প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

দরদাম না করে প্লাস্টিকের ইলিশ খুঁজুন!

মোহাম্মদ আবু নোমান : একটু বড় সন্তানেরা বুঝে বাবার কাছে কোনো আবদার করা যাবে না, এতে বাবা বেশী কষ্ট পাবেন। কিন্তু অবুঝ ছোট সন্তানরা! বৃদ্ধ বাবা-মা ও স্ত্রী কোনো রকম আজকের দিনটি পার করে দেওয়ার অপেক্ষায় থাকেন। ঈদসহ যেকোনো উৎসব তাদের জন্য বিভীষিকাময়। ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী, বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাতে হয়। এর বাইরে এদেরও অসুখ-বিসুখ হয়, আছে আত্মীয়-স্বজনও। ভাবা যায়? তারা কেমন আছেন? কিভাবে চলছেন? প্রাণখোলা একটু হাসি তাদের মুখে আছে কি? তারা আমাদের সম্মানিত শিক্ষক যারা নন-এমপিও।

চাল আটা গোলআলু পেয়াজ তরকারী বা তেলের দোকানে এ পরিচয়ে চলবে না যেÑ আমি নন-এমপিও শিক্ষক। দোকানীর কাছ থেকে ক্রয় করতে হলে এমপিওভুক্ত ও সরকারি চাকুরিওয়ালাদের সাথে একই দামে নিতে হবে। পকেটের কথা চিন্তা করে দরদাম করতে গেলে বে-ইজ্জতি হওয়াও স্বাভাবিক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, ছোট ইলিশের দাম করতে গেলে পাতিলওয়ালা ইলিশ বিক্রেতা ধমকের সুরে বলে, ‘এতো দরদাম না করে প্লাস্টিকের ইলিশ খুঁজুন’। এর বাইরে নন এমপিওদের পরিবারে ছেলে-মেয়েদের জন্য মাছ, গরুর গোশতের বাজারÑ সেতো স্বপ্ন!

স¯প্রতি বিভিন্ন পর্যায়ে রাষ্ট্রের বেতন ও সুবিধভোগীরা যখন ঈদ উৎসবের কেনাকাটায় ব্যস্ত, তখন এসব নন-এমপিও শিক্ষকরা বেতনের দাবিতে রোদ, বৃষ্টি, ঝড় উপেক্ষা করে খোলা আকাশের নীচে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান ধর্মঘট পালন করে। অনেক নারী শিক্ষক ছোট সন্তানকে বাড়িতে রেখে কেউ সাথে নিয়েই আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন।

জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম গত ২৪ জুন জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তরে বলেছেন, বর্তমান সরকারের মেয়াদে প্রশাসনে ৬ লাখ ১৩ হাজার ১৫৫টি পদ সৃজন করা হয়েছে। আরও ৫২ হাজার ৭৯টি পদ সৃজনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এছাড়াও দাবি না থাকা, না চাওয়া সত্ত্বেও অনেক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সরকার জাতীয়করণ করছে। অথচ নন-এমপিওদের বারবার ওয়াদা দিয়েও এমপিওভুক্ত করা হয়নি। এই শিক্ষকদের বেতন দেওয়ার সামর্থ্য সরকারের নেইÑ একথা কোনোভাবেই মানা সম্ভব নয়। দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হওয়া না-হওয়া অনেকটা রাজনৈতিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত থাকেন, ভালো ফল না করা সত্ত্বেও সেগুলো দ্রুত এমপিওভুক্ত হয়। আবার তদবিরের জোর না থাকায় ভালো ফল করেও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হতে পারেনি। শিক্ষা, শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে সরকারের নীতি স্পষ্টই স্ববিরোধী, একপেশে ও বৈষম্যমূলক।

বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে এক প্রশ্নে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারি কর্মচারীরা এখন যেসব সুবিধা ভোগ করছেন, তারা জীবনে কখনো এমন সুযোগ-সুবিধা পাননি। তাদের বেতন ৪০ হাজার টাকা থেকে এক লাফে ৮২ হাজার টাকা হয়েছে। তাদের পেনশনে বার্ষিক ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হয়েছে…। আমার মনে হয় তাদের আর দাবি নেই।’ প্রস্তাবিত বাজেট আবার সহজশর্তে গৃহঋণ সুবিধা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এছাড়াও ফিবছর বেতন বৃদ্ধি, বৈশাখী ভাতা, ঈদ বোনাস, মোবাইল কেনায় বরাদ্দ, গাড়ি কেনার সহজ সুবিধা, অবসর ভাতা, স্বামী মারা গেলে স্ত্রীর আর্থিক সুবিধা লাভ ইত্যাদি অন্যান্য বিষয়ে লিখে লেখার কলেবর বড় করতে চাই না। তার মানে ষোলআনায় ভরপুর সরকারি চাকরিজীবীরা।

নতুন অর্থবছরে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হবে। তীর্থের কাকের মতো দীর্ঘ কষ্টের অপেক্ষার একদিন হয়তো অবসান হবে, এ আসায় ছিলেন শিক্ষকরা। কিন্তু ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের বাজেটে নতুন এমপিওভুক্তির বিষয়ে সুস্পষ্ট কিছু না থাকায় ভেঙে পড়েন শিক্ষকরা। আন্দোলনকারী শিক্ষকরা বলেন, ‘আমরা বেতন-ভাতার জন্য পরিবার ছেড়ে রাজপথে নেমেছি। ঈদের দিনেও পরিবারের সঙ্গে থাকতে পারিনি, একটু মিষ্টি মুখে দেয়ারও ভাগ্য হয়নি। শিক্ষকতা করে কি আমরা অপরাধ করছি…? এসব বলতে বলতে তারা কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেকে। বরিশালের জল্লা ইউনিয়ন আইডিয়াল কলেজের ইতিহাসের প্রভাষক অরুণ কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘গত ১৮ বছর ধরে আমি শিক্ষকতা করছি। টিউশনি করে চলতে হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স করে শিক্ষকতা পেশায় এসে মানবেতর জীবন যাপন করছি। বিয়ে পর্যন্ত করতে পারিনি। বর্তমানে ছোট বোনের বিয়ের খরচ যোগাতে পারছি না। শিক্ষকতা পেশায় এসে কি তাহলে ভুল করেছি…?’

বর্তমানে সারা দেশে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে ৫ হাজার ২৪২টি। এগুলোতে শিক্ষক-কর্মচারী আছেন ৭৫ থেকে ৮০ হাজার। এমপিওভুক্ত না হওয়ায় এসব শিক্ষকরা ন্যূনতম বেতন-ভাতা না পেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। শিক্ষাদানের মতো মহৎ পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য এমন পরিস্থিতি লজ্জাজনক, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। শিক্ষকেরা না বাঁচলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা শিক্ষা, কোনোটিই রক্ষা করা যাবে না। শিক্ষকসমাজকে পিছনে রেখে রাষ্ট্র কখনোই এগিয়ে যেতে পারবে না। এতে রাষ্ট্রেরই ক্ষতি হচ্ছে। এ ক্ষতি থেকেও দেশকে রক্ষা করা এখনই জরুরি।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক/সম্পাদনা: মোহাম্মদ আবদুল অদুদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত