প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দৃশ্যত আ.লীগ একা, সর্বাত্মক চেষ্টা বিএনপির

দীপক চৌধুরী, গাজীপুর থেকে ফিরে: স্থানীয় সমস্যার চেয়ে জাতীয় বিষয়গুলোই বক্তৃতায় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। সিটি হলেও বিরোধী দলের সরকারবিরোধী প্রচারণা তুঙ্গে। দুজনেরই বক্তব্যেই প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা থাকে। কোণঠাসা করার প্রতিযোগিতা।

রাত পোহালেই ভোট। ভোটারদের আগ্রহও আশানুরূপ। তবে সাধারণ ভোটারদের সুষ্ঠু নির্বাচনি পরিবেশ কাম্য হলেও বক্তৃতা-বিবৃতি-আলোচনায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমকে দোষারোপ করার চেষ্টা রয়েছে বিএনপির, অন্যদিকে বিএনপি প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারকেও একই চেষ্টা স্থানীয় আওয়ামী লীগের। সিটি করপোরেশন এলাকায় নির্বাচনি কর্মকাÐ কেমন তা সরেজমিনে দেখা ও ভোটারদের চিন্তা-ভাবনা থেকে বুঝতে কষ্ট হয় না যে, ভোট লড়াইয়ে আওয়ামী লীগ ও এই দলের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের যেভাবে দেখা যায় সেভাবে এই জোটের অন্য দলের লোকদের দেখা যায়নি। ১৪ দলের প্রার্থী তিনি। জাতীয় পার্টিও প্রার্থী দেয়নি। তবু মনে হয় যেন, যেখানেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেখানে শুধুই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। অন্য দলের কেউ নেই, না তাদের নেতাকর্মী, না তাদের সক্রিয়তা। যেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী একা, আর অন্যদিকে সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন বিএনপির প্রার্থী।
সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে আওয়ামী লীগ জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি আজমত উল্লা খান। অবশ্য, হেফাজতকে কাছে পেয়ে নির্বাচনি প্রচারণায় বাড়তি সুযোগ পেয়েছে বিএনপি প্রার্থী। দেখা গেল, এবারো হেফাজত এখানে আলোচিত। প্রচারণার শেষ পর্যায়ে এসে বিএনপির প্রার্থীর অভিযোগ, প্রশাসনকে ব্যবহার করছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ প্রার্থীর অভিযোগ, নির্বাচনি সুষ্ঠু পরিবেশ নষ্ট করতেই বিএনপি উল্টাপাল্টা কথা বলছে।

ভোটারদের নির্বাচন আর বিশ^কাপÑ দুইয়ের উত্তাপে সিটি করপোরেশন নির্বাচন এখন বেশ গরম। দিনে নির্বাচনের প্রচার আর রাতে বিশ^কাপ খেলা উপভোগ করা। এই দুইয়ের মিলনে ভোটাররা খুশি।

সাধারণ মানুষ দুই প্রার্থীর বিষয়ে নানারকম মূল্যায়নও করছেন। বিএনপির এম এ মান্নান ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচনে পরাজয়ের পর রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। ২০১৩ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলের কেন্দ্রীয় নেতা হাসান উদ্দিন সরকার গাজীপুরের নেতা ফজলুর রহমানের কারণে তিনি জয়ী হলেও কোনো উন্নয়নমূলক কাজ করতে পারেননি। জেলেই কাটিয়েছেন পুরো পাঁচটি বছর। ফলে নিজ দলের স্থানীয় নেতাকর্মী কোনো সুবিধা পায়নি তার কাছ থেকে। অন্যদিকে, এবার এ নির্বাচনে হাসান উদ্দিন সরকার বিএনপির প্রার্থী। কিন্তু শারীরিক কারণে অনেক নেতাকর্মীর কাছে তিনি আগের মতো ‘ফিট’ ননÑ এটা স্থানীয়ভাবে দলের ভেতরেই আলোচিত হচ্ছে। দলীয় বিপুল সংখ্যক সমর্থকের কাছে এটাও একটি প্রশ্ন।

গাজীপুরের বাতাস বুঝতে কষ্ট হয় না। টঙ্গী পৌরসভায় আওয়ামী লীগ নেতা আজমত উল্লাহ্র ১৭ বছর টানা দায়িত্ব পালন করায় দলের শক্ত ঘাঁটি আরো পোক্ত হয়েছে। নির্বাচনে বর্তমান প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে দলীয় নেতাদের সক্রিয়তা মানুষকে যথেষ্ট উদ্বেলিত করেছে। আলোচনাকালে বুঝেছি, জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা বলার চেষ্টা করছেন, ১৯৮৬ সালে গাজীপুর পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর কখনোই জয় পায়নি বিএনপি। ২০১৩ সালে বিএনপি জয় পেলেও দলটি মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ করতে পারেনি। ভোটারদের আগ্রহ নষ্ট হয়েছে এতে।

কোর্টের পাশে দাঁড়িয়ে কথা হলো তছির উদ্দিন নামে স্থানীয় একজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘বেশির ভাগ ভোটারই ঠিক করে রেখেছেন কাকে ভোট দেওয়া দরকার। এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায়। তাই ভোট আওয়ামী লীগের প্রার্থীকেই দেওয়া দরকার।’

নির্বাচন সম্পর্কে জানতে চাইলে হাসান উদ্দিন সরকার বলেন, ভোটারেরা ভোটকেন্দ্রে গেলে তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হবেন। সব সময় মানুষের পক্ষে ন্যায্য কথা বলা তার বৈশিষ্ট্য। এলাকার মানুষ তাকে চেনে জানে। দলে ত্যাগী মানুষ।
আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী। বিপুল ভোটে তিনি জয় পাবেন। তার লক্ষ্য ভোটারদের কেন্দ্রে আনা।

জাহাঙ্গীর আলমই জয়ী হবে বলে দাবি করছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মী-সমর্থকরা। তাদের দাবি, গাজীপুর আওয়ামী লীগের দুর্গ। এবারের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এখানকার মানুষ এই প্রার্থীকেই ভোট দেবেন। তারা বলেন, টঙ্গী পৌরসভার ১৭ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করা আজমত উল্লাহ্ খান গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র হতে পারেননি। ফলে এই শহরবাসীর কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা অনুমেয়। তাই এবার মানুষ আওয়ামী লীগ প্রার্থীকেই ভোট দেবে।

কাশিমপুর এলাকার ভোটার ও প্রভাবশালী মানুষ নুরুল আফসার মনে করেন, ভোট দেওয়ার বিষয়ে সাধারণ ভোটারেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী আন্দোলনের বা জামায়াতে ইসলামের লোকেরা বিএনপি প্রার্থীকেই ভোট দেবে। সেই শ্রেণির ভোটাররা কখনো আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে ভোট দেবে না। তার মতে, ভোটব্যাংক বলে একটি কথা আছে। এখানকার সিংহভাগ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে ভোট দেবে। বিএনপি প্রার্থীর সমর্থক শ্রমিক নেতা ফজলু মিয়া মনে করেন, গাজীপুরে মোট ভোটারের এক-চতুর্থাংশই শ্রমিক ভোটার। অর্থাৎ প্রায় ৩ লাখ ভোটার শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষ। এই ভোটারদের দিকেই সবচেয়ে বেশি নজর দিচ্ছেন বিএনপির প্রার্থী হাসান সরকার। তিনি টঙ্গীর পৌর মেয়র ছিলেন। দুবার জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ছিলেন। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানও ছিলেন। সেই সময় শ্রমিকদের স্বার্থ তার মতো কেউ দেখেনি। এছাড়া একদল শ্রমিক এক সময় কাজী জাফর আহমদের লোক ছিল। তারা এখন হাসান সরকারের।

সরেজমিনে মনে হয়েছে, এখানকার নির্বাচনি পরিবেশ ভালো। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ভোটারদের মধ্যে শতভাগ আস্থা এখনো সৃষ্টি হয়নি। অবশ্য ভোটারদের মিছিলে দেখা না গেলেও আগ্রহ দেখা যাচ্ছে ভোট নিয়ে। শুধু যে, সড়ক ও সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে প্রার্থীর পথসভা ও প্রচারণা তা কিন্তু নয়। বিভিন্ন এলাকায়ও ভোট নিয়ে দস্তুরমতো গবেষণা হতে দেখা যাচ্ছে। অবশ্য মানুষ চাইছে ভোটের দিনে ভোটারদের নিরাপত্তা।

লেখক : উপসম্পাদক, দৈনিক আমাদের অর্থনীতি

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত