প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সবার চোখ গাজীপুরে

গাজীপুর প্রতিনিধি: রাজনীতিক, কূটনীতিক, সুশীল সমাজসহ দেশের সাধারণ মানুষের চোখ আজ রাজধানীলাগোয়া শহর গাজীপুরে। নতুন সৃষ্ট গাজীপুর সিটি করপোরেশনের দ্বিতীয় নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হচ্ছে আজ।এ নগরীর নির্বাচন নিয়ে শুরু থেকেই সরগরম রাজনীতি।

আদালতের নির্দেশে প্রথমবারের তফসিল স্থগিত হওয়ার পর নানামুখী আলোচনার ঝড় বয়ে যায়। এরই মধ্যে আদালতের নির্দেশেই বেজে ওঠে নির্বাচনী ডামাডোল। শুরু হয়ে যায় পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল হইচই। প্রশ্ন হলো স্থানীয় সরকারের একটি নির্বাচন কেন জাতীয় রাজনীতিতে এতটা তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠল।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের বড় দুটি দলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ এ নির্বাচন। এমনকি নির্বাচন কমিশনও পরীক্ষার মুখোমুখি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ শুরু থেকেই বলে আসছে জনপ্রিয়তা যাচাইয়ে তারা জয় ধরে রাখতে চায়। বিপরীতে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দেশের অন্যতম বড় দল বিএনপি এ নির্বাচনের ফল তাদের ঘরে এনে জনমত তাদের পক্ষে রয়েছে বলে প্রমাণ করতে মরিয়া। দেশের সুশীল সমাজও চায় জাতীয় নির্বাচনের এ বছরে সুষ্ঠু একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন তাদের নিরপেক্ষতা প্রমাণের সুযোগ তৈরি করুক।

এমন প্রেক্ষাপটে কূটনীতিকরাও এ নির্বাচনে তীক্ষ দৃষ্টি রেখেছেন। তারা মনে করছেন নির্বাচন দেশের রাজনীতিতে সৃষ্ট সংকট নিরসনে সফল প্রভাব ফেলবে। দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করা বিএনপি সদ্য অনুষ্ঠিত খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর সরকার, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তোলে। এ নির্বাচন নিয়েও তারা বিভিন্ন সময় অনিয়মের অভিযোগ এনেছে।

আওয়ামী লীগ নেতারা অবশ্য বরাবরই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন বরাবরের মতোই আজকের নির্বাচনও সুষ্ঠু হবে। এসব কাদা ছোড়াছুড়ির মাঠে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থীরা নিজ নিজ জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। এখন দেখার বিষয় গাজীপুরের মানুষ আজ কাকে বেছে নেবেন তাদের নগরপিতা হিসেবে। কার জন্য অপেক্ষা করছে নগরভবনের সেই চেয়ার।

জাতীয় নির্বাচনের বছরে রাজধানীর সবচেয়ে কাছের সিটি গাজীপুরে আজ ভোটগ্রহণ। প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এ সিটিতে জিততে মরিয়া ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করা বিএনপি। যদিও নির্বাচনী এজেন্টদের হয়রানি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ করে বিএনপির মেয়রপ্রার্থী বলছেন, ভোট সুষ্ঠু হলে ধানের শীষ জয়ী হবে। নৌকা প্রতীক নিয়ে লড়াই করা মেয়রপ্রার্থীও জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী।

আজ মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোটগ্রহণ চলবে। সিটি করপোরেশনের ৫৭টি ওয়ার্ডে ৪২৫ কেন্দ্রের মধ্যে ৩৩৭টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ, শতকরা হিসাবে প্রায় ৮০ শতাংশ। মোট ভোটার সংখ্যা ১১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৩৬। মেয়রপদে লড়ছেন সাতজন।

নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুসারে গাজীপুর ও খুলনা সিটিতে ভোটগ্রহণের কথা ছিল গত ১৫ মে। সীমানা জটিলতা নিয়ে রিটের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত গাজীপুর সিটির ভোটগ্রহণ স্থগিত করেন। পরে শুনানি নিয়ে আপিল বিভাগ নির্বাচন করার নির্দেশনা দিলে ২৬ জুন ভোটগ্রহণের দিন ধার্য করে ইসি। ১৫ জুন থেকে দ্বিতীয় দফায় শুরু হয় প্রচার।

দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত ভোটে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মেয়রপদে মনোনয়ন দেওয়া হয় গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমকে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন গত সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী ও গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লাহ খানের সমর্থকরা। স্থানীয় আওয়ামী লীগের মধ্যে এ নিয়ে বিভেদ দেখা দিলে কেন্দ্র থেকে নৌকা জেতাতে সবাইকে একত্রিত হয়ে কাজ করার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। শেষ মুহূর্তে স্থানীয় নেতাদের একত্রে প্রচার দেখা গেলেও বিভেদ মেটেনি বলে গুঞ্জন রয়েছে।

অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয় সাবেক সাংসদ ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হাসানউদ্দিন সরকারকে।

প্রচার শুরুর পর থেকেই দুদলের প্রার্থীরা একে অপরের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘন ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ করে বক্তব্য দিয়ে আসছেন। দুদলের কেন্দ্রীয় নেতাদেরও এ নির্বাচন নিয়ে বিতর্কে জড়াতে দেখা গেছে। জুলাইয়ে তিন সিটি ও বছরের শেষে জাতীয় নির্বাচনের আগে এটিকে অ্যাসিড টেস্ট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। গাজীপুর সিটিতে ভোট কারচুপি হলে বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেট সিটি নির্বাচন নিয়ে ‘সিদ্ধান্ত’ নেওয়ার হুশিয়ারি দিয়েছে বিএনপি। তাই এ সিটির ভোট জাতীয় নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণে প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন অনেকে।

নির্বাচনে সব দলের জন্য সমান সুযোগ নেই দাবি করে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী হাসানউদ্দিন সরকার বলেছেন, আমরা শঙ্কিত। বেশ কিছু দিন ধরে বিএনপির এজেন্ট ও নেতাকর্মীদের বাড়িতে পুলিশ হানা দিচ্ছে। নেতাকর্মীরা রাতে বাড়িতে ঘুমাতে পারছেন না। সব কেন্দ্রে ধানের শীষের নির্বাচনী এজেন্ট দেওয়া চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দলীয় কর্মী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে ভোট জালিয়াতির আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারাও একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে আসছেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দুই দফা অভিযোগের কথা জানান এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিতের অনুরোধ করেন। একই সঙ্গে গাজীপুরের পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদকে প্রত্যাহারেরও দাবি জানান দুবার।

অন্যদিকে খুলনা সিটি করপোরেশনের রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়ে আওয়ামী লীগের অভিযোগ থাকলেও গাজীপুরে তেমন কোনো অভিযোগ নেই। বিদ্যমান নির্বাচন কর্মকর্তা ও প্রশাসনের অধীনে সুষ্ঠু ভোটগ্রহণে আশাবাদী তারা। নির্বাচনের আগের দিন গতকাল আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দল সিইসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এমন কথাই বলেছেন।

গাজীপুর সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠানে সব প্রস্তুতি নিয়েছে ইসি। গতকাল বিকালে সব কেন্দ্রে ব্যালট বাক্সসহ নির্বাচনী সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তায় ১২ হাজার আনসার ও পুলিশ বাহিনী মোতায়েন ছাড়াও সড়কে সড়কে টহল জোরদারের লক্ষ্যে বিজিবির ২৯ প্লাটুন সদস্য কাজ করছে। বিজিবির সাত প্লাটুন কোনাবাড়ি ও কাশিমপুর এলাকায়, ১০ প্লাটুন টঙ্গী এলাকায় এবং ১২ প্লাটুন জয়দেবপুর, বাসন চান্দনা চৌরাস্তা ও কাউলতিয়া এলাকায় দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া পুলিশ, এপিবিএন ও ব্যাটালিয়ন আনসার সমন্বয়ে ৫৭টি ওয়ার্ডে ৫৮টি মোবাইল ফোর্স, ২০টি স্ট্রাইকিং ফোর্স নিয়োজিত থাকছে। আচরণবিধি প্রতিপালন ও সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ তদারকিতে নির্বাচনের আগে ও পরে চার দিন ৫৭টি ওয়ার্ডে একজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত থাকবেন। এ ছাড়া ১৯ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত থাকবেন। ২৪ জুন থেকে ২৭ জুন পর্যন্ত তারা নগরীতে দায়িত্ব পালন করবেন। নির্বাচনী এলাকায় র্যাবের ৬০০ সদস্য ৫৭টি টিমে ভাগ হয়ে কাজ শুরু করেছে।

ছয় কেন্দ্রে ইভিএম : খুলনায় দুটি কেন্দ্রে সফলতার পর গাজীপুর সিটি নির্বাচনে ছয়টি কেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। কেন্দ্রগুলো হলোÑ চাপুলিয়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (ভোটার ২৪৮০), চাপুলিয়া মফিজউদ্দিন খান উচ্চ বিদ্যালয় (ভোটার ২৫৫২), পশ্চিম জয়দেবপুরের মারিয়ালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র-১ (ভোটার ২৫৬২), মারিয়ালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র-২ (ভোটার ২৮২৭), রানী বিলাসমণি সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্র-১ (ভোটার-১৯২৭) এবং রানী বিলাসমণি সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্র-২ (ভোটার-২০৭৭)।

প্রধান দুই মেয়রপ্রার্থীর ভোট প্রদান : আওয়ামী লীগ প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম তার নিজ এলাকা কানাইয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং বিএনপি প্রার্থী হাসানউদ্দিন সরকার টঙ্গীর আউচপাড়া এলাকার বসিরউদ্দিন উদয়ন একাডেমি কেন্দ্রে ভোট দেবেন বলে জানা গেছে।

ভোটগ্রহণের আগের দিন সকাল থেকে নগরীতে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হয়েছে। এমনিতে সামান্য বৃষ্টিতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। নগরীর চান্দনা চৌরাস্তা, ভোগড়া বাইপাস, বোর্ডবাজার, চেরাগআলী, কলেজগেট ও স্টেশন রোডে পানি জমে যায়। ভোটের দিন বৃষ্টিপাত থাকলে হাঁটুজল মাড়িয়ে অনেকে ভোট দিতে নাও আসতে পারেন বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন প্রার্থীরা।

তবে বৃষ্টি হলে দুয়েকটি কেন্দ্রে সমস্যা হতে পারে উল্লেখ করে নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা রকিব উদ্দিন ম-ল বলছেন, বেশিরভাগ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক হওয়ায় তেমন ভোগান্তি হবে না। সবাইকে ভোট দিতে আসার আহ্বান জানান তিনি।

সিটি করপোরেশনের ৪২৫ কেন্দ্রের মধ্যে ৩৩৭টি গুরুত্বপূর্ণ এবং ৮৮টি সাধারণ কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে পুলিশ, আনসার-ভিডিপিসহ ২৪ (১২ জন অস্ত্রধারী) সদস্য মোতায়েন থাকবে। সাধারণ কেন্দ্রে ২২ (১০ জন অস্ত্রধারীসহ) সদস্য মোতায়েন থাকবে।

এ নির্বাচনে সাত মেয়রপ্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন বিএনপির হাসানউদ্দিন সরকার (ধানের শীষ), আওয়ামী লীগের মো. জাহাঙ্গীর আলম (নৌকা), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কাজী মো. রুহুল আমীন (কাঁস্তে), ইসলামী ঐক্যজোটের মাওলানা ফজলুর রহমান (মিনার), ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশের অ্যাডভোকেট জালাল উদ্দিন (মোমবাতি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. নাসির উদ্দিন (হাতপাখা) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ফরিদ আহমেদ (টেবিল ঘড়ি)। ৫৭টি ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর পদে ২৫৪ ও সংরক্ষিত নারী ৮৪ কাউন্সিলর প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

সূত্র: দৈনিক আমাদেরসময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত