প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এলপিজি ষ্টেশনই দূর করবে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কষ্ট!

সুজন কৈরী : অবশেষে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কেরানীগঞ্জে লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ষ্টেশন স্থাপন করছে সরকার। বর্তমানে দেশের সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে বেশী পরিমাণ আটক বন্দির এই কারাগারটিতে কোন প্রকার গ্যাস সংযোগ নেই। কারাগারে আটক প্রায় ৮ হাজার বন্দি ও উক্ত এলাকায় কারা কর্মচারী কোয়ার্টার ও অফিসার্সদের বাসায় বসবাসরত আরো এক হাজার লোকের দৈনন্দিন রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাহিদা মেটাতে কেরাণীগঞ্জ কারা কমপ্লেক্সের সীমানায় এই গ্যাস স্টেশনটি স্থাপন করা হবে। বন্দী দুর্দশা লাঘবে ও পরিবেশ দূষণ তথা সরকারের খরচ কমাতেই এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে কারা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে।

কারাসূত্র জানায়, গ্যাস স্টেশন স্থাপনে কারা বিভাগ ও বেসরকারী নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এতে কারা অধিদপ্তরের পক্ষে সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (এআইজি-উন্নয়ন) মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন ও নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ওমেরা গ্যাস ওয়ান লিমিটেড কোম্পানির পক্ষে সিইও তসিউকি শিমবরি স্বাক্ষর করেন।

কারা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের ১০ এপ্রিল কেরানীগঞ্জে অবস্থিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করেন। নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কিছুটা ঘাটতিসহ বেশ কিছু সমস্যার কারণে প্রায় সাড়ে তিনমাস পর একই বছরের ২৯ জুলাই কারাগারটিতে প্রায় আট হাজার বন্দিকে স্থানান্তর করা হয়। কারাগারটি স্থানান্তরের পর শুধুমাত্র গ্যাস সংযোগ স্থাপন করতে না পারায় সময়মতো খাবার পরিবেশনে প্রকট সমস্যায় পরে কারা কর্তৃপক্ষ। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য কারা কর্তৃপক্ষ রান্নার জন্য গ্যাসের পরিবর্তে কাঠের ব্যবহার শুরু করে। এই সমস্যার সাময়িক সমাধান হলেও একপর্যায়ে দৈনন্দিন রান্নার জন্য বিশাল অর্থের অপচয় হতে থাকে।

কারাসূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৮ হাজার বন্দিকে দুপুরে ও রাতে দুই বেলা খাবার রান্না করা ও সকাল বেলার জন্য ১৬ হাজার রুটি তৈরী করতে হয়। সেইসঙ্গে গ্যাস সংকটের কারণে কারা কমপ্লেক্সে অবস্থানকারী ১ হাজারের বেশী কারা কর্মকর্তা কর্মচারীদেরকেও নিয়মিতভাবে খাবার রান্নায় ব্যাপক সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। যার প্রভাব নিরবিচ্ছিন্ন দায়িত্ব পালনেও সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। গ্যাস সংযোগ না থাকায় দৈনিক তিন বেলা বন্দিদের জন্য কাঠ দিয়ে রান্না করা একপর্যায়ে কঠিন হয়ে পড়ে।

সূত্র জানায়, সরকারের বন পরিবেশ ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের রান্না বা যে কোন কাজে ও পরিবেশ দূষণ রোধে কাঠ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এছাড়া সরকার কর্তৃক গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় অনেকটা বাধ্য হয়ে কারা কর্তৃপক্ষ বন্দির খাবার লাকড়ি দিয়ে রান্না করছে। এর ফলে কারাগারসহ আশপাশের পরিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাব পরছে। যা স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য অনেকটা হুমকি স্বরুপ। শুধুমাত্র বন্দিদের ভাত তরকারী রান্না ও রুটি তৈরীর জন্য মোট ৫ শতাধিক হাড়িতে দৈনিক প্রায় ৬ হাজার মণ কাঠের লাকড়ির প্রয়োজন হয়। যা কারা কর্তৃপক্ষের পক্ষে নিয়মিত সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এছাড়া বন্দিদের রান্নার কাজে কারাভ্যন্তরে বিপুল পরিমান কাঠের লাকড়ি মজুদ রাখতে হয়, যা লাঠি হিসেবে ব্যবহার করে কারাগারে বিশৃংখলা সৃষ্টির মাধ্যমে কারাগারের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া আবহাওয়া প্রতিকূল থাকলে বন্দিদের রান্নায় সময় ক্ষেপণ হয় ও যথাসময়ে রান্নার কাজ শেষ করতে না পারায় বন্দিদের খাদ্য সরবরাহে বাধার সৃষ্টি হয়। এর ফলে বন্দিদের মাঝেও যেকোনো সময় অসন্তোষ সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। সেইসঙ্গে দৈনিক ৬ হাজার কেজি লাকড়ি পোড়ানোর কারণে কারাগারের আশেপাশের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।

কারাসূত্র জানায়, সরকার প্রাকৃতিক গ্যাস সংযোগ বন্ধ রাখায় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিকল্প পথ হিসেবে পুরাণ ঢাকার নাজিমউদ্দীন রোডের পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রদানকৃত পুরনো ৫৬টি বানিজ্যিক বার্নারের গ্যাস লাইন সংযোগ স্থানান্তরের জন্য সরকারকে লিখিত অনুরোধ করে কারা কর্তৃপক্ষ। ওই চিঠির প্রেক্ষিতে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের জরিপ অনুযায়ী দেখা যায়, কারা কমপ্লেক্সের প্রায় ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার এলাকায় তিতাস গ্যাস সংযোগ বিদ্যমান রয়েছে। এ অবস্থায় এতদূর থেকে গ্যাস সংযোগ দেয়া অনেক কঠিন ও ব্যয়বহুল। পরে সরকারের জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রনালয় কর্তৃক কারা কর্তৃপক্ষকে দেয়া চিঠিতে কারাগারটিকে গ্যাস সংযোগ দেয়া সম্ভব নয় বলে জানানো হয়। এরপর জরুরি চাহিদার কথা বিবেচনা করে কারাগার নির্মাণ প্রকল্পের নিজস্ব অর্থায়নে কারা কমপ্লেক্সে বর্তমান চাহিদা ও নির্মাণাধীন বিভিন্ন কারাগার ও কারা প্রশিক্ষণ একাডেমি, ২৫০ শয্যার কারা বিশেষায়িত হাসপাতালের চাহিদা বিবেচনায় অতি দ্রুত একটি লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) স্টেশন নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

সূত্র জানায়, এলপিজি ষ্টেশনটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়, প্রায় ৯ কোটি ১৮ লাখ ৭৩ হাজার ৩৩৩ টাকা। আগামী ৯ মাসের মধ্যে এই স্টেশনটি নির্মাণ করা হবে। নির্মাণের সার্বিক বিষয় পর্যবেক্ষণের জন্য কারাগারের একজনসহ মোট ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। তাদেরকে স্পেনে এ ধরনের প্লান্ট পরিদর্শন ও শিক্ষা সফরে পাঠানো হবে বলে জানা গেছে। নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান প্লান্টের ওয়ারেন্টি সেবা প্রদান করবে। সেইসঙ্গে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান আগামী ১০ বছর নির্দিষ্ট মূল্যে নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ করবে বলে চুক্তি করে। এই এলপিজি গ্যাস স্টেশনটি নির্মাণের মাধ্যমে রান্নার কষ্ট অনেকটা লাগব হবে।

এ বিষয়ে কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন বলেন, গ্যাস সংযোগ না থাকায় শুধুমাত্র রান্নার জন্য প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার কেজি কাঠের লাকড়ি পোড়াতে হয়। যা কারাগার ও আশেপাশের পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। প্রায় ৮ হাজার বন্দির জন্যই দৈনিক ৫ শতাধিক হাড়িতে দৈনিক এক বেলায় ১৬ হাজার রুটি তৈরী ও দুই বেলায় ভাত-তরকারি রান্না করতে হয়। গ্যাসের ব্যবহার না থাকায় সময়মতো বন্দিদের গরম খাবার পরিবেশন সম্ভব হয়না। পাশপাশি লাকড়ি যোগাড় করাও অনেকটা কঠিন ও ব্যায়সাধ্য। আবহাওয়া প্রতিকূল না থাকলে অনেক সময় ঠিকমতো বন্দির খাবার তৈরী করাও কঠিন হয়ে পরে। এতে কখনো কখনো বন্দিদের মাঝে কিছুটা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। রান্নার জন্য ব্যবহৃত লাকড়ি দিয়ে কারাভ্যন্তরে যে কোন সময় নিরাপত্তা বিঘ্নেরও সম্ভাবনা থাকে। সরকারের নতুন গ্যাস সংযোগ প্রদান বন্ধ থাকায় ও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকার কেরাণীগঞ্জ কারা কমপ্লেক্সে একটি লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস স্টেশন স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আশা করি এটি স্থাপনের পর কারাভ্যন্তরে ও প্রায় ১ হাজার কারা কর্মকর্তা কর্মচারীদের আবাসস্থলে রান্নার বর্তমান সংকট দূর হবে।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত