প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শতভাগ পেনশন তুলতে চান চাকরিজীবীরা

ডেস্ক রিপোর্ট: চাকরি শেষে পেনশন সুবিধা তুলে নেয়ার ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী আগের নিয়মে ফিরে যেতে চান। বর্তমান নিয়মে তারা সরকারের কোষাগারে পেনশনের ৫০ শতাংশ সংরক্ষণের বিধান মানতে নারাজ। অনেকে এ নিয়ে চরম ক্ষুব্ধ ও হতাশ। এ বিষয়ে আমাদেরকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় তারা বলেন, ৫০ ভাগ অর্থ সরকার রেখে দেয়ায় তারা বাকি টাকা দিয়ে একটি ফ্ল্যাটও কিনতে পারছেন না।

এরপর ছেলেমেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয় তো বাকি। তারা বলছেন, যারা সততার সঙ্গে কর্মজীবন পার করেছেন চাকরিজীবনে তাদের অনেকে ফ্ল্যাট কিংবা পরিবারের জন্য আবাসস্থল নির্মাণ করতে পারেননি। পুরো কর্মজীবন পার হয়েছে সরকারি বাসায়। অনেকের ছেলেমেয়ে এখনও লেখাপড়া শেষ করতে পারেনি। ফলে পেনশনের অর্ধেক টাকা দিয়ে তারা কিছুই করতে পারছেন না। বরং বিপাকে পড়েছেন।

তাদের জোরালো দাবি, ৫০ ভাগ পেনশন সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করার ক্ষেত্রে সরকারের যুক্তি যতই শক্ত হোক না কেন, তা যদি সুবিধাভোগীকে বেকায়দায় ফেলে দেয় তাহলে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বরং সরকার যদি একেবারে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে না চায় সে ক্ষেত্রে এক বছরের জন্য পরীক্ষামূলক একটি সমীক্ষা চালাতে পারে।

সেটি হল- পেনশন সংরক্ষণে বাধ্যতামূলক শব্দটি প্রত্যাহার করে নেয়া। অর্থাৎ যিনি চাইবেন তিনি পুরো পেনশন এককালীন তুলে নিতে পারবেন। এভাবে এক বছরের পেনশন সুবিধা জরিপ করে সরকার যদি দেখতে পায় বেশিরভাগ কর্মকর্তা পেনশনের অর্ধেক টাকা সংরক্ষণ করছেন তাহলে এ সিদ্ধান্ত পুনর্বহালে তাদের কোনো আপত্তি থাকবে না। কিন্তু জোর করে এভাবে চাপিয়ে দিলে সরকারি দলের প্রতি পেনশনভোগীরা স্বাভাবিকভাবে ক্ষুব্ধ হবেন।

অবশ্য চাকরিজীবীবের কেউ কেউ অর্ধেক পেনশন সংরক্ষণ করার পক্ষেও মত দিয়েছেন। তাদের মতে, সরকারের কাছে পেনশনের অর্ধেক সংরক্ষণ থাকাটা সারা জীবনের এক ধরনের আর্থিক নিরাপত্তা। বিশেষ করে বৃদ্ধ বয়সে কোনো ধরনের অর্থ সংকটের মুখে পড়তে হবে না। পাশাপাশি কারও ওপর নির্ভরশীল হয়েও থাকতে হবে না।

এদিকে এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, পেনশন হচ্ছে সারা জীবনের নিরাপত্তা। বিদ্যমান প্রথা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকতে পারে। তবে ইতিমধ্যে যারা পেনশনের ১০০ ভাগ তুলে নিয়েছেন তাদের মধ্যে অনেকের অবস্থা ভালো নয়। অনেকে আমাদের সঙ্গে এসে যোগাযোগও করছেন। অর্ধেক পেনশন সংরক্ষণের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেছেন।

ফলে সরকার সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে এ প্রথা চালু করেছে। প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের পহেলা জুলাই থেকে সরকারি চাকরিজীবীর পেনশনের ৫০ শতাংশ পরিবারের জন্য সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে অবসরে যাওয়ার সময় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের পেনশনের অর্থ অর্ধেকের বেশি সরকারের কাছে বিক্রি করতে পারবেন না।

তবে বাধ্যতামূলক সংরক্ষিত ৫০ শতাংশ পেনশনের ওপর সরকার প্রতিবছর ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দিচ্ছে। গত পহেলা জুলাই থেকে এটি কার্যকর হয়েছে। এর আগে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত পেনশন বিক্রির বিধান ছিল। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারী তার সম্পূর্ণ পেনশন বিক্রি করে তার প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ এককালীন উত্তোলন করতে পারতেন।

সূত্র জানায়, তিনটি প্রধান কারণ বিবেচনায় নিয়ে সরকার পেনশন সংক্রান্ত নতুন বিধান চালু করেছে। এগুলো হচ্ছে- পেনশনভোগীর পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করা, সরকারের ওপর আর্থিক চাপ হ্রাস ও পেনশনের অর্থ বিনিয়োগে নিয়ে আসা। এ ছাড়া নতুন বিধান প্রণয়নের পেছনে আরও দুই কারণ রয়েছে। এক পেনশনের অর্থ সরকারের কাছে থাকলে এটি এক ধরনের বিনিয়োগ।

সরকার ও পেনশনভোগী উভয়ই এ টাকা বিনিয়োগ করে লাভবান হবেন। দ্বিতীয় হচ্ছে পেনশনের টাকা একসঙ্গে প্রদান করার কারণে সরকারের আর্থিক ব্যয়ের ওপর এক ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়। কিন্তু সরকারকে এখন আর্থিক চাপে পড়তে হবে না।

খোদ অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা সোমবার বলেন, চাকরিজীবন শেষে এককালীন পেনশনের টাকা হাতে পেলে যে কোনো একটি বড় কাজ বাস্তবায়ন করা যেত। এর মধ্যে মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করা ছাড়াও সন্তানের বিয়েশাদি সম্পন্ন, আয়-রোজগার বাড়াতে সন্তানদের দেশের বাইরে পাঠানোসহ পারিবারিক কিছু জরুরি সিদ্ধান্ত এ অর্থ দিয়ে বাস্তবায়ন করা যেত। কিন্তু এখন তা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ পেনশনের অর্ধেক টাকা সরকারের কাছে বাধ্যতামূলক সংরক্ষণ করতে হচ্ছে।

অপরদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, পেনশনের ৫০ শতাংশের বেশি বিক্রির বিধান বন্ধ করা হওয়ায় পেনশনভোগীর পরিবারের সদস্যরা এর সুবিধা ভোগ করবেন। অনেকে অবসরের যাওয়ার সময়ই তার সম্পূর্ণ পেনশন সরকারের কাছে বিক্রি করে মোটা অঙ্কের অর্থ পাচ্ছেন। ওই টাকা বিভিন্নভাবে খরচ করে শেষ করছেন।

পরবর্তী সময়ে তাদের বেশির ভাগই আর্থিক দৈন্যদশায় পড়েন। তাদের অনেককেই মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। পেনশনের ৫০ শতাংশ বাধ্যতামূলক সংরক্ষণ ব্যবস্থার কারণে এ অবস্থা থেকে ভবিষতে অনেকেই পরিত্রাণ পাবেন। কারণ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারীর পেনশনের অর্ধেক সরকারের কাছে থাকলে, তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিধান অনুযায়ী প্রতি মাসেই পেনশনের যাবতীয় সুবিধা ভোগ করবেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অবসরের সময় আমার প্রাপ্য পেনশনের টাকা আমি ফেরত পাচ্ছি না। এটি আসলে মন থেকে মানা যাচ্ছে না। কারণ, পুরো টাকা পেলে যে কোনো কাজ সম্পন্ন করতে যেত। তিনি বলেন, ‘বেঁচে থেকে যদি পেনশন ভোগ করতে না পারি তাহলে সারা জীবন চাকরি করে কী লাভ হল?

তার মতে, পেনশনের টাকা নষ্ট করে ফেলেছেন এমন কর্মকর্তার সংখ্যা কম। অনেকে এ টাকা কাজে লাগিয়ে আরও বেশি পরিমাণ অর্থ উপার্জনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছেন। সেখানে দেখা গেছে, মূল পুঁজি নষ্ট হওয়া তো দূরের কথা, আরও বেড়েছে। এভাবে ব্যক্তি বা বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়বে।

এ ক্ষেত্রে সরকার পেনশনের টাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্যাকেজও ঘোষণা করতে পারে। সেরকম কোনো ভালো পলিসি নেয়া সম্ভব হলে প্রতিবছর পেনশনের বিপুল অঙ্কের অর্থ সরাসরি বেসরকারি বিনিয়োগে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। এর ফলে পেনশভোগী কর্মচারী ছাড়াও বেশি উপকৃত হবে দেশ ও দেশের অর্থনীতি।

জানা গেছে, বর্তমান প্রায় ৯ লাখ অবসরভোগী সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী পেনশন পাচ্ছে। প্রস্তাবিত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৬ হাজার ৪৬ কোটি টাকা। আর ২০১৭-১৮ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ থাকছে ১৩ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।

বিদ্যমান অষ্টম বেতন স্কেল অনুযায়ী চাকরির বয়স পাঁচ বছর পূর্ণ হলেই একজন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী অথবা তার পরিবার পেনশন পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। একজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর চাকরির প্রথম ৫ বছর পূর্ণ হলে পেনশন পাবেন ২১ শতাংশ হারে। ৬ বছর পূর্ণ হলে ২৪ শতাংশ, ৭ বছরে ২৭ শতাংশ, ৮ বছরে ৩০ শতাংশ, ৯ বছরে ৩৩ শতাংশ এবং ১০ বছরে ৩৬ শতাংশ হারে পেনশন পাবেন।

এ ছাড়া চাকরির বয়স ১১ বছর পূর্ণ হলে ৩৯ শতাংশ, ১২ বছরে ৪৩, ১৩ বছরে ৪৭ শতাংশ, ১৪ বছরে ৫১ শতাংশ, ১৫ বছরে ৫৪ শতাংশ, ১৬ বছরে ৫৭ শতাংশ, ১৭ বছরে ৬৩ শতাংশ, ১৮ বছরে ৬৫ শতাংশ, ১৯ বছরে ৬৯ শতাংশ এবং ২০ বছর পূর্ণ হলে ৭২ শতাংশ হারে পেনশন পাবেন সংশ্লিষ্ট চাকরিজীবী। আর একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর চাকরির বয়স ২১ বছর পূর্ণ হলে ৭৫ শতাংশ, ২২ বছরে ৭৯ শতাংশ, ২৩ বছরে ৮৩ শতাংশ, ২৪ বছরে ৮৭ শতাংশ এবং ২৫ বছর পূর্ণ হলে ৯০ শতাংশ হারে পেনশন পাবেন।

এ ছাড়া কোনো সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর চাকরির বয়স ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই স্বাস্থ্যগত কারণে অক্ষম বা মৃত্যু হলেও প্রতিবছর বা তার অংশবিশেষের জন্য সংশ্লিষ্ট চাকরিজীবীর সর্বশেষ প্রাপ্য বেতনের তিনটি মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ সহায়তা হিসেবে পাবেন তার পরিবার। সূত্র: যুগান্তর

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত