প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দশ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধার মামলা
বাদী পুলিশ ইন্সপেক্টর হেলাল পরিকল্পিত হত্যার শিকার!

নিজস্ব প্রতিবেদক: চার দলীয় জোট সরকারের সময়ে বহুল আলোচিত ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধার মামলার বাদী পুলিশের ইন্সপেক্টর হেলাল উদ্দিন ভূঁইয়ার মৃত্যু নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। গত ১৭ জুন রবিবার হেলাল উদ্দিন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের জামায়াতে ইসলামীর নিরাপদ আস্তানা হিসেবে খ্যাত ফেনীর রামপুর এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। তবে এটিকে দুর্ঘটনা না বলে পরিকল্পিত হত্যা বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার। হেলাল উদ্দিনের স্ত্রী ইয়াছমিন জুয়েলের অভিযোগ- ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়ার পর সে সময়ের সরকার তাকে হয়রানিমূলক বদলিসহ মানসিকভাবে নির্যাতন করেছিল। ওই সময় তাকে হত্যার হুমকিও দেয়া হয়েছিল। যারা হত্যার হুমকি দিয়েছিল তারাই পরিকল্পিতভাবে তাকে খুন করেছে। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন।

রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) জেটি ঘাটে ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালানটি ধরা পড়ে। সিইউএফএল জেটিতে অস্ত্র খালাসের খবরটি প্রথম জানতে পারেন সে সময়ের চট্টগ্রাম ট্রাফিক পুলিশের বন্দর থানার সার্জেন্ট, নগরীর বন্দর থানার কয়লার ডিপো পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এবং বর্তমানে বন্দর থানার পুলিশের প্যাট্রোল ইন্সপেক্টর হেলাল উদ্দিন এবং তারই সহকর্মী বন্দর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. আলাউদ্দিন। তারা দুজন প্রথমেই ওই জেটিতে ছুটে যান এবং অবৈধভাবে অস্ত্র খালাস ধরিয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১০ ট্রাক অস্ত্র আটকের পর ২০০৫ সালে ক্ষমতাসীন সরকারের রোষানলে পড়ে সেই চালান থেকে দুটি একে-৪৭ রাইফেল চুরি করে বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগে হেলাল উদ্দিন ও আলাউদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তাদের নামে নোয়াখালী জেলার সুধারাম থানায় মামলাও হয়েছিল। এই দুজন পুলিশ সদস্যকে চাকরিচ্যুতও করা হয়। তাদের উল্টো অস্ত্র মামলায় আসামি করে পাঠানো হয় জেলে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালে তাদের মামলা প্রত্যাহার হয়। ২৮ মাস কারাবাস শেষে মুক্তি মেলে তাদের। এরপর ২০১১ সালে দুজন চাকরি ফিরে পান।

২০১২ সালের ২৯ ও ৩০ জুলাই ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন হেলাল উদ্দিন। এ সময় তিনি ১০ ট্রাক অস্ত্র ধরিয়ে দেয়ার অপরাধে তাদের গ্রেপ্তারের পর র‌্যাবের নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন। চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের সে সময়ের পিপি কামাল উদ্দিন আহমেদ তখন আদালতে বলেছিলেন, সার্জেন্ট হেলাল উদ্দিন ও আলাউদ্দিনের কারণে ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। এ জন্য বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার তাদের অস্ত্র মামলার আসামি করে ও গ্রেপ্তার করে নির্যাতন করে। পায়ে ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে আদালতে সাক্ষ্য দিতে এনে তাদের হয়রানি করে।

দ্বিতীয় দফায় দেয়া সাক্ষ্যে হেলাল উদ্দিন জানিয়েছিলেন, ১০ ট্রাক অস্ত্র আটকের সময় আবুল হোসেন নামে একজন উলফা নেতা তাদের বাধা দিয়েছিলেন। পরে টিআই প্যারেডে (আসামি শনাক্তকরণ) তিনি আসামি মেজর লিয়াকতকে আবুল হোসেন বলে শনাক্ত করেছিলেন।

চোরাচালান ও অস্ত্র আইনে দায়ের হওয়া দুই মামলার রায় ২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি ঘোষণা করেন চট্টগ্রাম মহানগর আদালতের সিনিয়র স্পেশাল জজ-১ এস এম মুজিবুর রহমান। চোরাচালান মামলার রায়ে জামায়াতের আমির (যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত) ও সাবেক শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৪ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। অস্ত্র মামলার রায়ে তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়।

পরিবারের অভিযোগ- ২০০৪ সাল থেকেই আসামিরা হেলাল উদ্দিনকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল। আদালতে সাজা হওয়ার পর আসামিদের অনুসারীরা হেলালকে হত্যার পরিকল্পনা করে। তারা হেলালের গতিবিধি নজরদারি করছিল।

বন্দর থানার পুলিশের প্যাট্রোল ইন্সপেক্টর হেলাল উদ্দিন ভূঁইয়া ঈদের আগের দিন সন্ধ্যায় ছুটি পেয়ে বাড়িতে আসেন। ঈদের পরের দিন গত রবিবার গ্রামের বাড়ি থেকে কর্মস্থলে ফেরার পথে দুপুর ২টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের জামায়াতে ইসলামীর নিরাপদ আস্তানা হিসেবে খ্যাত ফেনীর রামপুর এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন। তার গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি গাছের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা লেগে ছিটকে গিয়ে আরো একটি গাছের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। উক্ত প্রাইভেটকারের সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং তিনি গুরুতর আহত হন।

পরে উদ্ধার করে তাৎক্ষণিক ফেনী ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর সন্ধ্যা ৬টার দিকে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। গত সোমবার বিকেলে উপজেলার বড়গোবিন্দপুর শাহী ঈদগাহ মাঠে নিহতের নামাজে জানাজা সম্পন্ন হয়। এ সময় তার কফিনে বাংলাদেশের পতাকা জড়িয়ে দেয়া হয়। পরে সন্ধ্যা ৬টায় গোবিন্দপুর গ্রামের ভূঁইয়া বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।

নিহত হেলাল চান্দিনা পৌর এলাকার ৬নং ওয়ার্ডের বড়গোবিন্দপুর ভূঁইয়া বাড়ির মরহুম আমির আলী ভূঁইয়া মাস্টার ও হোসনেয়ারা বেগমের বড় ছেলে। হেলাল উদ্দিনের স্ত্রী ও দুই সন্তান থাকতেন কুমিল্লা শহরে। দুই সন্তানের মধ্যে তার মেয়ে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে গত বছর এইচএসসি পাস করেছেন, ছেলে কুমিল্লা জেলা স্কুলের ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

হেলালের স্ত্রী ইয়াছমিন জুয়েল অভিযোগ করে বলেছেন, আমার স্বামী পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের শিকার। তাকে যে কোনো শত্রু পেছন থেকে ধাওয়া করেছিল। না হয় পেছন থেকে ধাক্কা দিয়েছিল। তিনি সরকারের কাছে এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন।

ইয়াছমিন জুয়েল আরো অভিযোগ করেন, দুর্ঘটনার পর ফেনী সদর হাসপাতালে হেলাল উদ্দিনের চিকিৎসায় অবহেলা করেন হাসপাতালের চিকিৎসকরা। দ্রুত সময়ের মধ্যে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। চিকিৎসায় অবহেলার কারণে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হচ্ছে জেনেও চিকিৎসক তাদের রক্তের কথা বলেনি। এ ছাড়া যে অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে ফেনী থেকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল, সেটিতে অক্সিজেন, এসি এবং ইমার্জেন্সি সাইরেন পর্যন্ত ছিল না। এমনকি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও দ্রুত সেবা পাননি।

তিনি বলেন, আমার স্বামী কোনো অপরাধ করেনি। তিনি অবৈধ ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়ে দেশ ও জাতীর উপকার করেছে। অপরাধ না করেও আমার স্বামী আড়াই বছর জেল খেটেছেন। পরবর্তী সময় ফের চাকরিতে যোগ দিলেও এক মাসে ৪ বার হয়রানিমূলক বদলিসহ নানাভাবে মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আমি পুলিশের আইজি স্যারের কাছে স্বামীর মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছি। তিনি সুষ্ঠু তদন্তের কথা দিয়েছেন।

স্থানীয় কেরণখাল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. হারুন-অর রশিদ বলেন, হেলাল শান্ত স্বভাবের ছিলেন। এ দুর্ঘটনার সঙ্গে অন্য কোনো বিষয় আছে কি না তা তদন্ত করে বের করার দাবি জানাচ্ছি। মহিপাল হাইওয়ে থানার ওসি আব্দুল আওয়াল বলেন, দুর্ঘটনায় নিহত হেলাল উদ্দিনের প্রাইভেটকারটি উদ্ধার করে থানায় রাখা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে। সূত্র: ভোরের কাগজ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত