প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

বাড্ডায় কেন এত খুনোখুনি

ডেস্ক রিপোর্ট: রাজধানীর বাড্ডায় ঘটছে একের পর এক হত্যাকাণ্ড। প্রকাশ্য গুলি করে হত্যার ঘটনা বেড়েই চলছে। গত আড়াই মাসে ওই এলাকার শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতাসহ তিনজন খুন হয়েছেন। এর আগের চিত্র আরো ভয়ঙ্কর। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, নানামুখী অপরাধ, আধিপত্য বিস্তার ও  রাজনৈতিক কোন্দল থেকে প্রতিহিংসার কারণেই ঘটছে এসব হত্যাকাণ্ড।

গত ২২শে এপ্রিল উত্তর বাড্ডার বেরাইদ এলাকায় রাজনৈতিক কোন্দল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে খুন হন বেরাইদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমের চাচাতো ভাই কামরুজ্জামান দুখু।

ঘটনার কয়েকদিনের মাথায় ঢাকা-১১ আসনের এমপি একেএম রহমত উল্লাহর ভাগ্নে ফারুকসহ ১০ জনকে আসামি করে বাড্ডা থানায় মামলা করেন জাহাঙ্গীর আলম। এ মামলায় ফারুক গ্রেপ্তার হলেও গত ১৩ই জুন জামিনে মুক্ত হয়ে বেরিয়ে আসেন। সূত্র জানিয়েছে, বেরাইদ এলাকায় স্থানীয় চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে এমপি’র ভাগ্নে ফারুকের অনুসারীদের রাজনৈতিক কোন্দল দীর্ঘদিনের। দুই পক্ষের মধ্যে একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। বেরাইদের স্থানীয় বাসিন্দাদের কয়েকজন জানিয়েছেন, নিহত কামরুজ্জামানের ভাই চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর সর্বশেষ উচ্চ আদালতের নির্দেশে বন্ধ হয়ে যাওয়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। অপরদিকে ডিএনসিসির এই ৪২ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদপ্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন এমপি রহমতউল্লাহর ছেলে। এ নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল।

একই সঙ্গে ২২শে এপ্রিল সংঘটিত সংঘর্ষের ঘটনায় জাহাঙ্গীর আলমের ভাই কামরুজ্জামান খুন হন।  নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা বলেন,  দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংসদ সদস্য একেএম রহমতুল্লাহর ভাগ্নে ফারুক এবং ইউপি চেয়ারম্যান ও বাড্ডা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীরের মধ্যে বিরোধ চলছিল। সমপ্রতি বেরাইদ ইউনিয়ন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৪২ নম্বর ওয়ার্ডে অন্তর্ভুক্ত হলে ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন এমপিপুত্র হেদায়েতুল্লাহ রনো ও জাহাঙ্গীর আলম। এরপর থেকে এমপি গ্রুপ ও জাহাঙ্গীর গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে রূপ নেয়। তিনি বলেন, বেরাইদ ক্রাউন সিমেন্ট ফ্যাক্টরি নিয়ন্ত্রণ করতো কামরুজ্জামান দুখু। ওই ফ্যাক্টরি থেকে প্রতিমাসে তার আয় ছিল প্রায় ১০ লাখ টাকা। বেশ কয়েক মাস ধরে ফ্যাক্টরিটি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার চেষ্টা করছিল এমপি সমর্থক ভাগ্নে ফারুকের সহযোগীরা। ঘটনার দিন দুপুর থেকে ওই ফ্যাক্টরিতে অবস্থান নেয় ফারুক গ্রুপের মহসিন, আজাদ, মারুফসহ প্রায় অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী। পাল্টাপাল্টি অবস্থান নেয় জাহাঙ্গীর গ্রুপের লোকজনও। পরে বিকালের দিকে বড় বেরাইদ ফোর্ড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বিল্ডার্সের সামনে উভয় গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।

বেরাইদের এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গত ৯ই মে বাড্ডা জাগরণী ক্লাবের পাশে আরেক আওয়ামী লীগ নেতা ও ডিশ ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক ওরফে বাবুকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনার রাতেই খুনিদের তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে ভোররাতে ডিবির সঙ্গে তিনজনের  মধ্যে সাফায়াত নামে একজন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। দক্ষিণ বাড্ডার স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ডিশ ব্যবসা থেকে বাবুর সঙ্গে ফারুক গ্রুপের দ্বন্দ্ব অনেকদিনের। বিশেষ করে ভাগবাটোয়ারা নিয়েই দুই গ্রুপের মধ্যে এ দ্বন্দ্বের সৃষ্টি। এক পর্যায়ে বনিবনা না হওয়ায় বাবুকে খুন করা হয়। এদিকে কামরুজ্জামান ও বাবু হত্যার কিছুদিনের মধ্যে বাড্ডা আবার উত্তাল হয়ে ওঠে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ আলী খুনের ঘটনায়। গত ১৫ই জুন উত্তর বাড্ডা আলীর মোড় সংলগ্ন বাইতুস সালাম জামে মসজিদ থেকে জুম্মার নামাজ পড়ে বের হওয়ার পর প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে। এ ঘটনায় উত্তর বাড্ডার ডিশ ব্যবসায়ী ফজলুল হক দুলাল ওরফে ডিশ দুলালসহ চারজনের নাম উল্লেখ করে বাড্ডা থানায় নিহতের স্ত্রী মোর্শিদা বেগম মামলা করেন। মামলাটি এখন ডিবি তদন্ত করছে।

জানা গেছে. ডিশ ব্যবসা থেকে প্রতি মাসে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের নাম করে লাভের টাকার ৪০ শতাংশ ভাগ নিতেন নিহত ফরহাদ আলী। এক পর্যায়ে লেনদেন নিয়ে দুজনের মাঝে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এ নিয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সমঝোতাও হয়। ফরহাদ আলী খুনের পর তার পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, যেহেতু দুলালের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ছিল তাই এ খুন তিনিই করিয়েছেন। তারই সূত্র ধরে ফরহাদ আলী হত্যা মামলায় দুলাল ও তার মেয়ের স্বামীসহ চারজনের নাম উল্লেখ করে মামলা হয়। তবে বাড্ডার স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, ডিশ নিয়ে দ্বন্দ্ব নয়। এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্যতম কারণ হলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। নিহত ফরহাদ আলী স্থগিত হয়ে যাওয়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর মনোনয়ন পেয়েছিলেন।  এ নিয়ে আওয়ামী লীগের একটি পক্ষ নাখোশ ছিল। তাদের পছন্দের তালিকায় ছিলেন না ফরহাদ আলী। সুকৌশলে খুন করে পথের কাঁটা সরিয়ে দেয়া হয়েছে বলে মন্তব্য তাদের।

বাড্ডায় এত খুনোখুনির পেছনে কারণ জানাতে গিয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি মো. রায়হান বলেন, বাড্ডার অবস্থা খুবই খারাপ। প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হচ্ছে সবাইকে। একের পর এক খুনের পেছনে ডিশ, পরিবহন ব্যবসার ভাগাভাগি ছাড়াও রাজনৈতিক কোন্দল বড় কারণ। জুনিয়ররা একটু সিনিয়র হয়ে গেলে তাদের সিনিয়রদের সম্মান দিতে জানে না। এসব কারণেই মূলত দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। আর একপর্যায়ে খুনের মতো বড় ঘটনাও ঘটে যাচ্ছে।

এর আগে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ভাই কামরুজ্জামান খুন হওয়ার পর বেরাইদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও বাড্ডা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘এমপি তার ভাগিনাকে মহানগর আওয়ামী লীগের পদ দিতে চান। ছেলে হেদায়েত উল্লাহকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কাউন্সিলর করতে চান। আমি যেন বাড্ডা এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য করতে না পারি সেজন্য তিনি অপরাজনীতি করছেন। এলাকাবাসী এটা মেনে নেবে না বলে তারা স্থানীয় আওয়ামী লীগের লোকজনের ওপর গুলি চালিয়েছে। এদিকে বাড্ডায় এত খুনোখুনির বিষয়ে সংসদ সদস্য একেএম রহমতউল্লাহ মানবজমিনকে বলেন, মার্ডার হওয়ার পেছনের কারণ তো আমার জানার বিষয় নয়। এটা থানা পুলিশ ভালো বলতে পারবে। এটা তো রাজনৈতিক কোনো ব্যাপার নয়। সর্বশেষ হত্যাকাণ্ডের শিকার ফরহাদ আলী আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের শিকার কিনা এমন প্রশ্নে এমপি বলেন, এটা এলাকার মধ্যে ডিশ বাণিজ্য নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে এই তিন খুনের বাইরে খুনোখুনির সংখ্যা নেহায়েত কম হচ্ছে না বাড্ডায়। ১৭ই ফেব্রুয়ারি দুপুরে মেরুল বাড্ডার মাছের আড়তে প্রকাশ্যে আবুল বাশার নামে এক যুবককে গুলি চালিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যাওয়ার সময় জনতা অস্ত্রসহ নুরুল ইসলাম ওরফে নূরী (৩৮)কে ধরে পুলিশে দেয়। পরে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নূরী নিহত হয়। পুলিশ জানিয়েছে, নূরী ও বাশার একই সন্ত্রাসী দলের সদস্য ছিল। নূরীর বিরুদ্ধে বনানীর এমএস মুন্সি ওভারসিজ (জনশক্তি রপ্তানি) প্রতিষ্ঠানের মালিক সিদ্দিক হোসেন মুন্সী (৫০)কে হত্যা এবং বাড্ডায় চার খুনসহ ডজনখানেক অভিযোগ ছিল। রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের বাইরেও বাড্ডায় গত এক বছরে বেশকিছু খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গত বছরের ২রা নভেম্বর পরকীয়ার জেরে উত্তর বাড্ডা এলাকায় খুন হয় জামিল শেখ (৩৮) ও তার মেয়ে নুসরাত আক্তার জিদনী (৯) নামের বাবা-মেয়ে। এর আগে ৬ই নভেম্বর মধ্য বাড্ডা এলাকায় বিপিএল-এর বাজিতে বাধা দেয়া মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মো. নাসিম (২৩) খুন হন।

গোয়েন্দারা বলছেন, বাড্ডায় আশেপাশে বিভিন্ন দেশের অ্যাম্বেসিসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ অফিস রয়েছে। এছাড়া শিক্ষিত উচ্চবিত্তদের পাশাপাশি নিম্নবিত্ত কম শিক্ষিতদের বসবাস। এর বাইরে বাড্ডা ও আশেপাশের এলাকায় বেশকিছু শীর্ষ সন্ত্রাসী থাকার কারণে বেশ কিছু অপরাধ হচ্ছে। এখানে সিএনজি- লেগুনা স্ট্যান্ড, ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন স্থাপনা, ফুটপাথ, বাজারসহ আরো কিছু ক্ষেত্র থেকে চাঁদাবাজি হয়। ডিশ ব্যবসা, ক্যাবল নেটওয়ার্ক ব্যবসাসহ অন্যান্য ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ হয়। পাশাপাশি রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, অভ্যন্তরীণ কোন্দল  থেকে অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। আর বর্তমান সময়ে মাদকের বিস্তার হওয়ার অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক ঘটনাই ঘটছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা শাখার উত্তরের উপ-কমিশনার মশিউর রহমান বলেন, জিসান, ডালিম মেহেদীসহ আরো কিছু সন্ত্রাসী মালয়েশিয়া, ভারত ও দুবাইতে অবস্থান করছে। সেখানে বসেই চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে ইন্ধন যোগাচ্ছে। এলাকার বখাটে, অর্ধশিক্ষিত ছেলেদের কাজে লাগিয়ে আধিপত্য বিস্তার করছে। এমনকি জেলে বসে অনেক অপরাধী আধিপত্য বিস্তার করছে। পরস্পর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আবার অনেক সময় তুচ্ছ কারণে সংঘাত সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করছি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার। আর ফরহাদ হত্যার খুনিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে তিনি জানান। সূত্র: মানবজমিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত