প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সুমন জাহিদের মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা : তিন ইস্যুতে তদন্তে পুলিশ

নিউজ ডেস্ক: শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের ছেলে ব্যাংক কর্মকর্তা সুমন জাহিদের (৫২) মৃত্যু রহস্য নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি। পরিবার বলছে পরিকল্পিত হত্যা। আর প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছে আত্মহত্যা। তবে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো কিছু পায়নি তার পরিবার ও কাছের মানুষরা। ফলে মৃত্যুর ঘটনাটি পরিকল্পিত হত্যা, না আত্মহত্যা- ঘটনার ১০ দিনেও এ রহস্যের কুলকিনারা করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ৯ বছরের শিশু নাদিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, সুমন জাহিদ নিজেই চলন্ত ট্রেনের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু পারিবারিক জীবনে এমন কোনো অশান্তি ছিল না, যার কারণে তিনি আত্মহত্যা করতে পারেন। মৃতের স্বজনদের দাবি, যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেয়ায় সুমন জাহিদকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। ট্রেনে কাটা পড়ে তিনি মারা যাননি এমনকি আত্মহত্যাও করেননি। পুরো ঘটনাকেই ষড়যন্ত্র বলছেন পরিবারের সদস্যরা। এদিকে সুমন জাহিদের মৃত্যু রহস্য উদ্ঘাটনে পারিবারিক, দুষ্কৃতিকারীদের হুমকি, চাকরি- এই ৩টি কারণ সামনে নিয়ে তদন্তে নেমেছে পুুলিশ। তবে মৃত্যুর ঘটনা যাই হোক, তার মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে চায় পরিবার।

তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধের মামলায় চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেয়ার কারণে ৩ বছর আগে থেকে সুমন জাহিদের প্রতি ক্রমাগত হুমকি ছিল। মোবাইল ফোন, ফেসবুকে নানা হুমকির কারণে আমরা আতঙ্কে থাকতাম। সন্তানরা বাড়ির বাইরে বেশি সময় কাটালেই সুমন আতঙ্কিত হয়ে পড়ত। শঙ্কা ছিল, দুষ্কৃতিকারীরা ছেলেদের কোনো ক্ষতি করে কি না। তখন ওই ঘটনায় থানায় জিডিও করা হয়েছিল। পুলিশও নিয়মিত এসে আমাদের খোঁজখবর নিতেন। কিন্তু আমি টেনশন করতাম বলে, আমার কাছে অনেক কিছু শেয়ার করত না সুমন। কিছুটা চাপা স্বভাবের ছিল সে। বেশ কিছুদিন ধরে ফোন এলেই দূরে সরে গিয়ে কথা বলত। কথা শেষে মন খারাপ করে থাকত।

আত্মহত্যার বিষয়টি মানতে না পারার কথা জানিয়ে কাজী দ্রাকসিন্দা জেবিন আরো বলেন, আমাদের পারিবারিক জীবনে এমন কোনো অশান্তি ছিল না, যার কারণে সে আত্মহত্যা করবে। এগুলোকে ষড়যন্ত্র উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঘটনা যাই হোক সুমন জাহিদের মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে চাই আমরা। গত ১৪ জুন বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর দক্ষিণ খিলগাঁও বাগিচা এলাকায় ৭৬নং জান্নাতুল নাঈম মহিলা মাদ্রাসার সামনে রেললাইনের পাশে শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় সুমন জাহিদের খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করে পুুলিশ। পরে এ ঘটনায় কমলাপুর পিআরপি থানায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করে। মামলা তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে কমলাপুর জিআরপি থানার ওসি ইয়াসিন মজুমদার ভোরের কাগজকে বলেন, এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। আমরা কয়েকটি বিষয়কে সামনে নিয়ে ঘটনার তদন্ত করছি। প্রথমত, তার পারিবারিক বিষয়। দ্বিতীয়ত, তিনি যেহেতু যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়েছিলেন, সে কারণে তার প্রতি কোনো হুমকি ছিল কি না? তৃতীয়ত, তিনি যে ব্যাংকে চাকরি করতেন সেখান থেকে চাকরি ছেড়ে দেয়া বা চলে যাওয়ার বিষয় নিয়ে আমাদের তদন্ত চলছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে ওসি ইয়াসিন মজুমদার বলেন, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী চা-বিক্রেতা শিশু নাদিয়ার (৯) বক্তব্য, সুমন জাহিদ নিজেই ট্রেনের নিচে পড়ে আত্মহত্যা করেছেন। নাদিয়া বলেছে, লোকটি ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দেয়ার পর সে (নাদিয়া) তার পা ধরে টানাটানি করেছে। তখন সুমন জাহিদ নাদিয়াকে লাথি দিয়ে সরিয়ে দিয়েছে। এরপর কমলাপুর স্টেশন থেকে ছেড়ে আসা তিতাস ট্রেন তার ঘাড়ের ওপর দিয়ে চলে যায়। কিন্তু আমরা ময়নাতদন্তের রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত সুমন জাহিদের মৃত্যু নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।

এদিকে গত ২১ জুন বৃহস্পতিবার সরেজমিন গিয়ে ঘটনাস্থলে রক্ত পচা গন্ধ পাওয়া যায়। দক্ষিণ খিলগাঁও বাগিচা এলাকায় রেললাইন লাগোয়া প্রত্যক্ষদর্শী শিশু নাদিয়ার মা নয়নের ছাপড়ার চায়ের দোকানটি বন্ধ রয়েছে। ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি জামালপুরে যাওয়ার পর এখনো ফিরে আসেনি। ঘটনাস্থলের বিপরীতে ১০০ গজ ভেতরে ৭৬নং দক্ষিণ খিলগাঁও গলির টিনশেড যে বাড়িতে নাদিয়ারা থাকে সে ঘরটিতে তালা দেয়া রয়েছে। ওই বাড়ির ভাড়াটিয়া আনোয়ারা বেগম, ফিরোজা বেগম ও আরিফ প্রত্যক্ষদর্শী নাদিয়ার বরাত দিয়ে ভোরের কাগজকে বলেন, ঘটনার দিন সকাল ৮টার দিকে চা-দোকানি নয়নের শিশুকন্যা নাদিয়া (৯), পাশের বাসার চৈতি (৮) ও নিলুফা (৭) রাস্তায় খেলা করছিল। ওই লোকটি দোকান থেকে চা পান করার পর দোকানের পেছনে রেললাইনের ওপর বসেছিল।

কমলাপুর থেকে ছেড়ে আসা একটি ট্রেন কাছাকাছি এলে লোকটি মাথা নিচের দিকে দিয়ে ট্রেন লাইনের ওপর শুয়ে পড়ে। তার ঘাড় থেকে দেহের নিচের অংশ রেললাইনের বাহির দিকে ছিল। তখন নাদিয়া তার পা ধরে টানাটানি করে। কিন্তু লোকটি নাদিয়াকে লাথি মেরে সরিয়ে দেয়। এর পরই তার ঘাড়ের ওপর দিয়ে ট্রেন চলে যায়। নাদিয়া চিৎকার করে বাসায় দৌড়ে এসে সবাইকে জানায়। দ্রুত আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দ্বিখণ্ডিত লাশ পড়ে থাকতে দেখি।

এদিকে নাদিয়াকে না পাওয়া গেলেও শিশু চৈতি ও নিলুফাকে পাওয়া যায় ওই বাড়িতে গিয়ে। চৈতি বলে, আমি দূরে ছিলাম। নাদিয়াকে ওই লোকটির পা ধরে টানাটানি করতে দেখেছি। তারপর ট্রেন চলে আসে। আমি ভয় পেয়ে বাসায় চলে আসি। পাশের ঘরে পাওয়া যায় ৭ বছরের ছোট্ট নিলুফাকেও। ঘটনা জানতে চাইলে নিলুফা ভয়ে আঁতকে ওঠে এবং কেঁদে ফেলে। পাশ থেকে নিলুফার মা বলেন, ওর কতই বা বয়স, চোখের সামনে ওই বিভৎস ঘটনা দেখার পর থেকে মেয়েটির শরীরের জ্বর লেগেই আছে। খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। রাতে ঘুমের মধ্যে ‘ট্রেন আইলো, মানুষ কাটা পইড়্যা মরতাছে’ বলে চিৎকার করে ওঠে।

ব্যাংকের চাকরি ছাড়ার বিষয়ে স্ত্রী কাজী দ্রাকসিন্দা জেবিন বলেন, সুমন জাহিদ ফারমার্স ব্যাংকের শান্তিনগর শাখার সেকেন্ড অফিসার ছিল। ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না, সুমনকে ডিপোজিট আনতে অতিরিক্ত চাপ দেয়া হয় ব্যাংক থেকে, যা তার ইগোতে লাগে। এরপর গত ফেব্রুয়ারি মাসে সে চাকরিটি ছেড়ে দেয়। এরপর তার একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি হয়েছিল। গত ১৭ জুন সেখানে জয়েন করারও কথা ছিল। তার আগেই এ ঘটনা ঘটল।

এ বিষয়ে ফারমার্স ব্যাংকের এমডি এহসানুল হক খশরু ভোরের কাগজকে বলেন, গত ফেব্রুয়ারি মাসে হঠাৎ করেই উনি নিজে থেকেই রিজাইন লেটার দিয়ে চলে যান। স্টাফদের কেউ কেউ বলেছেন, অন্যত্র চাকরি হওয়ায় উনি চলে গেছেন কিন্তু এখন পর্যন্ত তার পদত্যাগ পত্রটি নিষ্পত্তি করিনি। আমরা অপেক্ষায় ছিলাম, তিনি হয়তো ফিরে আসবেন কিন্তু ডিপোজিট আনতে মানসিক চাপের বিষয়টি জানতে চাইলে এহসানুল হক খশরু বলেন, মাঝখানে আমাদের ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। ব্যাংকে চাকরি করলে সব কর্মকর্তাকেই ডিপোজিট আনতে হয়। তাকেও আনতে বলা হয়েছিল। ব্যাংকে কাজের চাপ থাকবেই। সারা বিশে^র ব্যাংক কর্মকর্তারা এই চাপ নিয়েই কাজ করে থাকেন।

কাজী দ্রাকসিন্দা জেবিন আরো বলেন, ব্যাংকের চাকরি ছাড়ার পর আর্থিক বিষয় নিয়ে সুমন দুশ্চিন্তায় ছিলেন। কারণ বসবাসের জন্য কেনা এই ফ্ল্যাটটির লোন এখনো শেষ হয়নি। এ ছাড়া বড় ছেলে শ্রয়ণ (১৯) মতিঝিল টিএন্ডটি কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষে আর ছোট ছেলে সুন্দন (১৩) খিলগাঁও ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। ওদের পড়াশোনার খরচও কম নয়। তিনি বলেন, সুমন জাহিদ সব সময় একটা চাপা কষ্ট বুকে বয়ে বেড়াতো- শহীদ বুদ্ধিজীবীর সন্তান হয়েও সরকারের কাছ থেকে কোনো রকম সহায়তা পায়নি। সুমন একটি ফ্ল্যাটের জন্য সরকারের কাছে আবেদনও করেছিল। প্রধানমন্ত্রীর সাবেক একান্ত সচিব মাহবুবুল হক শাকিল বিষয়টি নিয়ে কিছু দূর এগিয়েও ছিলেন কিন্তু তিনি মারা যাওয়ার পর আর কিছুই হয়নি। এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমার একটাই আবেদন, অর্থাভাবে যেন ওদের পড়াশোনা বন্ধ না হয়ে যায়। দুই ছেলেকে পড়াশোনা করিয়ে যাতে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারি সরকার যেন সেই ব্যবস্থাটুকু করে দেন। সূত্র: ভোরের কাগজ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত