প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভারতীয় ঋণের অর্থ যৎসামান্যই ছাড়

সমকাল রিপোর্ট: ভারতের প্রথম লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) চুক্তির নয় বছরে ৮৬ কোটি ২০ লাখ ডলার প্রতিশ্রুতির অর্থছাড় হয়েছে মাত্র ৪০ কোটি ডলার। চুক্তির আড়াই বছরেও দুই বিলিয়ন ডলারের দ্বিতীয় এলওসির কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায়ে যেতে পারেনি। সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারের তৃতীয় এলওসির অর্থায়নের প্রকল্প এখনও ভারতের সম্মতির অপেক্ষায় আছে। ভারতীয় ঋণের প্রকল্পগুলোতে অর্থছাড় হচ্ছে যৎসামান্যই, প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নও এ কারণে বিলম্ব হচ্ছে।

প্রথম এলওসি অর্থায়নের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন পর্যালোচনায় দেখা যায়, এর আওতায় ১৫ প্রকল্পের মধ্যে তিন বছরের মধ্যে সমাপ্ত হওয়া আট প্রকল্পই ভারত থেকে বাস ক্রয় এবং রেলের বগি ও ইঞ্জিন ক্রয়সংক্রান্ত। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এসব প্রকল্পে ভারত থেকে পণ্য সরবরাহ করা হয়। এ কারণে ভারত তাদের স্বার্থে পণ্য বিক্রির প্রকল্পগুলো অনুমোদন প্রক্রিয়ায় সম্মতি আগে দিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে নেওয়া প্রকল্পগুলোতে প্রতিবেশী দেশটির অনুমোদন বিলম্ব এবং বাস্তবায়ন পর্যায়ে ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হেলাফেলার কারণে জটিলতায় পড়ছে।

সংশ্নিষ্টরা জানান, প্রকল্প প্রস্তাবে প্রাথমিক সম্মতি, পরামর্শক নিয়োগ ও নির্মাণকাজের দরপত্র দলিলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পেতে সময় লাগে। এ কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজ শুরু করতে লম্বা সময় অপেক্ষা করতে হয়। বাস্তবায়ন পর্যায়ে দেখা যায়, ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজে গতি নেই। এ ছাড়া ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে মন্ত্রণালয় থেকে তাগাদা দিয়ে কোনো ফল পাওয়া যায় না। অন্যদিকে, প্রকল্প পরিচালকের হাতে আর্থিক ক্ষমতা থাকে না। ভারতীয় এক্সিম ব্যাংক তাদের ইচ্ছামতো অর্থছাড় করে। মূলত এসব কারণে প্রকল্পগুলোর বেহাল অবস্থা কাটছে না।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সমকালকে বলেন, ভারতের দর্শনগত দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী তাদের ঋণের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে। ভারত তাদের স্বার্থ অনুযায়ী ক্রয়সংক্রান্ত প্রকল্পে অর্থছাড় করেছে। বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে নেওয়া প্রকল্প শেষ হচ্ছে না। নানা অজুহাতে বিলম্ব হচ্ছে।

সম্প্রতি প্রথম এলওসির মাঝারি আকারের আরও চারটি প্রকল্প শেষ হয়েছে বা একেবারেই শেষ পর্যায়ে রয়েছে। রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি শেষ হওয়া দ্বিতীয় ভৈরব ও দ্বিতীয় তিতাস সেতু নির্মাণও বিলম্ব হয় ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আইআরসিওএন এফকনস জেবি এবং গানোন এফএলসিএলের কারণে। এ কারণে ২০১০ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটির বাস্তবায়ন বিলম্বের কারণে মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে কয়েকবার। বাস্তবায়ন দ্রুত করতে প্রকল্পের মাঝপথে বেশ কয়েকবার তাগাদাও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কোনো কর্ণপাত করেনি।

আশুগঞ্জ-আখাউড়া সেকশনে সিগন্যালিং ব্যবস্থা আধুনিকায়ন প্রকল্পেও একই রকম সমস্যায় পড়তে হয়েছে। যদিও প্রকল্পটি শেষ হয়েছে। সম্প্রতি শেষ হওয়া অন্য দুই প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে রেলের জন্য ১২০ ব্রডগেজ কোচ ক্রয় এবং বিএসটিআই আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রকল্প।

সব মিলিয়ে প্রথম এলওসির ১৫ প্রকল্পের মধ্যে শেষ হয়েছে ১২টি। গত মে মাস পর্যন্ত প্রথম এলওসির অর্থছাড় হয়েছে ৪০ কোটি ডলার। প্রথম এলওসিতে অবকাঠামো খাতের সবচেয়ে বড় তিন প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ এখনও শুরুই হয়নি। এসব প্রকল্পে এক্সিম ব্যাংকের ঋণের প্রতিশ্রুতি মোট ঋণের অর্ধেকেরও বেশি। এ তিন প্রকল্পে ভারতের প্রতিশ্রুত ৫১ কোটি এক লাখ ডলারের মধ্যে ছাড় হয়েছে পাঁচ কোটি ৬৭ লাখ ডলার। রেলওয়ে সূত্র জানায়, এ তিন ভারতীয় এলওসি অর্থায়নপুষ্ট প্রকল্পে বাণিজ্যিক চুক্তিতে ভারতের এক্সিম ব্যাংকের সম্মতি পেতে কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। এ কারণে ভারতের অর্থছাড়ও আটকে গেছে।

রেল মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রথম এলওসির অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন খুলনা থেকে মোংলা বন্দর পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণে জটিলতা এখনও কাটেনি। ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আইআরসিওএন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। বিষয়টি ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনকে জানানো হয়েছে। প্রকল্পটির ব্রিজ ও ট্র্যাক নির্মাণের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয় ২০১৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। ঠিকাদারকে কার্যাদেশ এবং অগ্রিম পেমেন্টের পরও প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতি প্রকল্প এলাকায় (সাইটে) পৌঁছে অনেক বিলম্বে। কাজ দ্রুত শুরু করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে কয়েকবার তাগাদা দিয়েও কোনো ফল পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্পের পরিচালক আহমেদ হোসেন মাসুম বলেন, ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে ২০১৬ সালে। যন্ত্রপাতি সাইটে আসতে সময় লেগেছে। এ ছাড়া ভূমি অধিগ্রহণ সমস্যার কারণে প্রকল্প শুরু করা যায়নি। তবে আগামী দুই বছরের মধ্যে কাজ শেষ হবে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (এশিয়া) জাহিদুল হক সমকালকে বলেন, প্রথম এলওসির বাকি তিন প্রকল্প শিগগিরই শুরু হবে এবং আগামী দুই বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন কাজ শেষ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

ভারতীয় এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বের প্রসঙ্গে জাহিদুল হক বলেন, অবকাঠামো খাতের প্রকল্পগুলোর নকশায় বেশ কয়েকবার পরিবর্তন করা হয়েছে। এ পরিবর্তনে বাংলাদেশ ও ভারতীয় সব অংশীদারের সম্মতি নিতে হয়েছে। এ কারণে সময়মতো নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, পরামর্শক নিয়োগ ও ঠিকাদার নিয়োগে কয়েক দফায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও এক্সিম ব্যাংকের সম্মতির প্রয়োজন হয়। এ কারণে প্রথম এলওসির কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লেগেছে। প্রথম এলওসির অভিজ্ঞতার আলোকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় এলওসির প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে বাড়তি সময় লাগবে না বলে মনে করছেন তিনি।

ভারতের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ইআরডির ১০০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি (্‌এলওসি) সই হয় ২০১০ সালের ৭ আগস্ট। পরবর্তী সময়ে এক বিলিয়ন ডলারের ঋণ থেকে ২০ কোটি ডলার অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দেয় ভারত। প্রথম এলওসিতে অতিরিক্ত অর্থ হিসেবে আরও ছয় কোটি ২০ লাখ ডলার ঋণ দেয় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। সব মিলিয়ে প্রথম এলওসি ভারতের ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮৬ কোটি ২০ লাখ ডলার।

দ্বিতীয় এলওসি :আড়াই বছরেও দ্বিতীয় এলওসির আওতায় কোনো প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি। ২০১৬ সালের ৮ মার্চ এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি সই হওয়ার পর দ্বিতীয় এলওসির ১২ প্রকল্পে ১৭৮ কোটি ৫৫ লাখ ডলারের ঋণে ভারত চূড়ান্ত সম্মতি দিয়েছে। এখনও দুটি প্রকল্পে ভারতের সম্মতি পাওয়া যায়নি। সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্য অনুযায়ী দ্বিতীয় এলওসি ঋণের প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু ভারতের সম্মতি আদায়ে বিলম্বের কারণে কাজ শুরু করা যায়নি।

এখন পর্যন্ত অনুমোদন পায়নি আশুগঞ্জ অভ্যন্তরীণ নদীবন্দর স্থাপন প্রকল্প এবং যশোর, কক্সবাজার, নোয়াখালী ও পাবনায় ৫০০ সিটের হাসপাতাল ও একাডেমিক ভবন নির্মাণ প্রকল্প। আশুগঞ্জ অভ্যন্তরীণ প্রকল্পটি প্রথম এলওসিতে ছিল। কিন্তু ওই সময় ভারত এ প্রকল্পে অর্থায়নে চূড়ান্ত সম্মতি দেয়নি। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটি দ্বিতীয় এলওসিতে স্থানান্তর করা হয়েছে।

ভারতের সম্মতি পাওয়ার পর প্রথম এলওসির প্রকল্পগুলোর মতোই প্রথমে পরামর্শক নিয়োগে যেতে হবে। পরামর্শক নিয়োগের দরপত্র আহ্বানের আগে ভারত থেকে দরপত্র দলিলে সম্মতি আদায় করতে হবে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের চুক্তির আগে ভারতের সম্মতি নিতে হয়। এরপর ভৌতকাজের জন্য দরপত্র দলিল তৈরি করে আবারও সম্মতি আদায়ে হাইকমিশনের মাধ্যমে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও এক্সিম ব্যাংকে পাঠাতে হবে। এ ক্ষেত্রে যতবার দরপত্র দলিল সংশোধন করা হয়, ততবারই ভারতের অনুমোদন নিতে হয়। দরদাতা প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত করার আগেও এ-সংক্রান্ত কাগজপত্র এক্সিম ব্যাংকে পাঠাতে হবে। এভাবে প্রতিটি অনুমোদনে দুই থেকে চার বছর সময় লাগে।

ইআরডির অতিরিক্ত সচিব জাহিদুল হক বলেন, প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি থেকে একনেকে অনুমোদন পর্যন্ত প্রায় ছয় মাস লাগে। আবার এসব প্রকল্প প্রস্তাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও এক্সিম ব্যাংকের সম্মতি নিতেও সময় লাগে। এ কারণে অনুমোদন প্রক্রিয়ায় সময় লাগছে।

প্রতিটি প্রকল্পে ৭৫ শতাংশ পণ্য বা সেবা ভারত থেকে সংগ্রহ করার শর্ত রয়েছে। পূর্তকাজের ৬৫ শতাংশ উপকরণ ভারত থেকে আনতে হবে।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, দুই দেশের আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে ভারতের প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন কাজ শুরু হতে বিলম্ব হচ্ছে। এসব প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়া অনেক সময়সাপেক্ষ। এ সমস্যা সমাধান না হলে ভবিষ্যতে অনেক প্রকল্পই তালিকা থেকে হয়তো বাদ দিতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশে ভারতের এক্সিম ব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি আশীষ কুমার সনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করায় যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে দুই দফায় ই-মেইলে এলওসি প্রকল্পে অর্থছাড়ের ধীরগতি এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ায় বিলম্বের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু তার কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

তৃতীয় এলওসি :ভারত থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ৯৪ কোটি ডলার ঋণ প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এ প্রকল্পসহ ভারতীয় এক্সিম ব্যাংকের তৃতীয় এলওসির আওতায় বাস্তবায়নের জন্য ১৭ প্রকল্প চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রকল্পে ভারত সম্মতি দেয়নি।

গত বছরের ৪ অক্টোবর ভারতের সঙ্গে তৃতীয় এলওসির ঋণচুক্তি সই হয়। তৃতীয় এলওসির আওতায় অবকাঠামো খাতের বেশ কয়েকটি প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে বে-কনটেইনার নির্মাণ, পায়রা বন্দরে বহুমুখী টার্মিনাল নির্মাণ, মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন, মিরসরাইয়ে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (ভারতীয় এসইজেড) স্থাপন প্রকল্পও রয়েছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ