অংশ এটা অস্বীকারের যো নেই; কিন্তু জীবনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় অংশ নয়। ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করছে, বলা যায় হট ফেভারিট, খেলার ধারাও তাই বলে। কিন্তু ইংল্যান্ডের মানুষ শুধু খেলাতেই মেতে নেই। গত ২৪ জুন গণমাধ্যমগুলোর শিরোনানাম ছিলো অনেকটা এ রকম, ‘বৃটেনের রাজপথে লাখো মানুষের বিক্ষোভ’। দল হট ফেভারিট, বিশ্বকাপ জেতারও সম্ভাবনা রয়েছে তাও তারা রাজপথে ‘ব্রেক্সিটে’র প্রশ্নে। ইউরোপিয় ইউনিয়ন বের যাওয়া নিয়ে তারা দাবী জানিয়েছে দ্বিতীয় গণভোটের। উল্টো দিকে আমাদের ইন্টেলেকচুয়ালরা মেতে আছেন ভোট বাদ দিয়ে ফুটবলের বুট নিয়ে। বেঁচে থাকার প্রশ্নে কথা না বলে গোল বাধাচ্ছেন আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল-জার্মানি নিয়ে। ‘সেলুকাস, বিচিত্র এই দেশ!’- কী সাধে বলেছিলেন আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট/সম্পাদনা: মোহাম্মদ আবদুল অদুদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত