প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাজেটে আমলা-ব্যবসায়ীদের স্বার্থই প্রাধান্য পেয়েছে : জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী

জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী : স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে প্রথম বাজেট সংসদে উপস্থাপন করেছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। মোট অর্থের পরিমাণ ছিল মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকা। সংসদে ১২টি বাজেট উপস্থাপন করেছিলেন বিএনপির পক্ষ থেকে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট সাইফুর রহমান। জাতীয় পার্টি (এরশাদ সরকার) ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্রে দীক্ষিত আবুল মাল আবদুল মুহিতও ১২ বার বাজেট উপস্থাপন করেছেন। তার দুঃখ তিনি সাইফুর রহমানকে হারাতে পারেননি, সমান হয়েছেন।

৪৭টি বাজেটের মধ্যে ৩০টি প্রণয়ন করেছেন সিলেটে জন্মগ্রহণকারী অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান, এসএএমএস কিবরিয়া ও আবুল মাল আবদুল মুহিত। ১১ জন বাজেটপ্রণেতার মধ্যে রাজনীতিবিদ একজন, অর্থনীতিবিদ চারজন, সামরিক কর্মকর্তা দুজন, আমলা তিনজন এবং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট একজন।

সাইফুর রহমানের ১৯৮০-৮১ সালে প্রথম বাজেটের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ১০৮ কোটি এবং ২০০৬ সালে দ্বাদশ বাজেটের পরিমাণ ছিল ৬৯ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। এএমএ মুহিতের ১৯৮২ সালের প্রথম বাজেটের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৭৩৮ কোটি এবং ২০১৮ সালে খসড়া দ্বাদশ বাজেটের পরিমাণ হচ্ছে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ আবুল মাল আবদুল মুহিতের নিজের প্রথম বাজেটের চেয়ে দ্বাদশ বাজেট প্রায় ৯৮ গুণ বড় এবং তাজউদ্দীন আহমদের স্বাধীনতা-উত্তর প্রথম বাজেটের তুলনায় ৫৯২ গুণ বেশি। অগ্রগতি তো বটেই। প্রকৃত অগ্রগতি নির্ণয়ের জন্য বিবেচনা প্রয়োজন মানবিক সূচকের অগ্রগতির বিষয়গুলোও।

সংসদে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট ও বরাদ্দ

৭ জুন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ‘আমাদের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ শিরোনামে ১৫৬ পৃষ্ঠার বাজেট উপস্থাপন করেছেন সংসদে, যে সংসদের অর্ধেকের বেশি সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত। বাকি সদস্যরা কারচুপি ও অন্যূন ২০ শতাংশ ভোটার দ্বারা মনোনীত। প্রায় ৭০ শতাংশ সংসদ সদস্য সরাসরি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। সংসদের কার্যকলাপের চেয়ে তারা নিজস্ব পেশা ও ব্যবসায় বেশি পরিতুষ্ট। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের হিসাবে, সংসদে কোরাম সংকটে দেশের ক্ষতি হয়েছে গত বছর ১২৫ কোটি ২০ লাখ টাকা, যা প্রস্তাবিত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট ঘাটতির পুরো ১০ শতাংশ।

অর্থমন্ত্রী ও অর্থ প্রতিমন্ত্রী উভয়ে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিসের সাবেক সদস্য (সিএসপি)। তাদের প্রশিক্ষণ ও পারদর্শিতা কেন্দ্রিকতা রক্ষা, বিন্যাস ও বিকাশে। তারা স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধির দক্ষতায় বিশ্বাসী নন এবং তাদের প্রশিক্ষণেও আগ্রহী নন; যা প্রতিভাত হয়েছে বাজেটের প্রায় ছত্রে এবং সংবিধানের স্থানীয় শাসনসংক্রান্ত অনুচ্ছেদ ১১, ৫৯ ও ৬০-এর প্রতি অবজ্ঞা।

সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ ব্যয় হয় সরকারি কর্মচারীদের পেনশন বাবদ। এটাই আমলাদের চালাকি ও বাহাদুরি; ছলচাতুরীতে তারা অতুলনীয়। কোটারি স্বার্থ সংরক্ষণই তাদের শিক্ষা।

নিজেদের ভবিষ্যৎ সংরক্ষণের নিমিত্তে অধিকাংশ আমলা ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সহযোগিতা করতে অতি আগ্রহী। অর্থমন্ত্রী মুহিতের খসড়া বাজেটের সম্যক গুরুত্ব উপলব্ধি করতে হলে ৪৫৩ পৃষ্ঠার বাজেট পুস্তিকা ২০১৮-১৯ এবং ৩৫৪ পৃষ্ঠার ‘বাংলাদেশে কাস্টমস ট্যারিফ ২০১৮-১৯’ অর্থাৎ মোট ৯৬৩ পৃষ্ঠা ভালোভাবে অধ্যয়ন করতে হবে। বাজেট চূড়ান্ত হবে ৩০ জুন ২০১৮। ঈদ ও অন্যান্য ছুটি বাদ দিলে বাজেট আলোচনার জন্য প্রত্যেক সংসদ সদস্য গড়ে আধঘণ্টার অনধিক সময় পাবেন। এখন পর্যন্ত সরকারি দলের সব সদস্য তাদের দেয় সময়ের ৩-৪ শতাংশ ব্যয় করছেন সরকার ও দলপ্রধানের স্তুতিতে। কতিপয় সংসদ সদস্য ব্যাংকের অনাচার সম্পর্কে বক্তব্য রেখেছেন, কিন্তু কোনো সংশোধনী প্রস্তাব আনেননি।

সংসদের বাইরের দলগুলো কড়া প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে। কমিউনিস্ট পার্টি অব বাংলাদেশ বলেছে— ‘উচ্চবিত্তের তোষণ; নিম্নবিত্ত চ্যাপ্টা, বৈষম্য দ্রুতগতিতে বাড়াবে’ (সাপ্তাহিক একতা-১০ জুন ২০১৮)। বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) কাজী ফিরোজ রশিদ সংসদে বলেছেন, ‘অর্থমন্ত্রী জনগণের পক্ষ না নিয়ে ব্যাংক লুটেরা ও মুষ্টিমেয় ধনিক শ্রেণীর পক্ষ নিয়েছেন।’ ‘বড় বাজেট, ভাবনায় ভোট বক্তব্য’ দৈনিক সমকালের (৮ জুন ২০১৮) শিরোনাম। এইচএম এরশাদ বলেছেন, ‘সরকার বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারবে না।’ একই বক্তব্য ৮ জুন দৈনিক বণিক বার্তার— ‘অসম্ভবের বাজেটে স্বপ্নাচ্ছন্ন অর্থমন্ত্রী’। বাজেট সম্পর্কে সিপিডির দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের বক্তব্য— ‘বিড়াল ছোট-বড় হতে পারে, তবে তাকে ইঁদুর ধরতে হবে। সবচেয়ে দরিদ্রদের ৬০ শতাংশ আয় কমেছে এবং সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশের আয় বেড়েছে ৫৭ দশমিক ৪ শতাংশ।’

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের মতে, ‘দেশ থেকে পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনার নির্দেশনা নেই মুহিতের প্রস্তাবিত বাজেটে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমেছে, সমাজের শীর্ষ ৫ শতাংশ ধনীর আয় সর্বনিম্ন ৫ শতাংশ দরিদ্রের আয়ের তুলনায় ১২১ গুণ বেড়েছে। আইন বিধানের মাধ্যমে ব্যাংক পর্ষদে একই পরিবারের চার সদস্যের নয় বছর থাকার বিধান পরিবারতন্ত্রের পাশাপাশি ব্যাংক লুট সহজ করেছে। তদুপরি ব্যাংকিং খাতে ২ দশমিক ৫ শতাংশ আয়কর কমানো ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা, লুটপাট ও বিচারহীনতায় উৎসাহিত সবাই।’

সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে সুদ পরিশোধ, পিপিপি ভর্তুকি ও দায় এবং নিট ঋণদানের জন্য মোট ৭৬ হাজার ৩০ কোটি টাকা (১৬.৩৭%)। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ পেয়েছে ২৯ হাজার ১০২ কোটি (৬.৬৭%) এবং জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিভাগকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২৬ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা (৫.৭২%)। সমৃদ্ধ আগামীর পদযাত্রায় বাংলাদেশের বাজেটে সবচেয়ে কম বরাদ্দ রাখা হয়েছে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, বাস্তবায়ন পরীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ এবং কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিট বিভাগের কার্যপরিচালনার জন্য। বরাদ্দ প্রমাণ করে রাষ্ট্রপতি ও দুর্নীতি দমন কমিশনের গুরুত্ব ও জবাবদিহির প্রতি সরকারের দায়িত্ববোধ। গবেষণার প্রয়োজন নেই দেশে দুর্নীতির বিস্তার নির্ণয়ের জন্য। বিনা টেন্ডারে অধিক হারে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি, শিক্ষক, পুলিশ কনস্টেবল ও মিডওয়াইফ পদে চাকরির জন্য ন্যূনতম ৮ থেকে ১২ লাখ টাকা ঘুষের কথা সর্বজনবিদিত।

মসজিদ নির্মাণ ও বিনা বিচারে বন্দুকযুদ্ধে কথিত মাদক ব্যবসায়ী হত্যা করে মাদক আসক্তি রোধ করা যাবে না। মসজিদ নির্মাণ, মাদ্রাসা স্থাপন স্থানীয় জনগণের অধিকার ও দায়িত্ব। সরকারি খরচে ও উদ্যোগে মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার স্থাপন কেবল জনগণকে ভালো কাজ করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা নয়, নির্মাণে দুর্নীতির সুযোগ করে দেয়া এবং দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়।

মাদকাসক্তি থেকে তরুণসমাজকে নিবৃত্ত করতে হাইস্কুল ও কলেজে নিয়মিত আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় খেলাধুলা এবং লোকসংস্কৃতির বিশেষত স্থানীয় গম্ভীরা, বাউল, ভাওয়াইয়া, পুতুলনাচ, পালাগান, যাত্রা, জারিগান, যোগীর গান, সারীর পাঠ, মানিক পীরের গান, শোকের হারি প্রভৃতি কবিগানের আসর পরিচালনার জন্য বরাদ্দ নিদেনপক্ষে দ্বিগুণ করতে হবে। এতে ব্যাপকসংখ্যক ছাত্রছাত্রীর অংশগ্রহণ সম্ভব হবে। হাইস্কুল ও কলেজের মেয়েদের জন্য বিভিন্ন প্রকার ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও আত্মরক্ষামূলক মার্শাল আর্টসের প্রশিক্ষণের জন্য আলাদা বিভাগ করে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া প্রয়োজন। খেলাধুলার প্রসার ও স্থানীয় পর্যায়ে লাইব্রেরি বিকাশের পরিবর্তে সরকার স্টেডিয়াম স্থাপনে অধিকতর উৎসাহী ঘুষের লেনদেনের কারণে। সাময়িকভাবে আনন্দ সৃষ্টিকারী বিয়ার চালু করা হবে তরুণ সম্প্রদায়কে ইয়াবা, গাঁজা, ভাং ও হেরোইন থেকে বিরত রাখার অন্যতম সফল পদ্ধতি। বিয়ারের চেয়ে দ্বিগুণ বেশি মদ আছে বর্তমানে বাংলাদেশের সব দোকানে সহজলভ্য এনার্জি ড্রিংকসে, মদের পরিমাণ ৮ শতাংশের অধিক এবং ক্যাফেইনের মাত্রাও বেশি। অন্যপক্ষে বিয়ারে মদের পরিমাণ ৫ শতাংশের অনধিক। আন্তঃজেলা হাইওয়েতে প্রায়ই অসংখ্য দুর্ঘটনার মূল কারণ গাড়িচালক, বাস ও ট্রাক ড্রাইভারদের যাত্রার আগে একাধিক ক্যান এনার্জি ড্রিংকস পান।

মিয়ানমার ও ভারত থেকে মাদকের সরবরাহ সহজেই বন্ধ করতে পারে আমাদের সেনাবাহিনী, কোস্টগার্ড, বিজিবি, পুলিশ প্রভৃতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করলে ২৮ হাজার মাদক সরবরাহকারীকে জেলে রাখার প্রয়োজন হবে না। অবশ্য এতে পুলিশ ও র্যাবের গ্রেফতার বাণিজ্য বাবদ ব্যবসা নষ্ট হবে প্রায় ১০০ কোটি টাকার।

কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে বরাদ্দ ৫ হাজার ৭০২ কোটি টাকা আলাদা করে দেখানো প্রয়োজন এবং মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যয় ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দের ১ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকার সঙ্গে যোগ করে দেখানোই যুক্তিসঙ্গত কিংবা মাদ্রাসা শিক্ষাকে ‘প্রাথমিক, গণশিক্ষা ও আধুনিক মাদ্রাসা শিক্ষা’ শীর্ষক মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধিত করা হবে সঠিক পদক্ষেপ।

রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ের অধীনে সব সরকারি ও বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিশ্ববিদ্যালয়) দেখভাল ন্যস্ত হলে উচ্চশিক্ষা গতিশীল হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) ও রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ের অধীন হওয়া বাঞ্ছনীয়। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যও বটে। স্মরণযোগ্য, কার্যক্রমবিহীন অলস জীবনযাপনে রুগ্ণ হয়ে অতীতে রাষ্ট্রপতি কয়েকবার ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। অবশ্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চশিক্ষা বাবদ বরাদ্দ রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ে স্থানান্তর ন্যায্য কাজ হবে।

বাজেটে উপেক্ষিত সুশাসন ও প্রশিক্ষণ

প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রীর সুশাসন সম্পর্কে দুই পৃষ্ঠা বক্তব্য থাকলেও সুশাসন স্থাপনের সদিচ্ছার কোনো প্রমাণ সেখানে প্রকাশ পায়নি। সুশাসনের ভিত্তি হবে সংবিধানের ১১, ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদের বাস্তবায়ন এবং দুর্নীতি হ্রাসের জন্য যথার্থ পদক্ষেপ গ্রহণ।

কেন্দ্রিকতা যানজট ও হয়রানি বৃদ্ধি করে এবং জনগণকে উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত করে। ঢাকা শহরের পুরনো হাসপাতালগুলো যথা— ঢাকা মেডিকেল কলেজ, বিএসএমএমইউ ও পঙ্গু হাসপাতালে ১০ থেকে ১৪ তলা বিল্ডিং তৈরি করলেই স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি হবে না। তবে অগ্নিনির্বাপক বিভাগের কাজ জটিল হবে এবং কর্মচারীদের দুর্নীতি বৃদ্ধি পাবে। এটা ভুল পদক্ষেপ। সঠিক পদক্ষেপ হতো প্রধানমন্ত্রীর দুটি নির্দেশের দ্রুত বাস্তবায়ন— প্রথমত. ঢাকা শহরে কর্মরত কয়েকশ চিকিৎসককে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে দুই বছরের জন্য পাঠানো এবং চার হাজার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে নবীন চিকিৎসকদের এক বছর ইন্টার্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ। সঙ্গে প্রতি বছর মেডিকেল ছাত্রদেরও সেখানে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। নবীন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা এক বছর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং দ্বিতীয় বছর সার্বক্ষণিকভাবে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে অবস্থান করে প্রশিক্ষণ নেবেন। এতে স্থানীয় জনসাধারণ উপকৃত হবে। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে ইউনিয়নের ৪০ থেকে ৬০ হাজার মানুষ ২৪ ঘণ্টা উন্নত মানের স্বাস্থ্যসেবা পাবে এবং শহরবাসী মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত সন্তানদের পল্লীভীতি কাটবে।

ঢাকা শহরের ব্যাপক জনসাধারণকে অকারণে সরকারি বড় হাসপাতালে ভিড় করা এবং দুর্নীতির হাত থেকে রক্ষার নিমিত্তে ৯৫টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতে চার-পাঁচটি জেনারেল প্র্যাকটিশনার (জিপি) সেন্টারের উদ্বোধন করলে নগরবাসী উন্নত মানের স্বাস্থ্যসেবা পাবে। প্রতি জিপি সেন্টারে দুজন এমবিবিএস চিকিৎসক ও ১০ জন স্বাস্থ্যকর্মী, নার্স, প্যাথলজি টেকনিশিয়ান, ফার্মাসিস্ট ও ফিজিওথেরাপিস্ট নিবন্ধিত পরিবারকে সেবা দেবেন। রেফার না হলে কেউ সরাসরি বড় হাসপাতালে ভিড় করতে পারবেন না। ক্লিনিক ভাড়া, ফ্রি ওষুধ ও বেতন-ভাতা বাবদ দেড় কোটি নগরবাসীর জন্য অনধিক ৪০০ কোটি টাকা বছরে ব্যয় হবে।

সুস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে প্রথম বছর এক হাজার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের প্রতিটিতে চারজন চিকিৎসকের বাসস্থান, ১০-১৫ জন ছাত্রের জন্য ডরমিটরি, ক্লাসরুম, লাইব্রেরির জন্য মাত্র ৬ হাজার বর্গফুটের বিল্ডিং তৈরির প্রয়োজন হবে। এতে সাকল্যে ব্যয় মাত্র ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা (১০০০ কেন্দ্রে x ৬০০০ বর্গফুট x ২০০০ টাকা) খরচ হবে।

স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর প্রতি ১০ গ্রাম জর্দা, গুলের মূল্য ৩০ টাকা। প্রতি ১০ শলাকা বিড়ির মূল্য ১০ টাকা এবং ১০ শলাকা সিগারেটের মূল্য ১০০ টাকা ধার্য করে ৬৫ শতাংশ সম্পূরক কর আরোপ করা হলে শুল্কলব্ধ অর্থ দিয়ে পাঁচ হাজার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র ও নগর জিপি সেন্টারের সব ব্যয় বহন সহজ হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য ক্ষতিকর এনার্জি ড্রিংকস ও অন্যান্য ধরনের মদের ওপর অধিক হারে সম্পূরক শুল্ক ধার্য প্রয়োজন। একই সঙ্গে চুইংগাম, সুগার কনফেকশনারি, চকোলেট কোকো ও পলিথিন প্লাস্টিক ব্যাগের ওপর ৫ থেকে ১০ শতাংশ সম্পূরক কর যথেষ্ট নয়। একইভাবে তামাকজাত পণ্যের ওপর থেকে ২৫ শতাংশ রফতানি শুল্ক প্রত্যাহার ভুল কাজ হবে।

সংবিধানের ১১, ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদের যথাযথ প্রয়োগের নিমিত্তে সারা বাংলাদেশকে ১০টি প্রদেশ বা বঙ্গবন্ধুর বিকেন্দ্রীকরণের স্বপ্নানুযায়ী ৬৫টি স্টেট সৃষ্টির জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন ছিল। নিদেনপক্ষে অনুচ্ছেদ ৫৯ অনুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে সৃষ্ট স্থানীয় শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য স্থানীয় জনগণের ভোটে নির্বাচিত জেলা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিদেশে কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ ‘Elected District Health/Education/ Technical Training/Social Security Authority স্থাপন একান্ত প্রয়োজন। এ জাতীয় স্বয়ং শাসিত জেলা কর্তৃপক্ষ স্থাপনের জন্য কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। আমলা ও নগরবাসী রাজনীতিবিদরা কেন্দ্রিকতা পছন্দ করেন, নিদেনপক্ষে কেন্দ্রের আমলা দ্বারা স্থানীয় শাসন নিয়ন্ত্রণ।

বিশ্বস্বাস্থ্য পরিসংখ্যান মতে, প্রতি বছর ৫২ লাখ পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে নামছে স্বাস্থ্য খরচের বোঝার কারণে। এটা নিরসনে বাজেটে কোনো উদ্যোগ নেই।

অসচ্ছল যুদ্ধাহত ও অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা আনুমানিক ১০ হাজারের বেশি নয়। তাদের জন্য ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সুশাসনের স্বার্থে এ বরাদ্দ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে স্থানান্তর করা যুক্তিসঙ্গত পদক্ষেপ হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সম্মানী ভাতা, উৎসব ভাতা, নববর্ষ ভাতা, বিজয় দিবস ভাতা কি মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান প্রদর্শন না ঘুষ দিয়ে ভোট কেনার ব্যবস্থা, তা বিবেচনা প্রয়োজন। মুক্তিযোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করেছেন আর কৃষক শ্রমিকরা দেশের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ দৃঢ় করছেন। এদের কথা অর্থমন্ত্রী ভুলে গেছেন। মোট ৬৫ বছরের বয়স্ক ব্যক্তির সংখ্যা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী, দরিদ্র মাতা ও ল্যাকটেটিং মাতাদের কিছু অংশকে ভাতাদানের অর্থ হচ্ছে কেন্দ্রের সরকারের নিয়ন্ত্রণে দুর্নীতির বিস্তার। ক্যান্সার, বিকল কিডনি, লিভার সিরোসিস ও স্ট্রোকের রোগীকে ১৫ হাজার টাকা অনুদান দালালের আয় বৃদ্ধি ছাড়া রোগীর চিকিৎসায় কিঞ্চিৎ লাভ হয় না। পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সংস্কার প্রয়োজন।

অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টিতে (পৃ. ১০৯-১০) ‘উন্নয়ন বিস্ময়’ বাংলাদেশের শ্রমবাজারে আসা দুই কোটির অধিক সম্ভাবনাময় তরুণ-তরুণী মনে হলেও অধিকাংশ অর্থনীতিবিদের মতো সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, দেশের দুই কোটি বেকারের ৪৭ শতাংশ স্নাতকধারী তরুণ, যাদের দেয়ার কথা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’; তারা মাদকাসক্ত ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে সৃষ্টি করছে ‘ডেমোগ্রাফিক নাইটমেয়ার’ বা দুঃস্বপ্ন।

অর্থমন্ত্রীর ভাই জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক প্রতিনিধি ড. এ কে আবদুল মোমেনের মতে, ‘বাংলাদেশের লক্ষণীয় সম্পদ মানুষ ও প্রাণী ছাড়া কিছু নেই। অশিক্ষিত লোকের মধ্যে বেকারত্ব ৪ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি নয়। ৪৯ শতাংশ হচ্ছে ২৫ বছরের নিচে এবং শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি এবং তা দিন দিন বাড়ছে’ (বণিক বার্তা ৩০ মে ২০১৮)। তদুপরি বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করতে ১৭৬ দিন লাগে, সেক্ষেত্রে মালয়েশিয়ায় প্রয়োজন হয় মাত্র ১৭ দিন। বাংলাদেশী আমলা মালয়েশীয় থেকে শিক্ষা ও কর্মদক্ষতায় দুর্বল নন, দীর্ঘসূত্রতা বাংলাদেশে দুর্নীতির হার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। বিশ্বব্যাংকের ২০১৭ সালের প্রবাসী শ্রমিকদের দেশে অর্থ প্রেরণ-সংক্রান্ত রিপোর্টে প্রকাশ পেয়েছে, ৭ দশমিক ৮ মিলিয়ন বাংলাদেশী দেশে পাঠিয়েছে ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। অন্যপক্ষে ৬ মিলিয়ন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফিলিপিনো শ্রমিক পাঠিয়েছেন ৩৩ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ বাংলাদেশের দ্বিগুণেরও অধিক; সমসংখ্যক পাকিস্তানি শ্রমিক পাঠিয়েছেন ২০ মিলিয়ন ডলার। ১৬ দশমিক ৪ মিলিয়ন ভারতীয় শ্রমিক ভারতে অর্থ পাঠিয়েছেন ৭০ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশে কর্মরত লক্ষাধিক ভারতীয় বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাঠিয়েছেন ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার।

সৌদিরা মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার নির্মাণের জন্য অনুদান দিতে আগ্রহী কিন্তু প্রশিক্ষণবিহীন বাংলাদেশী মুসলিম শ্রমিকদের সৌদি আরবে কর্মসংস্থানে উৎসাহী নয়। তাদের প্রিয় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শ্রীলংকা ও ফিলিপিনো শ্রমিকরা। বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত সামাল দিচ্ছেন তৈরি পোশাক শিল্পের চার মিলিয়ন নারী শ্রমিক এবং ১০ মিলিয়নের অনধিক প্রবাসী বাংলাদেশী শ্রমিক। এদের নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণসংশ্লিষ্ট শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ মাত্র ২২৭ কোটি টাকা এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ মাত্র ৫৯৫ কোটি টাকা। অথচ এসব শ্রমিক আয় করেন বছরে ৩০ বিলিয়ন ডলার।

রাজস্ব সংস্কারের সুপারিশ

কোনো বাজেট সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয় এবং বাজেটে সবাইকে সন্তুষ্ট করা অসম্ভব ব্যাপার। কখনো কখনো কর্তৃপক্ষ ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে ভুল কাজ করে। কর সংস্কার সুশাসনের অংশ।

১. ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়ের সীমা ৪ লাখ টাকা হওয়া বাঞ্ছনীয়। তবে আংশিক বা সার্বক্ষণিকভাবে কর্মরত সব ব্যক্তি, এমনকি ফুটপাতের দোকানদারও ট্যাক্স রিটার্ন জমা দেবেন বছরে ন্যূনতম ১ হাজার টাকা। গৃহকর্মীদের ফি জমা দেবেন গৃহকর্মীর পক্ষে গৃহমালিক। উল্লেখ্য, ফুটপাতের দোকানদারদের প্রত্যেকে ভ্রাম্যমাণ পুলিশকে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৫০০ টাকা ঘুষ দেন খাজনা হিসেবে। তদুপরি স্থানীয় থানাকে প্রতি সপ্তাহে ৩০০-৫০০ টাকা উপঢৌকন দেন, স্থানীয় মাস্তানদের দেন কমপক্ষে দৈনিক ১০০ টাকা চাঁদা।

২. সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রশিক্ষণের করহার কমানো ভুল কাজ হবে। এদের করহার অবশ্যই ৪০ শতাংশ হওয়া উচিত। একইভাবে মোবাইল কল অপারেটর কোম্পানির করহার ৪৫ শতাংশ হওয়া বাঞ্ছনীয়।

৩. দেশে ব্যবহূত ফরমুলেটেড ওষুধের মূল্য সুলভ করার লক্ষ্যে সরকার টেবিল-১-এ অন্তর্ভুক্ত ১৪১টি কাঁচামালের মধ্যে ৮১টির শুল্ক ৫ শতাংশ এবং বাকি ৬০টির শূন্য শুল্কহার ধার্য করেছে। কতিপয় ক্যান্সার ও বিকল কিডনি রোগের ওষুধের কাঁচামালকে শূন্য শুল্ক আওতায় আনা হয়েছে। টেবিল-২-এ অন্তর্ভুক্ত ১১টি কাঁচামাল ও সামগ্রীর শুল্ক ১০০ ও ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। (পৃ. ১৩৮-১৪১)

দু-তিন হাজারের শুল্কের পরিবর্তে সব ওষুধের কাঁচামাল ও সামগ্রীর ওপর শূন্য (০%) শুল্কের পরিবর্তে সব কাঁচামালসামগ্রীর ওপর ৫ শতাংশ শুল্ক ধার্য করলে শুল্ক অফিসে দুর্নীতি ও হয়রানি কমবে। এবং ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধনীতির মূল্য নির্ধারণ নিয়মাবলি প্রয়োগ করলে দেশের সব ওষুধের এমআরপি অর্ধেকে নেমে আসবে। সরকারের আয়ও বাড়বে।

৪. ওষুধ শিল্পের সক্রিয় কাঁচামাল (Bulk Drugs) উৎপাদনে ব্যবহূত সব রাসায়নিক দ্রব্যের শুল্ক মুক্ত করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বাংলাদেশে উৎপাদিত ওষুধের কাঁচামাল রফতানির জন্য আগামী পাঁচ বছর ২৫ শতাংশ ক্যাশ ইনসেনটিভ দিন এবং দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট আমদানিকৃত সক্রিয় কাঁচামালের ২৫ শতাংশ শুল্ক ও সম্পূরক কর ধার্য করলে দেশে বহু এপিআই ফ্যাক্টরি স্থাপিত হবে। বর্তমানে দেশে ২৫০ ওষুধের ফরমুলেশন ইউনিট আছে কিন্তু কাঁচামাল উৎপাদক প্রতিষ্ঠান আছে মাত্র ১০টি।

৫. বাংলাদেশী স্নাতক তরুণ-তরুণীদের প্রশিক্ষণের জন্য প্রতি জেলায় স্বায়ত্তশাসিত কর্ম প্রশিক্ষণ এবং সংস্থার জন্য জেলা কারিগরি প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান কর্তৃপক্ষ’ স্থাপন প্রয়োজন সংবিধানের ১১, ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদের আলোকে।

৬. ওষুধের ফরমুলেশন ইউনিটে অল্প বিনিয়োগে লাভ বেশি হয়। অন্যপক্ষে ওষুধের কাঁচামাল শিল্পে (Active Pharmaceutical Ingredient– API) বিনিয়োগ বেশি কিন্তু লাভ কম। দেশে ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদন ব্যবস্থা দৃঢ় না হলে বাংলাদেশের ওষুধের রফতানি সীমিত হয়ে পড়বে।

৭. গার্মেন্ট শিল্প লাভজনক শিল্প। বর্তমান বাজেটে ১৫ শতাংশ করহার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ শিল্পের করহার ন্যূনতম ২০ শতাংশ হওয়া বাঞ্ছনীয়। লব্ধ অতিরিক্ত কর দিয়ে শ্রমিকের পূর্ণ স্বাস্থ্য সুবিধা ও রেশনিং সুবিধা দিলে শ্রমিকের পুষ্টি বাড়বে, সঙ্গে বাড়বে তাদের উৎপাদনশীলতা। বর্তমানে বাংলাদেশের শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা ভিয়েতনাম ও শ্রীলংকার কর্মীদের ২-৩ শতাংশ মাত্র।

৮. গুঁড়ো দুধের আমদানি শুল্ক না কমিয়ে দেশে গাভী ও ছাগী পালনের প্রণোদনা দিলে অধিকসংখ্যক দরিদ্র মানুষ উপকৃত হবে।

৯. প্রতি জেলায় ড্রাইভিং ও গাড়ি নিবন্ধন অফিস স্থাপন করে বর্তমানে প্রচলিত গাড়ির শ্রেণীবিন্যাস স্তর ২০ থেকে ৯ স্তরে নামিয়ে আনলে দুর্নীতি ও হয়রানি কমবে। পাঁচ বা ১০ বছরের নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করলে রেজিস্ট্রেশন বাবদ প্রায় ১ কোটি টাকা আয় হবে। বাস ও অ্যাম্বুলেন্সকে জনস্বার্থে রোড ট্যাক্সের আওতাবহির্ভূত করা যুক্তিসঙ্গত হবে। ডিজিটাল নম্বর প্লেটসহ পাঁচ বছরের জন্য রেজিস্ট্রেশন ফি হবে ১০ হাজার থেকে শুরু করে বাস-ট্রাকের জন্য ১ লাখ টাকা। একবারে পাঁচ বছরের রোড ট্যাক্স হবে সমপরিমাণে। সামারিক বাহিনীসহ সব সরকারি যানবাহনকে নিবন্ধিত হয়ে নির্দিষ্ট হারে রেজিস্ট্রেশন ও রোড ট্যাক্সও দিতে হবে।

১০. গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষার দায়িত্ব বেসরকারি স্থানীয় গ্যারেজের কাছে স্থানান্তর হবে হয়রানি থেকে মুক্তির পথ। প্রতি দুই বছর পর গ্যারেজের মান নিয়ন্ত্রণ করবে জেলা ট্রান্সপোর্ট কর্তৃপক্ষ।

প্রতি বছর নতুন এক লাখ মোটরসাইকেল, অটোরিকশা প্রভৃতি এবং এক লাখ অন্যান্য গাড়ি রাস্তায় নামছে; এক লাখ নতুন ড্রাইভার তৎসঙ্গে।

১১. বিচার বিভাগের হয়রানি, মামলাজট কমানোসহ গতিশীলতার জন্য হাজিরা ও শুনানির জন্য নিম্ন আদালতে প্রতিবার ১ হাজার টাকা এবং উচ্চ আদালতে প্রতিবার ২ হাজার টাকা ফি ধার্য যুক্তিসঙ্গত হবে। নিম্ন আদালতের ১ হাজার টাকার ৫০০ টাকা পাবেন প্রতিপক্ষের আইনজীবী। তিনবারের বেশি সময় নিলে উপস্থিতি ফি দ্বিগুণ হবে। সারা দেশে প্রতিদিন নিম্ন আদালতে ন্যূনতম ২৫ হাজার মামলা শুনানির জন্য উপস্থাপন করা হয়। অর্জিত ফি দিয়ে বিচারক-বিচারপতিদের বেতন-ভাতা বাড়ানো হবে, যাতে তাদের কর্মদক্ষতা ও কর্মস্পৃহা বাড়ে। ফলে মামলাজটও হ্রাস পাবে।

লেখক: ট্রাস্টি, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র/ বণিকবার্তা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত