প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি ১০ বছরে সর্বনিম্ন

ডেস্ক রিপোর্ট: এক দশক ধরেই দেশের ব্যাংকিং খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি কমছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরেও ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ২১ শতাংশের উপরে। ধারাবাহিকভাবে কমে এক দশক পর তা ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। যদিও এক দশক ধরেই ব্যাংকিং খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি রয়েছে ১২ শতাংশের উপরে।

ব্যাংকাররা বলছেন, আমানতের ওপর আবগারি শুল্কের খড়্গ, ফারমার্স ব্যাংকসহ একের পর এক ব্যাংক কেলেঙ্কারি, আমানতের সর্বনিম্ন সুদসহ নানা কারণে সাধারণ মানুষ ব্যাংকবিমুখ হয়েছে। সঞ্চয়পত্রে লাগামহীন বিনিয়োগ, পোস্ট অফিসভিত্তিক সঞ্চয় প্রকল্পের কারণেও ব্যাংক আমানতে টান পড়েছে। অন্যদিকে রেকর্ড আমদানি ব্যয় মেটাতে প্রতিনিয়ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলার কিনছে ব্যাংকগুলো। ডলার কিনতে গিয়ে হাতে থাকা আমানতের টাকাও বাংলাদেশ ব্যাংকে চলে যাচ্ছে।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, সঞ্চয়পত্র ও পোস্ট অফিসভিত্তিক সঞ্চয় প্রকল্পে বড় অংকের টাকা চলে যাচ্ছে। রফতানি ও রেমিট্যান্সের তুলনায় আমদানির প্রবৃদ্ধি অনেক বেশি। প্রায় ২৫ শতাংশ আমদানি প্রবৃদ্ধির দায় মেটানোর জন্য ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রতিনিয়ত ডলার কিনছে। এর মাধ্যমে বড় অংকের অর্থ ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে চলে যাচ্ছে। এ কারণে ব্যাংকিং খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধিতে টান পড়েছে।

তিনি বলেন, দেশের আর্থিক খাতকে সুসংহত করার জন্য বন্ড মার্কেট শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই। স্বল্পমেয়াদি আমানত দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০০৯ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতের (ডিমান্ড ও টাইম ডিপোজিট) পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এক বছর পর ২০১০ সালের জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ১৬ হাজার ৬৬০ কোটি টাকায়। সে হিসাবে বছরটিতে ব্যাংকে আমানত বাড়ে ৫৬ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা বা ২১ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এরপর ২০১০-১১ অর্থবছর শেষে ব্যাংকিং খাতে আমানত ২১ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেড়ে ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা দাঁড়ায়। তার পর থেকেই আমানত প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী। ২০১১-১২ অর্থবছরে ১৮ দশমিক ৯১ শতাংশ আমানত প্রবৃদ্ধি হলেও ২০১২-১৩ অর্থবছরে তা ১৬ দশমিক ৮৩ শতাংশে নেমে আসে। এছাড়া ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ব্যাংকিং খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি আরো কমে দাঁড়ায় ১৬ দশমিক ৩৬ ও ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১২ দশমিক ১৭ শতাংশে। ২০১৬ সালের জুন শেষে ব্যাংকিং খাতের আমানতের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭ লাখ ৯৩ হাজার ৭১০ কোটি টাকা। অর্থবছরটিতে আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ৫২ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ব্যাংকিং খাতের আমানত প্রবৃদ্ধিতে মূল বিপর্যয় শুরু হয় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে। বছরটিতে ব্যাংকিং খাতে আমানত প্রবৃদ্ধি হয় মাত্র ১০ দশমিক ৬০ শতাংশ। এরপর চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে আমানতের এ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। চলতি বছরের এপ্রিল শেষে ব্যাংকিং খাতে তলবি ও মেয়াদি আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৩১ হাজার ১২১ কোটি টাকা। অন্যান্য আমানতসহ বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে মোট প্রায় ১০ লাখ কোটি টাকার আমানত রয়েছে। আমানতের অর্থ থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করেছে ৯ লাখ ৭২ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা।

ব্যাংকিং খাতের সাম্প্রতিক সংকটের জন্য বেসরকারি ব্যাংকগুলোর আগ্রাসী বিনিয়োগকে দায়ী করেন অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে ১০০ টাকা আমানত নিয়ে ৯০ টাকাই ঋণ দিয়ে দিয়েছে। কিছু ব্যাংকের বিষয়ে নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশ মানুষকে বেসরকারি ব্যাংকবিমুখ করেছে। দেশে একটি বড় সময় ধরে বিনিয়োগে স্থবিরতা ছিল।

উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হলেও ব্যবসা-বাণিজ্যে সে অর্থে গতি পায়নি। টাকার আদান-প্রদান বাড়লে ব্যাংকিং খাতও সচল থাকে। আমানতের সুদহার কমে যাওয়াও ব্যাংকিং খাতের সংকট দীর্ঘায়িত করছে। এছাড়া অর্থ পাচার, রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ে ভাটাও আমানত কমে যাওয়ার পেছনে কাজ করেছে।

চলতি বছরের শুরু থেকে আমানত বাড়ানোর জন্য তোড়জোড় চালাচ্ছে বেসরকারি ব্যাংকগুলো। কোনো কোনো বেসরকারি ব্যাংক গ্রাহকদের ১২-১৪ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দেয়ার প্রস্তাব করেছে। তার পরও বাড়ছে না ব্যাংকগুলোর আমানত প্রবৃদ্ধি। গত এপ্রিলে ব্যাংকগুলোর আমানত প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৫ দশমিক ৯৮ শতাংশে। এর আগে মার্চ শেষে আমানত প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৫ দশমিক ৪০ শতাংশ। যদিও এক বছর আগে ২০১৭ সালের এপ্রিল শেষে ব্যাংকিং খাতে ৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ আমানত প্রবৃদ্ধি ছিল। আমানতের নিম্নমুখী ধারা সত্ত্বেও ঋণে উচ্চপ্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলেও ব্যাংকিং খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ২০১৭ সালের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি সাড়ে ১৭ শতাংশ ছাড়িয়েছে।

ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত না পেয়ে ছয় মাস ধরে ব্যাংকগুলো অন্য ব্যাংকের আমানত বাগিয়ে নেয়ার প্রতিযোগিতা চালাচ্ছে। ফলে এক ব্যাংকের আমানত বেশি সুদে অন্য ব্যাংকে যাচ্ছে। ব্যাংকারদের এ তত্পরতাই ব্যাংকিং খাতের সংকট উসকে দিচ্ছে।

সম্প্রতি বিএবি কার্যালয়ে বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তাদের বৈঠকে এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম মজুমদারও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সুদ বাড়িয়ে দিয়ে ব্যাংকগুলো অন্য ব্যাংকের আমানত বাগিয়ে নিচ্ছে। এ কারণেই ব্যাংকিং খাতে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। কোনোভাবেই বেশি সুদ দিয়ে এক ব্যাংকের আমানত অন্য ব্যাংক বাগিয়ে নিতে পারবে না। এমন কোনো ঘটনার কথা জানতে পারলে বিএবির পক্ষ থেকে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করেন তিনি। সূত্র: বণিক বার্তা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত