প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

একটি রহস্যময় হোটেলের গল্প

ডেস্ক রিপোর্ট : উত্তর কোরিয়ার ইয়াংগাকডো হোটেলের পঞ্চম তলা সাধারণ লোকের জন্য উন্মুক্ত নয়। ভ্রমণ বিষয়ক ব্লগাররা এই হোটেলের গোপন পাঁচতলায় কি আছে তা নিয়ে ইন্টারনেটে অনেক জল্পনা কল্পনা করেছেন।

২০১৭ সালে সেখান থেকে আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ওটো ভার্মবিয়েরকে আটক করেন কোরিয়ান কর্মকর্তারা। কোরিয়ান কর্মকর্তাদের কাছে বন্দী অবস্থায় ভার্মবিয়ের আহত হন এবং সংজ্ঞা হারান। পরে আর কখনো তার জ্ঞান ফেরেনি।

উত্তর কোরিয়ান কর্মকর্তারা বলেন, ‘ভ্রমণে গিয়ে ভার্মবিয়ের ওই হোটেল থেকে একটি উত্তর কোরিয়ান পোস্টার চুরি করার চেষ্টা করেছিলেন।’

এরপর তার একটা সাজানো বিচার হয় তার, টিভিতে প্রচার হয় একটা জোর করে ধারণ করা স্বীকারোক্তি।

২০১৭ সালের জুন মাসে ওটো ভার্মবিয়েরের মৃত্যু আন্তর্জাতিক সংবাদের শিরোনাম হয়। সিসিটিভি ক্যামেরা ফুটেজে আভাস পাওয়া যায় যে, ভার্মবিয়ের ওই হোটেলের এমন একটি অংশে গিয়েছিলেন, যা সাধারণ লোকের জন্য উন্মুক্ত নয়।

ওই হোটেলে আগে গেছেন এমন কয়েকজন বলেছেন, তিনি নিশ্চয়ই সেই পাঁচ তলায় গিয়েছিলেন এবং দেয়াল থেকে কোনো একটি প্রচারণামূলক পোস্টার সরিয়েছিলেন।

কিন্তু উত্তর কোরিয়ার সরকার বা হোটেলে কর্তৃপক্ষ কখনোই তা নিশ্চিত করেনি। আর তারা কখনো পঞ্চম তলার অস্তিত্বের কথাও স্বীকার করেনি।

ভার্মবিয়ের আগে ২০১১ সালে উত্তর কোরিয়ায় ট্যুরে গিয়ে ওই হোটেলে উঠেছিলেন মার্কিন চিকিৎসক কেলভিন সান। এক রাতে সান ও তার দল হোটেলের সেই গোপন পঞ্চম তলায় গিয়েছিলেন।

স্মৃতিচারণ করে সান বলেছেন, ‘আমরা যখন সেখানে ছিলাম তখন সেখোনে এমন কোনো পোস্টার ছিল না যা খুলে নেওয়া যাবে। সবই ছিল দেয়ালে আঁকা বা দেয়ালের সাথে পেরেক দিয়ে আটকানো।’

সানের গ্রুপে কয়েকজন অভিজ্ঞ পর্যটক ছিলেন যারা ওই পঞ্চম তলার কথা শুনেছিলেন। কিন্তু সান এ ব্যাপারে কিছুই জানতেন না।

সান বলেন, ‘ইয়াংগাকডো হোটেলের পাঁচ তলায় গেছি এমন প্রথম লোক আমরা ছিলাম না, শেষও ছিলাম না। ২০১১ সাল পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ায় কোনো পর্যটককে কখনো আটক করা হয়নি।

ওটোর যা হয়েছে, তা আমার কাছে একটা মর্মান্তিক ব্যাপার। তবে ২০১১ সালে আমাদের জানা ছিল না যে আমরা কোনো বাড়াবাড়ি করছি কিনা বা আমরা যা করছি তাতে ওটোর মতো দু:খজনক পরিণতিও হতে পারতো।’

রহস্যময় পাঁচতলায় কেলভিন সানের দলের রাত কাটানোর কাহিনি

ইয়াংগাকডো হোটেলে অবস্থানের এক রাতে ঘুমোতে যাবার আগে সানের দলের একজন প্রস্তাব করেন, হোটেলটার বাকি অংশগুলো ঘুরে দেখলে কেমন হয়?

ট্যুর গাইডদের ছাড়া নিজেরা নিজেরা ভবনটি ঘুরে দেখার এটাই সুযোগ। তারা প্রথমে উঠলেন খোলা ছাদে। তারপর গেলেন একেবারে ওপরের তলায় ঘূর্ণায়মান রেস্তোরাঁতে। তারপর লিফট দিয়ে নিচে নামতে লাগলেন।

তখনই দলের একজন খেয়াল করলেন যে লিফটে পাঁচ তলায় যাবার কোনো বোতাম নেই। লিফটের প্যানেলে দেখা যাচ্ছে চারতলা, তারপরই পাঁচ বাদ দিয়ে ছয় তলা।

‘আমাদের দেখা উচিত এর কোন পাঁচ তলা আসলেই আছে কিনা। নাকি তারা কোন কুসংস্কারের কারণে ইচ্ছা করেই লিফটে পাঁচতলা বলে কিছু রাখেনি’ বললেন একজন।

সানরা পাঁচ তলায় ঢুকতে গিয়ে তারা দেখলেন সেখানে কোনো পাহারা নেই এবং পথটা খোলা। তারা যার যার ক্যামেরা বের করে ভেতরে ঢুকলেন।

প্রথম যেটা তাদের চোখে পড়লো যে সেই ফ্লোরের ছাদ খুব নিচু, অন্য তলাগুলোর তুলনায় প্রায় অর্ধেক। তাদের কয়েকজনকে মাথা কাত করে বা নিচু করে চলতে হচ্ছিল। তারা একেকজন গেলেন একেক দিকে।

হাঁটতে হাঁটতে সান খেয়াল করলেন যে পুরো জায়গাটায় আলো খুব কম, কংক্রিটের বাংকারের মতো। নিচু সিলিং ছাড়া বাকিটা দেখতে একটা সাধারণ হোটেলের করিডোরের মতোই, দুই পাশে দরজা।

বেশিরভাগ দরজাই বন্ধ, তবে একটি কক্ষ খোলা। দরজার বাইরে একজোড়া জুতো পড়ে আছে। কিন্তু ভেতরে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেলেন না তারা।

সান বলেন, ‘ঘরটার ভেতর থেকে আলো আসছিল। আমরা সিকিউরিটি ক্যামেরা দেখতে পেলাম। কিছু টিভি পর্দা আছে, তাতে বিভিন্ন বেডরুমের ভেতরের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।

এমন কিছু যন্ত্রপাতি দেখা যাচ্ছে যা নজরদারির জন্য ব্যবহৃত হয় বলে মনে হলো। আমি ভাবলাম, হোটেলের কর্মীরা অতিথিদের ওপর নজরদারি করার যে কথা শোনা গেছে তার যন্ত্রপাতি এখানেই রাখা হয়।’

সানের একজন বন্ধু জায়গাটির একটা ভিডিও করতে শুরু করলেন। সান ছবি তুলতে লাগলেন। সবাই কথা বলছিলেন ফিস ফিস করে। ‘আমরা দুর্ঘটনাবশত: ফ্ল্যাশ ফটোগ্রাফিও ব্যবহার করেছি কিন্তু কেউ আমাদের খুঁজতে আসেনি’ বলেন সান।

ঘরগুলোর দেয়ালে উজ্জ্বল রঙে আঁকা আমেরিকা ও জাপান-বিরোধী প্রচারণামূলক ছবি ঝোলানো ছিল। এর কোনো কোনোটিতে ছিল সাবেক শীর্ষ নেতা কিম জং ইলের ছবি।

একটি ছবির ক্যাপশনে বলা হয়েছে ‘এই বোমা আমেরিকানদের তৈরি। আমেরিকানদের তৈরি যে কোনো জিনিসই আমাদের শত্রু। আমেরিকার বিরুদ্ধে লাখ লাখ বার প্রতিশোধ নাও।’

কয়েক মিনিট পরে একজন অপরিচিত লোক ছায়ার ভেতর থেকে বেরিয়ে এগিয়ে এলো তাদের দিকে। ইংরেজিতে তিনি শান্তভাবে জিজ্ঞেস করলেন, ‘পথ হারিয়েছো?’

কেউ একজন বললো, হ্যাঁ। লোকটি মাথা নাড়লো, আঙুল দেখালো সিঁড়ির দিকে। সানের দল শোবার ঘরে ফিরে এলো। তারা একমত হলো পঞ্চম তলায় আবার যাবেন তারা।

পাঁচতলায় গিয়ে ওই দলের একজন একটা দরজা খুললো। কিন্তু খোলার পর দেখা গেল একটা ইটের দেয়াল ছাড়া কিছুই নেই। আরেকজন আরেকটি দরজা খুলে দেখতে পেল, সেখান থেকে একটা সিঁড়ি উঠে গেছে আরেক তলায়।

একটা ফ্লোরের ভেতরই আরেকটা ফ্লোর। তালাবন্ধ কক্ষ এবং দেয়ালে লাগানো আরো পোস্টার দেখতে পেলেন সানের দল। কোরিয়ান ভাষা জানা ছিল না সানের। কিন্তু ইউটিউবে তার ভিডিও তোলার পর তিনি এর কিছু বার্তার অর্থ জানতে পারলেন।

এসব পোস্টারে কিম পরিবারের শক্তি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর প্রতিশোধ নেওয়ার কথা আছে। একবিংশ শতাব্দীকে প্রযুক্তির যুগ বলে ঘোষণা করা হয়েছে আরেকটি পোস্টারে, তাতে দেখা যাচ্ছে ১৯৮০র দশকের একটি কম্পিউটারের ছবি।

একটু পর আরেক জন হোটেল কর্মকর্তা সেখানে আবির্ভূত হলেন এবং ভদ্রভাবে বললেন তাদের যার যার ঘরে ফিরে যেতে।

কিন্তু এরপরও কয়েকজন তৃতীয় বারের মতো ওই পাঁচতলায় গেলেন। এবার আরেকজন রক্ষী সেখানে এলেন এবং আবারও শান্তভাবে তাদের ঘরে ফিরে যেতে বললেন।

সান বলেন, ‘আমাদের সবারই বয়স ছিল ২০-এর কোঠায়। আমার বোকা এবং সরল ছিলাম। আমাদের কাছে ব্যাপারটা নির্দোষ এবং উত্তেজনাপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। কিন্তু ওটোর অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি, আমরা এখন যা জানি তা তখন জানলে এটা করতাম না।’

সান আরও বলেন, ‘এখন আমরা যতটুকু জানি, তার ভিত্তিতে আমি সব পর্যটককে বলবো যখন যে দেশে যায় সেই দেশের রীতিনীতিকে যেন সম্মান করে।’

সানরা যে ট্যুর অপারেটরকে ভাড়া করেছিলেন, সেই ইয়ং পাইওনিয়ার ট্যুরসের ওয়েবসাইটে এখন একটি পাতা আছে যাতে বলা আছে যে পর্যটকদের জন্য পাঁচ তলায় যাওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

এ রকম কোনো সতর্কবাণী ২০১১ সালে অনলাইনে বা অফলাইনে কোথাও ছিল না।

সূত্র : বিবিসি বাংলা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত