প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মানুষের উপলব্ধি ও শেষ বিচারের কাঠগড়া

অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার: পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, ছাত্রলীগ নেতা পুলিশকে পিটিয়েছে। তখন পুলিশ নির্বাক, কারণ যে পিটিয়েছে সে সরকারি দলের লোক বা তার অভিবাবক সরকারি দলের কর্মকর্তা। অথচ কোনো ঘটনাই ঘটেনি এমন কাল্পনিক ঘটনা সাজিয়ে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের অহরহ গ্রেপ্তার করছে। যেখানে রিমান্ড দেওয়া যুক্তিসংগত নয়, তারপরও নিজ বিবেককে মাটি দিয়ে দাড়িপাল্লা (ন্যায় বিচার) খচিত চেয়ারে বসে ম্যাজিস্ট্রেট রিমান্ড মঞ্জুর করে পুলিশকে রিমান্ড বাণিজ্য (পত্রিকার ভাষায়) করার সুযোগ করে দিচ্ছে। তারপর জজ কোর্ট এখন রাজনৈতিক মামলায় ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের মতোই আচরণ করে। হাইকোর্ট জামিনের আদেশে জেল থেকে বের হওয়ার সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন তখন সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপারের আদেশে এজাহারে নাম না থাকা মামলায় জেল গেইট থেকে পুনঃপুন বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার করছে, এ যেন এক রাম রাজত্ব। এ রাম রাজত্বে নতুন ইভেন্ট যোগ হয়েছে, রিমান্ডে থাকাবস্থায় ক্রস ফায়ারের ভয় দেখিয়ে পরিবারদের নিকট থেকে চাহিদা মতো টাকা আদায়। রিমান্ড ও ক্রস ফায়ার বাণিজ্য থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য (যারা টার্গেট) অনেকেই পালিয়ে বেড়াচ্ছে, এলাকা ছেড়ে ঢাকা চলে এসেছে, অনেকে আবার বিদেশেও পাড়ি দিয়েছে। বাণিজ্যের প্রশ্নে রিমান্ড ও ক্রসফায়ার এখন হট কেক।

হাইকোর্ট জামিন দেওয়ার পর পুলিশ জেল গেইট থেকে গ্রেপ্তরের প্রবণতা পূর্বেও ছিল, যা খুবই কদাচিৎ দেখা যেত। ১/১১ এর অবৈধ সরকারের সময় এর প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করে যা এখন মহামারী আকার ধারণ করেছে। আইন অপপ্রয়োগ করে কৌশলে বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য জেল গেইটে গ্রেফতার বর্বরতার একটি বহিঃপ্রকাশ। সরকার নির্দেশিত পুলিশের এ বর্বরতাকে রোধ করার জন্য মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে জেল গেইট থেকে বারবার গ্রেপ্তার করায় জেল গেইটে গ্রেপ্তার নিষেধ করে নিম্ন বর্ণিত দিক নির্দেশনা প্রদান করেন। দিক নির্দেশনায় অ্যাপিলেট ডিভিশন বলেন যে, “ডব ফরৎবপঃ ঃযধঃ ঃযব ৎবংঢ়ড়হফবহঃ গধযসঁফঁৎ জধযসধহ ংযড়ঁষফ হড়ঃ নব ংযড়হি ধৎৎবংঃবফ রহ পড়হহবপঃরড়হ রিঃয ধহু ড়ঃযবৎ পধংব ঁহষবংং ঃযবৎব রং ঃৎঁব পড়সঢ়ষধরংধহপব ড়ভ ংবপঃরড়হ ১৬৭ ড়ভ ঃযব ঈড়ফব ড়ভ ঈৎরসরহধষ চৎড়পবফঁৎব. ঊাবহ যব ংযড়ঁষফ হড়ঃ নব ধৎৎবংঃবফ ধঃ ঃযব ঔধরষ মধঃব ধভঃবৎ যব রং ৎবষবধংবফ ভৎড়স ঃযব পঁংঃড়ফু যিরপয রং হড়ঃ ঢ়বৎসরংংরনষব রহ ষধ.ি” [সূত্র: ৬৮ ডি.এল.আর (এ.ডি) (২০১৬)(৩৭৩)]

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচেছদ-১১১ এ বলা হয়েছে যে, ‘আপিল বিভাগ কর্তৃক ঘোষিত আইন হাই কোর্ট বিভাগের জন্য এবং সুপ্রিম কোর্টের যেকোনো বিভাগ কর্তৃক ঘোষিত আইন অধস্তন সকল আদালতের জন্য অবশ্যপালনীয় হইবে।’ অর্থাৎ সংবিধান মোতাবেক সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক আইন সংক্রান্ত প্রদত্ব দিকনির্দেশনা দেশের সকল আদালতের উপর প্রযোজ্য। অ্যাপিলেট ডিভিশনের জেল গেইটে গ্রেপ্তার সংক্রান্ত দিকনির্দেশনাকে অমান্য করে জামিন হওয়ার পর পুলিশ জেল গেইটে গ্রেপ্তার করছে ম্যাজিস্টেটদের সহযোগিতায়। পুলিশ তো বটেই, বর্তমানে ম্যাজিস্ট্রেটরাও সুপ্রিম কোর্টের দিক নির্দেশনা মানছে না।

রাজনীতিতে পতিতাদের প্রভাব পূর্বেও ছিল বর্তমানেও আছে। ইতিহাসবিদ গোলাম আহাম্মদ মোর্তজা প্রণীত ‘বজ্রকলম’ (পৃষ্ঠা-১৬৫/১৬৬) বইতে বৃটিশ আমলে রাজনীতিতে পতিতাদের সংশ্লিষ্টতার একটি চিত্র তুলে ধরে লিখেন যে, ‘ঐ সমস্ত রাজা মহারাজা বাবু ও জমিদার ধনীরা প্রকাশ্যে বেশ্যাখানা যেতে দ্বিধাবোধ তো করতেনই না, বরং প্রতিযোগিতা করে বাহাদুরি দেখাতেন তারা। সেই সময় নাচে-গানে পটু বেশ্যাদের একটা সম্মানীয় নাম ছিল ‘বাঈজী’। ঐ সুন্দরী বেশ্যা-বাঈজীর মধ্যে যারা ছিল খুব খ্যাতনামা তাদের নাম নিকি, সুপন, বকনাপিয়ারী, হিঙ্গুল প্রভৃতি। ওই বাবু ও জমিদারেরা এদের ভাড়া করে আনতেন। নাচ, গান, বাজনা আর খাওয়া দাওয়ার সঙ্গে বাজী পোড়ানো এবং আরও কুৎসিত আমোদ প্রমোদের উৎসব চলত ঢালাওভাবে। বাড়ির এই উৎসবে ইংরেজ মনিবদের নেমতন্ন করা হোত।’

‘বিবেকই’ মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সঙ্গে তফাতের প্রধান মাপকাঠি। পতিতা যখন দেহ বিক্রি করে তখন কলঙ্কিত হয় একজন নারী। অন্যদিকে দায়িত্ব প্রাপ্তরা যখন ‘বিবেক’ বিক্রি করে তখন বিপর্যস্থ হয় গোটা জাতি যার প্রধান শিকার হয় সমাজের শান্তিপ্রিয় নিরীহ মানুষ। তোষামোদীতে কে কার চেয়ে এগিয়ে তা নির্ধারণের জন্য ‘বিবেক’ বিক্রির প্রতিযোগিতা চলছে, যা এখন মাহামারী থেকে বর্বরতায় পরিণত হয়েছে।

পবিত্র কোরান এ আল্লাহপাক বলেন, ‘সাবধান! সে যদি সত্য বিরোধীতা থেকে বিরত না হয়, তবে আমি এই মিথ্যাচারী পাপিষ্টের মাথার সামনের চুলের মুঠি ধরে টেনে হিঁচড়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করব। তবে সে সাহায্যের জন্য ডাকুক ওর সঙ্গীসাথীদের। আর আমি শুধু নির্দেশ দেব আজাবের ফেরেস্তাদের’ (সূরা-আলাক, আয়াত ১৫-১৮)। তফসীরকারকদের মতে, যেহেতু মানুষের মস্তিস্কে (মগজে) বিবেকের উৎপত্তি সেহেতু মাথার সামনের চুলের মুঠি ধরে টেনে হিঁচড়ে নেওয়ার কথা পবিত্র কোরান এ উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এটাই অনুমেয় যে, শেষ বিচারের দিনে বিচারের কাঠগড়ায় মানুষের বিবেককেই দাড় করানো হবে।
লেখক : আইনজীবী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা
ঃধরসঁৎধষধসশযধহফধশবৎ@মসধরষ.পড়স

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত