প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ফুটবলের দুর্নীতি ও দুর্নীতির ফুটবল

মো. সামসুল ইসলাম: দেশে টিভি পর্দায় বিশ্বকাপ ফুটবল দেখা নিয়ে মোহাবিষ্ট জনগণের মাতামাতি আর সেই সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ার হিস্টিরিয়া এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।  কিন্তু তরুণদের এক বিশাল অংশই হয়তো জানেন না যে দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্ব ফুটবল এখন ব্যাপক মাত্রায় কালিমালিপ্ত।  ফুটবলকে এখন শুধু খেলা হিসেবে দেখা এক চরম বোকামি। বিশ্ব ফুটবলকে বুঝতে হলে বুঝতে হবে এর রাজনৈতিক অর্থনীতি, জানতে হবে এর পেছনের ব্যাপক দুর্নীতির মাত্রা।

এই তো, গত বছর মার্চে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ৫০টি দেশের ২৫ হাজার ফুটবল সমর্থকদের  মধ্যে ফুটবল নিয়ে এক জরিপের ফলাফল প্রকাশ করে। জরিপে অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ৫৩% ব্যক্তিই জানান বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ফিফার প্রতি তাদের কোনও আস্থা নেই। বিভিন্নভাবে ৯৭% ব্যক্তিই ফুটবলে দুর্নীতি নিয়ে তাদের আশঙ্কার কথা জানান। এরমধ্যে ৬৬% ম্যাচ ফিক্সিং নিয়ে, ৫৬% রেফারিকে দেওয়া ঘুষ নিয়ে, ৩০% তৃতীয়পক্ষের মালিকানা এবং ২৯% মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে তাদের শঙ্কার কথা প্রকাশ করেন। মাত্র ৩% জানান ফুটবলে দুর্নীতি নিয়ে তাদের কোনও মাথাব্যথা নেই।

বিভিন্ন দেশের ফুটবল সমর্থকদের বিশ্ব ফুটবল নিয়ে এই আশঙ্কা একদম অমূলক নয়।  সবাই জানেন গত এক দশকে ফিফার প্রাক্তন প্রেসিডেন্টসহ বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তাদের নিয়ে ব্যাপক মাত্রায় দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অনেক রাঘববোয়ালকে পদত্যাগ করতে হয়েছে, আটক এবং বিচারাধীন আছেন অনেকেই।  বিশ্বকাপ ফুটবলের স্বাগতিক দেশ হিসেবে ২০১৮ সালের রাশিয়া বা ২০২২ সালের কাতারের নির্বাচনে ব্যাপক মাত্রায় ঘুষের লেনদেন হয়েছে বলে পত্রপত্রিকায় খবর বেরিয়েছে।

এরমধ্যে কাতারের বিরুদ্ধে স্বাগতিক দেশ হওয়া নিয়ে বিস্তর দুর্নীতির অভিযোগ এখনও উঠছে। গত মাসেই সদ্যগঠিত ফাউন্ডেশন ফর স্পোর্টস ইন্টিগ্রিটি তাদের এক রিপোর্টে এ সম্পর্কে বিস্তর অভিযোগ উত্থাপন করেছে। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনে আগ্রহী নয়টি দেশের মধ্যে পরিদর্শনকারী দল কাতারকে নবম স্থানে রাখে। কিন্তু এখন প্রমাণ বের হয়ে আসছে ব্যাপক ঘুষের মাধ্যমে রাতারাতি পালটে যায় চিত্র। বেরিয়ে আসছে যে কাতার প্রয়াত ফিফা নির্বাহী জুলিও গ্রন্দোনার সুইস ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১৭.৬ মিলিয়ন দিরহাম ঘুষ প্রদান করে। এর বিনিময়ে তিনি কাতারের পক্ষ নেন। আর্জেন্টিনার সমর্থনের জন্য কাতার আর্জেন্টিনিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ২৪৫ মিলিয়ন দিরহামের দেনা পরিশোধ করে দেয়। এছাড়া ফ্রান্সের সমর্থনের জন্য কাতারের আমির ফ্রান্সের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি এবং ইউফা প্রেসিডেন্ট মিশেল প্লাতিনির মধ্যে এক বৈঠকের পর কাতার এয়ারওয়েজ এবং ফ্রান্সের এয়ারবাস কোম্পানির মধ্যে বিশাল বাজেটের এক ব্যবসায়িক চুক্তি হয়। এবং মিশেল প্লাতিনি কাতারের পক্ষে ভোট দেন। দুর্নীতির এই ব্যাপকতার চিত্র সাধারণ ফুটবল দর্শক আর সমর্থকরা এখন কিছুতেই মানতে পারছেন না।

প্রশ্ন উঠছে সাধারণ জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বিশ্বকাপ আয়োজন করে স্বাগতিক দেশগুলো আদতে কী পাচ্ছে? ২০১৮ সালের বিশ্বকাপের স্বাগতিক দেশ রাশিয়া খরচ করছে সাকুল্যে ১৪.২ বিলিয়ন ইউএস ডলার। প্রেসিডেন্ট পুতিন জনগণকে বুঝিয়েছেন যে এই বিনিয়োগ রাশিয়ান অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে। কিন্তু ব্যবসায়িক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মুডিস জানিয়েছে এই বিনিয়োগে তেমন কোনও সাফল্য আসবে না। অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি কোনও প্রভাব পড়বে না, লাভ হলেও তা হবে স্বল্পমেয়াদি।  একই ঘটনা ঘটে বিশাল ব্যয়ে অনুষ্ঠিত ২০১৪ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ক্ষেত্রে। বিশাল ব্যয়ে তৈরিকৃত ১২টা স্টেডিয়ামের ২টা ছাড়া বাকি দশটা এখন কোনও কাজে লাগে না। একটা স্টেডিয়ামের কিছু অংশ তো স্কুল এবং বাকি অংশ গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অথচ ব্রাজিলের সাধারণ জনগণ বা সে দেশের করদাতাদের এখনও এর জের টানতে হচ্ছে।

ইউরোপের ক্লাব ফুটবলেও চলছে মহা দুর্নীতি। বিশাল বিনিয়োগ, বিশাল আয় বা বিশাল ট্রান্সফার ফি’র জন্য ইউরোপের ফুটবল ক্লাবগুলো ব্যাপক পরিচিত। যেমন ২০১৬/১৭ সালে ইউরোপে ফুটবলের আয় ছিল ২৫ বিলিয়ন ইউরো। ‘বিগ ফাইভ’ নামে পরিচিত পাঁচটি ধনী দেশের (স্পেন, ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন) ক্লাবগুলো তিন মাসে ট্রান্সফার ফী বাবদ ব্যয় করে ৩.৬৭ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু ক্লাবসমূহে বিনিয়োগকৃত অর্থের উৎস নিয়ে রয়েছে ব্যাপক প্রশ্ন। ধারণা করা হয়, মাদক পাচার বা অস্ত্র বিক্রির টাকা এখানে বিনিয়োগ করা হয় ট্যাক্স জালিয়াতি বা ফাঁকি দেওয়ার জন্য। শুধু ক্লাব নয়, ট্যাক্স ফাঁকির অভিযোগ উঠে অনেক বিখ্যাত খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে, যার মাঝে আর্জেন্টিনার ফুটবল তারকা মেসিও রয়েছেন।

শুধু দুর্নীতি নয়। ইউরোপের ধনী ক্লাবগুলো হয়ে উঠেছে রাজনীতি, সামাজিক বিভাজন, সহিংসতা আর মাফিয়াদের আখড়া। গ্রিসসহ ইউরোপের দেশগুলোতে ধনীদের মাঝে ফুটবল ক্লাব কেনা বা ফুটবলকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপক প্রতিযোগিতার অন্যতম কারণ হচ্ছে রাজনীতি আর অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা। একটি ক্লাব কেনা মানে বিনে পয়সায় সমর্থকদের এক বিশাল বাহিনী পাওয়া। তারা আপনার জন্য অনেক কিছুই করবে। যেমন ক্রিকেটের ক্ষেত্রে শাহরুখ খানের কথাই ধরুন। কলকাতা নাইট রাইডার্স কেনার মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রী মমতা তার দিদি হয়েছেন, তিনি হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের ব্র্যান্ড এম্বাসেডর, পশ্চিমবঙ্গে তিনি পেয়েছেন তার ব্যাপক ভক্তকুল আর তার ছবির ব্যবসা হয়েছে নিশ্চিত। একই ধরনের ঘটনা ঘটে ইউরোপের ক্লাব ফুটবল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে।

কোয়ালিফাইং পর্যায়ে বাদ পড়ে ইতালির বিশ্বকাপে না থাকা নিয়ে সবাই বিস্মিত। কিন্তু অনেকেই হয়তো জানেন না ২০০৬-এর ম্যাচ পাতানো স্ক্যান্ডাল বা ২০১১-১২ বেটিং স্ক্যান্ডাল ইতালীয় ফুটবল লীগকে অনেকটাই শেষ করে দিয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে খেলোয়াড়দের মধ্যে। ভালো খেলোয়াড়রা ইতালিয়ান লীগ ত্যাগ করে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। ক্লাবগুলোর অর্থকড়ি কমে যাচ্ছে ও অবকাঠামো ভেঙে পড়ছে, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ইতালির জাতীয় ফুটবলে। আর সবকিছুর মূলেই রয়েছে ম্যাচ পাতানো আর বাজির কালো হাত।

সুতরাং সাদা চোখে টিভিতে ফুটবল খেলা এখন যতই আকর্ষণীয় মনে হোক না কেন, ফুটবল এখন আর সাধারণ মানুষের খেলা নয়। বিশ্ব ফুটবল নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ফিফা এক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। ভোট কেনাবেচা, ঘুষ, ম্যাচ পাতানো, মিডিয়ার অপব্যবহার ইত্যাদির মাধমে ফুটবলকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টার সঙ্গে ফিফার সম্পৃক্ততা ফিফাকে কলঙ্কিত করেছে, সাধারণ মানুষের খেলা হিসেবে ফুটবলের বিকাশ হচ্ছে রুদ্ধ। বিশ্বকাপ ফুটবলের নামে ব্যবসা-বাণিজ্য আর টিভি সম্প্রচারের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে বুদ করে রাখলেও এতে পৃথিবীব্যাপী ফুটবলের কোনও লাভ হয় না। বাংলাদেশ যে এর জ্বলন্ত প্রমাণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না।  সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

ইমেইলঃ [email protected]

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত