প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘বাবা, লিপুর কথা কি ভুইলে গেছ?’

ডেস্ক রিপোর্ট:  ‘আমাকে চিনতি পারছ?’ ‘হ্যাঁ’ উত্তর দিতেই আক্ষেপের সুরে বললেন, ‘লিপুর আব্বু চিনতি পারলা। ওই যে কোনকালে একদিন কথা বললা…আর কথাটতা বলো না। ঈদ গেল, কোনো খোঁজখবরও…। বাবা, লিপুর কথা কি ভুইলে গেছ একেবারে?’

২৩ জুন, শনিবার সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের খুন হওয়া শিক্ষার্থী মোতালেব হোসেন লিপুর কথা ফোন করে এভাবেই জিজ্ঞাসা করছিলেন তার বাবা বদরউদ্দিন।

২০১৬ সালের ২০ অক্টোবর অর্ধ-উলঙ্গ অবস্থায় লিপুর লাশ রাবির নবাব আবদুল লতিফ হলের নালা থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। লিপু এই হলেরই আবাসিক শিক্ষার্থী ছিলেন।

হত্যার ঘটনার পর পুলিশ প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, বিভাগের শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগের শিক্ষার্থী-সবাই কম-বেশি লিপু ও তার পরিবারের খোঁজখবর রেখেছেন। তার বিচারের দাবিতে আন্দোলন করেছেন। সময়ের ব্যবধানে পুলিশ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বা বন্ধু-বান্ধবের অনেকেই হয়তো লিপুর কথা ভুলে গেছেন।

লিপু হত্যার প্রায় দুই বছর হতে চলল। কিন্তু এখন পর্যন্ত অভিযোগপত্রও দিতে পারেননি তদন্ত কর্মকর্তা।

এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সন্তানহারা বাবা বদরউদ্দিন বলেন, ‘কিডা তদন্ত করবে, নিজে বোঝো না। আমি এক ওসিরে প্রায় এক বছর আগে বললাম। সে বলল আমার কাছে কেস (মামলা) নাই। কেস গোয়েন্দা বিভাগে চইলি গেছে। ওই কইয়া কাইটে দিয়েছে। আমরা কী আর জানি, কনে গোয়েন্দা আর কনে কেডা। আমার সেই সামর্থ্য থাকলে তো বিচারই হইত।’

২০১৬ সালের ১৯ অক্টোবর রাতে রাবির নবাব আবদুল লতিফ হলে খুন হন লিপু। হত্যার দুই তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হওয়ার পর দায়িত্ব পালন করছেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পরিদর্শক আসমাউল হক। তিনি প্রিয়.কমকে বলেন, ‘ওইভাবে ভালো কিছু পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা ওইটা (খিচুড়ি ভোজ) নিয়েই কাজ করছি। দেখছি, ছাত্রলীগের খিচুড়ি পার্টিতে কারা কারা উপস্থিত ছিল। ক্যাম্পাসে তো কথাবার্তা বের করা কষ্ট।’

নবাব আব্দুল লতিফ হলের পশ্চিম ব্লকে ওই রাতে একটি পার্টি হয়। এতে হলটির নৈশপ্রহরী এবং রাবি শাখা ছাত্রলীগের ‘বিতর্কিত’ এক নেতা উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

‘গার্ড অনেক সময় দাঁড়িয়ে ছিলেন’

লিপুর সহপাঠীদের অভিযোগ, রাবি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মিজানুর রহমান রানার সময় দলটির একটা শক্তিশালী চক্র ভর্তি ও বিভিন্ন নিয়োগ বাণিজ্য করত। রাবি ক্যাম্পাসে ভর্তি বাণিজ্যে এখনো তাদের প্রভাব আছে। লিপু ওই চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিলেন।

২০১৬ সালের ২০ অক্টোবর রাজশাহীতে রেলওয়ের একটি নিয়োগ পরীক্ষা ছিল। এর আগের রাতে লিপু খুন হন।

ওই প্রসঙ্গ টেনে লিপুর এক সহপাঠী বলেন, ‘চাকরি পরীক্ষার প্রক্সি দিতে গিয়ে লিপু একবার ধরা খায়। জেলও খাটে। তারপর থেকে লিপু আর প্রক্সি দিতে রাজি হচ্ছিল না। কিন্তু ওই গ্রুপ চাচ্ছিল, লিপু আরও প্রক্সি পরীক্ষায় অংশ নিক।’

নবাব আবদুল লতিফ হলের ফটকের সামনে ক্লোজড সার্কিট টেলিভিশন (সিসিটিভি) ক্যামেরা ছিল। ওই রাতের সিসিটিভির ফুটেজ তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে রয়েছে।

লিপুর এক সহপাঠী বলেন, ‘মিজানুর রহমান রানার সময়কার এক ছাত্রলীগ নেতাকে ওই রাতে হুন্ডা নিয়ে হলে প্রবেশ করতে দেখা যায়।’

আরেক সহপাঠী বলেন, ‘বাইক নিয়ে একজন আসেন। তবে ওই হলের গার্ডের মুভমেন্ট স্বাভাবিক মনে হয়নি। এক জায়গায় তিনি অনেক সময় দাঁড়িয়ে ছিলেন।’

লিপুর সহপাঠীদের ভাষ্য, এই মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা অশোক চৌহানই হয়তো আসামিদের শনাক্ত করে ফেলেছিলেন। ঘটনার অল্প সময় পর তিনি রাজশাহী থেকে বদলি হয়ে যান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চাইলেই আসামিদের শনাক্ত করতে পারে, কিন্তু করছে না।

‘সব ছেলেটেলে বেড়ায় সামনে’

ফোন করে লিপুর আব্বা বদরউদ্দিন ২২ মিনিট ২৩ সেকেন্ড কথা বলেন। সে সময় লিপুর বাবার কান্না আর দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে ওঠে কথোপকথনের মুহূর্ত।

একমাত্র ছেলেসন্তানকে নিয়ে বদরউদ্দিন বলেন, ‘আমাদের কেমন এখন, বোঝোই তো। আমাদের মূল যে যাওয়ার…। ভালো আমরা যতই থাকি, যার সন্তান হারায়, এই বয়সে সেই জানে কিরম ভালো থাকা যায়। ঈদের দিন জোগাড় করে খাওয়ার সময় কিরম লাগে বা বেড়ানোর সময় কিরম লাগে। সব ছেলেটেলে বেড়ায় সামনে।

কেউ তো খবর নেয়ই না, আমি একটু নিয়ে দেখি। আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে যেটুকু বুঝি, যারা মোহাব্বত করে, তারা খোঁজখবর নেয়।’

হত্যাকারীদের উদ্দেশে লিপুর বাবার প্রশ্ন, ‘আমার ছেলেডারে কী দোষে মারল, আমি সেডাই জানতি পারলাম না। যারা মাইরা ফেলাইছে, তারা কি খুব ভালো আছে? তারাও তো মরবে একদিন, নাকি মরবে না?’ সূত্র: প্রিয়. কম

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত