প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : সত্যের জয় সুনিশ্চিত

মেজর ডা. খোশরোজ সামাদ

১। ১ লা জুলাই, ১৯২১ সাল। তৎকালীন পূর্ববঙ্গের ছাত্রছাত্রীদের জন্য যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দ্বার উন্মুক্ত করা হয়, তার নাম ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’, যা প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে অধিকতর সমাদৃত। সে সময়ের ঢাকা কলেজের আত্মীকৃত মাত্র ৮৭৭ জন ছাত্র এবং ৬০ জন শিক্ষক নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও আজ পত্রপল্লবে সুশোভিত প্রায় ৩৭০০০ হাজার ছাত্র, ১৮০০ শিক্ষক, অসংখ্য কর্মকর্তা -কর্মচারী নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার তার দীপ্তি আর সৌরভ ছড়িয়ে যাচ্ছে। নান্দনিক সৌন্দর্যমাখা রমনা এলাকায় প্রায় ৬০০ একর জমির উপরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। প্রতিষ্ঠার এই দিনটি প্রতিবছরেই ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’ হিসেবে সাড়ম্বরে পালিত আসছে।

২। আজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শতদল মিলে বিকশিত হলেও এর প্রতিষ্ঠার পিছনে আছে দীর্ঘ ইতিহাস। ব্রিটিশ উপনিবেশ চলাকালেই পূর্ববাংলার স্বাধীন জাতিস্বত্বার বিকাশের লড়াই-সংগ্রাম শুরু হয়। অনৈতিকভাবে বঙ্গভঙ্গের ক্ষতিপূরণের অন্যতম উপকরণ হিসেবে ব্রিটিশরাজকে এই শিক্ষালয় প্রতিষ্ঠার দাবিকে মেনে নিতে হয়। স্বয়ং লর্ড লিটন এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন ‘ঝঢ়ষবহফরফ ওসঢ়বৎরধষ ঈড়সঢ়বহংধঃরড়হ’ বিশ শতকের প্রথম দিকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার কথা ভাবা শুরু হয়। বাংলার বাঘ শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ,স্যার সলিমুল্লাহসহ অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ ১৯১২ সালে ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ এর সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে দেখা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি আদায় করতে সক্ষম হন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯১৩ সালে নাথান কমিটির ইতিবাচক রিপোর্ট প্রকাশ ও অনুমোদিত হয়।

স্য্ডালার কমিশনও ১৯১৭ সালে ইতিবাচক রিপোর্ট দেয়। এরই প্রেক্ষিতে ১৯২১ সালে ভারতীয় আইনসভা পাশ করে দি ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট ১৯২০। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে সরকারের কাছে অতি দ্রুত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিল পাশের আহ্বান জানান। ১৯২০ সালের ২৩ শে মার্চ গভর্নর জেনারেল এই বিলে সম্মতি দেন। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় আর কোন আইনগত বাঁধা থাকে নাই। পরবর্তীতে এই আইনের বাস্তবায়নের ফলেই ১৯২১ সালের ১লা জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অক্সব্রীজ শিক্ষা ব্যবস্থার ছায়া অনুযায়ী হাঁটি হাঁটি পা পা করেই তার যাত্রা শুরু করে। যাত্রালগ্নে কলা, বিজ্ঞান এবং আইন এই তিনটি অনুষদ এবং ১২ টি বিভাগ নিয়ে আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এই শিক্ষা নিকেতন আলোর মুখ দেখে। সময়ের পরিক্রমায় আজ এই আলোর ঝর্ণাধারায় ১০টি অনুষদ, ৮২টি বিভাগ, ১১টি ইনিষ্টিটিউট এবং ৩০ টি গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকই ইউরোপসহ দেশ-বিদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। লীলা নাগ এবং করুণাকণা মিত্র এই বিদ্যা নিকেতনের যথাক্রমে প্রথম মহিলা ছাত্রী এবং শিক্ষিকা।

৩। বিশ্বের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শাসক গোষ্ঠী কোন জাতির অগ্রযাত্রার পথ রুদ্ধ করে দিতে চাইলে প্রথমেই তার বাতিঘরকে নিভিয়ে দিতে চায়। পাকিস্থানী জান্তা ১৯৭১ সালে ‘পোড়া মাটির’যে নীতি গ্রহণ করে তার প্রথম শিকার হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ২৫ মার্চের ভয়াল কালো রাত্রিতে ঘুমন্ত অসংখ্য সাধারণ ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীকে ইতিহাসের ঘৃণ্যতম, বর্বরোচিত, পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করে। উন্মত্ততায় গান পাউডারসহ নানা দাহ্য পদার্থ দিয়ে বিভিন্ন স্থাপনা পুড়িয়ে দেয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধের নয়মাসের বিভিন্ন সময়ই দুঃসহ হত্যাকান্ড চালানো হয়। যুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত হলে আলবদর, আল শামসের দৃষ্টি পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর। ১৪ ডিসেম্বর ,১৯৭১ সাল।

জাতিকে মেধাশুন্য করবার নীল নকশার অংশ হিসেবে অন্যান্য বুদ্ধিজীবীদের সাথে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বরেণ্য শিক্ষক মুনির চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, রাশিদুল হাসানসহ প্রমুখকে হত্যা করা হয়। মধুর ক্যান্টিন শুধু সবাধীনতা আন্দোলনই নয়, দেশ ও জাতির অসংখ্য গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং দিনবদলের স্বপ্নের সূতিকাগার। সবার প্রিয় ‘মধুদা’কেও একাত্তরে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে ১৯৬১ সালের অর্ডিন্যান্স রোধ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ১৯৭৩ চালুর মাধ্যমে সায়ত্ত শাসন ফিরিয়ে দেয়া হয়। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এশিয়ার ১০০ টি সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৪ তম স্থান দখল করেছে ।

৪। ভাষা আন্দোলনই মহান মুক্তিযুদ্ধের বীজ। নৈতিকভাবে সারা বাংলার সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও ছিল ভাষা আন্দোলনের সুহৃদ। পৃথিবীর ইতিহাসে মাতৃভাষার দাবীতে ছোটখাট কথাকাব্য থাকলেও সুসংগঠিত সফল আন্দোলন এবং জীবন দেয়ার মত মহাকাব্যিক ইতিহাস শুধুই বাঙালি জাতির। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে দ্বিতীয়বারের মত জিন্নাহ গর্বভরা কণ্ঠে বলে, অখন্ড পাকিস্থানের ভাষা হবে উর্দু। সমাবর্তনের মত স্পর্শকাতর অনুষ্ঠানের মাঝেই ‘ভাষা মতিন’ জিন্নাহের এই কথার তীব্র বিরোধিতা করেন। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভংগ করে মিছিল বের করা হয় এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। তারপরের ঘটনা সবারই জানা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দিন, শেখ কামালের মত আকাশ ছোঁয়া ব্যক্তিত্ব এই প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক কর্মকা- পরিচালনা করেন।

১৯৬৬ এর শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থাণেরও সূতিকাগার ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ডাঃ মিলনও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের মধ্যে প্রাণ দিয়ে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনকে কাঙ্খিত সাফল্য এনে দেন। দীর্ঘদিন ধরে ডাকসুর নির্বাচন করা সম্ভব না হলেও বর্তমানে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মূলধারা, ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন, জাসদ ছাত্রলীগ, ছাত্র মৈত্রী, ছাত্র ফ্রন্টসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন তাদের কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে। টি এস সিকে ঘিরে অসংখ্য শিল্প-সাহিত্য-সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই নয় সারা দেশের মননশীল সাংস্কৃতিক অবয়ব গড়তে অবদান রেখে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ সক্রিয়। আধুনিক মানের জিমনাসিয়াম ছাত্রছাত্রীদের শরীর গঠনে ভুমিকা রাখছে ।

৫। মাত্র আঠারো হাজার বই দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার চালু হলেও আজ প্রায় সাত লক্ষ বই লাল নীল দীপাবলী জ্বালিয়ে যাচ্ছে। গবেষণাধর্মী এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সময়কালে বিভিন্ন অনুষদের সেসন জ্যাম সহনীয় মাত্রায় আনা সম্ভব হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপিত শহীদ মিনার, অপারাজেয় বাংলা, স্বোপার্জিত সবাধীনতা, সন্ত্রাস বিরোধী রাজু ভাস্কর্যসহ বিভিন্ন ভাস্কর্য দেশ ও জাতির সম্যক কৃতির প্রতিবিম্ব ধারণ করছে।

৬। ফিলিপ জোসেফ হার্টজ ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর। ইউনিভার্সিটি মঞ্জুরী কমিশন দ্বারা সায়ত্তশাসিত এই প্রতিষ্ঠানের আচার্যের গুরু দায়িত্ব পালন করছেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি। অধ্যাপক মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে কাজ করছেন। তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৮ তম উপাচার্য।

৭। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন হয় ১৯২৩ সালের ২২ শে ফেব্রুয়ারি। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেদিন সকালেই বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করায় সমাবর্তনটি পন্ড যায়। বিগত ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গৌরবের ৫০ তম সমাবর্তন পালন করেছে। বিভিন্ন সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়সহ বিভিন্ন সাহিত্যিক যেমন ডক্টর ডিগ্রিতে ভূষিত হয়েছেন, তেমনই ভেঙ্কটরমন, অধ্যাপক সালাম, অমর্ত্য সেন অধ্যাপক ইউনুসসহ নোবেল বিজয়ীরাও সংবর্ধিত হয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাহাথির মোহাম্মদ এবং শেখ হাসিনাকে ডক্টর অব লজ ডিগ্রী প্রদান করে।

৮। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিবাক্য ‘সত্যের জয় সুনিশ্চিত’। আমরা সবাই আশা রাখি, প্রাচ্যের অক্সফোর্ড সময়ের দাবী পূরণ করে গুণগত উৎকর্ষে বিশ্বমানের শিক্ষা নিকেতনে পরিণত আরেকবার প্রমাণ করবে ‘সত্যের জয় সুনিশ্চিত’।

লেখক: উপ অধিনায়ক, আর্মড ফোর্সেস ফুড অ্যান্ড ড্রাগস ল্যাবরেটরি/সম্পাদনা: মোহাম্মদ আবদুল অদুদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত