প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

গডফাদাররা প্রকাশ্যেই ঘুরছেন, চলছে ইয়াবা বিক্রিও!

নিজস্ব প্রতিবেদক : চল যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে এই স্লোগান নিয়ে গত ১৩ মে থেকে সারা দেশে মাদক নির্মূলে বিশেষ অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অভিযানে এখন পর্যন্ত ২২ হাজার জন হয়েছে। র‌্যাব-পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে ১৫৩ জন। অভিযান এখনো চলছে। তবু থেমে নেই ফেনসিডিল, হেরোইন, ইয়াবাসহ সব ধরনের মাদকের চোরাচালান। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইয়াবার চালান ধরা পড়ছে।

এদিকে আজ ২৬ জুন মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস। এ উপলক্ষে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা নানা ধরনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। খবর দৈনিক আমাদের সময়’র।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইয়াবা চোরাচালানে তালিকাভুক্তদের একটি বড় অংশ এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। গ্রেপ্তার এড়াতে তারা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। আর যারা গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাদের বেশিরভাগই মাদক ব্যবসায় চুনোপুঁটি। কেউ কেউ মাদকসেবী। প্রকৃত গডফাদারদের বিরুদ্ধে ‘অ্যাকশনে’ না গিয়ে শুধু চুনোপুঁটিদের ধরলে মাদক বিকিকিনি কতটা নির্মূল হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, আমাদের কাছে যে তালিকা আছে এবং যার বিরুদ্ধে প্রমাণ আছে, তাদেরই গ্রেপ্তার করছি। কে চুনোপুঁটি আর কে রাঘববোয়াল, সেটা বিবেচ্য নয়। যার বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণ আছে, তার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে মাদক কারবারি গডফাদারদের তালিকায় সবার ওপরে কক্সবাজার-৪ আসনের (টেকনাফ-উখিয়া) এমপি আবদুর রহমান বদির নাম। এর পর তার পাঁচ ভাই ও টেকনাফ উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমেদ এবং তার ছেলেরা এই ব্যবসা করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন বলে অভিযোগ। কক্সবাজার-টেকনাফের ঘরে ঘরে ইয়াবার গডফাদার ও পৃষ্ঠপোষক তারা। কিন্তু এসব গডফাদাররা প্রকাশ্যেই ঘুরছেন। টেকনাফ-কক্সবাজারে মাদকবিরোধী অপারেশন আগে শুরু না করায় অনেকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। মাদকের সঙ্গে অবৈধ অস্ত্র, সন্ত্রাসী কার্যক্রম, অর্থ পাচারও যুক্ত। এর পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট।

এ প্রসঙ্গে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বন্দুকযুদ্ধ করে তো মাদক নির্মূল করা যাবে না। যারা এর হোতা, যারা লগ্নি করছে, তাদের কিন্তু এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করতে দেখিনি। যারা বড় বড় মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত, পুলিশের নিশ্চয়ই তাদের সম্পর্কে জানা আছে। বিভিন্ন দেশ মাদক নির্মূলে হোতাদের বিরুদ্ধে সবার আগে আইনি ব্যবস্থা নেয়। আমাদের এখানে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের বেশিরভাগ গরিব মানুষ, যারা মাদক সরবরাহ করছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশে মাদকদ্রব্য মামলার বিচারে বিশেষ কোনো আদালত তৈরি হয়নি। গত দুই মাসে যে ২২ হাজার লোককে ধরা হয়েছে, তাদের ট্রায়াল কবে হবে? তাদের মধ্যে কতজন মাদক ব্যবসা করে, সাক্ষী এনে এগুলো কীভাবে প্রমাণ করা হবে?

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণকারীরা বলছেন, বাংলাদেশে মাদক আইনের গোড়ায় গলদ। অন্যান্য ফৌজদারি মামলায় কোনো একজনকে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে পুরো চক্রকে আইনের আওতায় আনা যায়। কিন্তু প্রায় ২০ বছর ধরে প্রচলিত ইয়াবার অপরাধ বা শাস্তি নিয়ে বাংলাদেশে কোনো আইনই নেই। এত বছর পর ইয়াবা বা অ্যাম্পিটামিন নিয়ে আইনের খসড়া ঝুলে আছে। অন্যান্য আইনে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান থাকলেও শাস্তি নগণ্য। অথচ এশিয়ার দেশ সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়ায় মাদক বহনকারী ও সেবনকারী উভয়ের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

জানা গেছে, মাদকের বিরুদ্ধে অপারেশনের পর স্থলপথের পরিবর্তে মিয়ানমার থেকে সমুদ্রপথেই আসছে ইয়াবার চালান। এতে চিহ্নিত বা আড়ালে থাকা গডফাদারদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্য পৃষ্ঠপোষকতা করছেন।পোশাকের আড়ালে তারা সবসময় থাকছেন অন্তরালে। সে কারণে ইয়াবা নির্মূল হচ্ছে না। অপারেশনের মধ্যেও ইয়াবা ট্যাবলেট মিলছে।

ধুঁকছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

দেশে অবৈধ মাদকদ্রব্য নির্মূল এবং বৈধ মাদকদ্রব্য সেবন বা বিক্রির লাইসেন্স দেয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। অথচ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তরটি মুমূর্ষু অবস্থায় রয়েছে। চোরাকারবারি ও বাহকরা প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাদক পাচার করছে। কিন্তু অ্যানালগ পদ্ধতিতে বা শুধু সোর্সের তথ্যনির্ভর হয়ে কাজ করছে সরকারি এ সংস্থাটি। অনেক সময় সোর্সের তথ্য পেয়ে অভিযান পরিচালনা করলে অপরাধীরা টের পেয়ে আগেই পালিয়ে যায়।

এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক নজরুল ইসলাম সিকদার বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে অপারেশনের পর পরিচিত ব্যবসায়ীদের অনেকে পলাতক। তবে আমরা নজরদারির চেষ্টা করছি। নতুন করে মাদক আইন প্রণয়নের অপেক্ষায় আছে। মাদক আইনে আমরা অর্থপাচারের তদন্ত করতে পারব। এতে মাদক বেচে কে কত সম্পদ গড়েছে, সেটা বের করা সহজ হবে। গডফাদাররা আইনের আওতায় আসবে।

জানা গেছে, রাজধানীতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ১৪টি সার্কেল রয়েছে। একেকটি সার্কেলে মাত্র ৬ জন সদস্য নিয়ে চলছে মাদক নির্মূল ও তদন্ত কার্যক্রম। এতগুলো সার্কেলের জন্য একটি পিকআপ ও একটি মাইক্রোবাস রয়েছে। জেলাগুলোয়ও একই অবস্থা। একটি করে গাড়ি আছে মাত্র ১৫-২০টি জেলায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে অবহেলিত এই দপ্তরটি যুগ যুগ ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত