প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

ব্যাংকিং খাত নিয়ে বাজেটে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনার তাগিদ

নিউজ ডেস্ক: ব্যাংক মালিকসহ প্রভাবশালীরা ব্যাংকের টাকা ঋণের নামে খেয়ে ফেলছে। তারল্য সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ ও করপোরেট কর কমিয়ে বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে আবারো ঋণখেলাপি হওয়ার সুযোগ দেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে করের টাকা বাজেটের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে দেয়া হলেও তার সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকছে না। এটিকে আর্থিক খাতের বিশৃঙ্খলা উল্লেখ করে তা নিয়ে বাজেটে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাজেটে কাঠামোগত পরিবর্তনের পরামর্শও দিয়েছেন তারা।

গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে ‘সিপিডি বাজেট সংলাপ ২০১৮’তে অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকরা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহানের সভাপতিত্বে সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন আর সঞ্চালনা করেন প্রতিষ্ঠানটির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান। আলোচনায় অংশ নেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রমুখ।

মূল প্রবন্ধে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাজেটের আকার প্রতি বছরই বাড়ছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য এটি দরকার হলেও আয়-ব্যয় কাঠামোয় স্পষ্টতা দরকার। ব্যয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংকসহ সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় বরাদ্দ রাখা হলেও সে ব্যাপারে বিস্তারিত বলা নেই। করছাড় দিয়ে রাজস্ব আয়ের বড় প্রবৃদ্ধির পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে করপোরেট করে ছাড় দিয়েও তাদের জন্য মূলধন জোগানের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কোনো কোনো ব্যাংক অনিয়ম করলেও তাদের করের টাকায় পুনর্গঠন করা হচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও অধিদপ্তরগুলোকে দিনের পর দিন লোকসানের পরও মূলধন দেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে সুদহার বেশি হওয়ার কারণে ব্যক্তিবিনিয়োগ বাড়ছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার ভূমিকা পালন করতে পারছে না। ফলে আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে বাজেটে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও পরিকল্পনা থাকা দরকার ছিল। বাজেটে এক বছরের জন্য পরিকল্পনা না করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া দরকার।

ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণকে বড় সমস্যা বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তিনি বলেন, সরকার বাজেট ঘোষণা করে। আর বিরোধী দল তা প্রত্যাখ্যান করে— এটি সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোয় জনসম্পৃক্ত আলোচনা হয় না। প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় রফতানিতে অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের রফতানি আয় এখনো ৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারেনি। কিন্তু ভিয়েতনামের রফতানি ২০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। শিল্পে অর্থায়নের খাতগুলো সংকুচিত হয়ে আসছে। পুঁজিবাজার অকার্যকর। খেলাপি ঋণ একটি বড় সমস্যা। জিয়াউর রহমানের সময় এ ঋণখেলাপির সংস্কৃতি শুরু হয়। বর্তমানে তা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমানে দেশের ৫ শতাংশ লোকের হাতে সব সম্পদ চলে গেছে। তাদের সম্পদ যে পরিমাণ বেড়েছে, তা অবিশ্বাস্য। তারা সারা বিশ্বে বাড়িঘর কিনছে। তাদের টাকা রাখার জায়গা নেই। প্রতি বছরই দেশ থেকে ৮-১০ বিলিয়ন ডলার পাচার হচ্ছে। এসব কারা করছে, সবাই জানে। যারা শেয়ারবাজারসহ ব্যাংক লুট করছে, তারাই এসব করছে। ফলে সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা কমিয়ে এ ৫ শতাংশের ওপর করের পরিধি বাড়ানো দরকার। এটি হলে এনবিআরের রাজস্ব কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।

ব্যাংকিং খাতের অব্যবস্থাপনা তুলে ধরে তিনি বলেন, যারা ব্যাংক লুট করছে, আপনারা তাদের কর কমিয়ে দিয়েছেন। আবার যারা লুট করে নিয়ে যাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে না। ব্যাংকিং ডিভিশন বলে আপনারা যেটি তৈরি করেছেন, এটাকে অবলোপন করে দেন। দয়া করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজগুলো তাদের করতে দেন। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে হোটেলে নিয়ে সিআরআর কমিয়ে দেয়া হচ্ছে। চিন্তা করেন, ইনস্টিটিউটশন কোথায় গেছে?

অতিথিদের বক্তব্যে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, বাজেট নিয়ে সংসদে আলোচনা করা দরকার। কিন্তু সংসদে যেসব আলোচনা হয়, তার বেশির ভাগই সরকারের স্তুতি। ফলে বাজেটে জনগণের মতের প্রতিফলন থাকে না। মৌলিক বিষয় পরিবর্তন না করে অর্থ বাড়িয়ে উন্নতি করা যায় না। বড় বড় বিল্ডিং করে ফায়ার সার্ভিসের কাজের সুযোগ বাড়ানো হবে। মানুষ সেবা পাবে না।

আলোচনায় অংশ নিয়ে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) প্রেসিডেন্ট ব্যারিস্টার নিহাদ কবির বলেন, বাজেটে রাজস্ব আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা উচ্চাভিলাষী। দিন শেষে ভালো করদাতার ওপরই করের বোঝা বাড়বে। মধ্যবিত্তরা অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। কিন্তু এবারের বাজেট তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। দেশের শেয়ারবাজার অকার্যকর। পাশাপাশি ব্যাংকের অবস্থাও ভালো নয়। শিল্পঋণের বিপরীতে ১৫-১৬ শতাংশ সুদ দিতে হয়। এ হারে সুদ দিয়ে বেসরকারি খাতের টিকে থাকা কঠিন। এছাড়া বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবহিদিতা বাড়ানো উচিত।

বিনিয়োগ স্থবিরতা চলছে উল্লেখ করে নিহাদ কবির বলেন, কয়েক বছর ধরেই দেশে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে। এর পেছনে ব্যাংকের সুদহারকে দায়ী করা হলেও ব্যবসায় পরিবেশ ও ব্যয় বৃদ্ধি অনেকাংশে দায়ী। অনুমোদন নিবন্ধনসহ প্রাথমিক কাজগুলো সম্পন্ন করতে অনেক বেশি সময় লেগে যায়। সরকারি অফিসে ওয়ান স্টপ সার্ভিসের কথা বলা হলেও তা দেখা যাচ্ছে না। এছাড়া সরকারের নীতির ধারাবাহিকতা না থাকা এবং ব্যবসায়ীদের কর জটিলতার কারণেও বিনিয়োগ বাড়ছে না।

মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আব্দুল মজিদ বলেন, ২০২৪ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশ ও ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি বাস্তবায়ন করতে হলে বাজেটের আকার বাড়বে। তেমনি এর জোগানের লক্ষ্যে রাজস্ব বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার জরুরি। তা না হলে বাজেটের আকার বাড়লেও আমাদের অর্থনীতি ডায়াবেটিস রোগীর মতো মোটা হবে। বৈদেশিক ঋণের কারণে একসময় অর্থনীতির কাঠামো ভেঙে পড়বে।

প্রস্তাবিত বাজেটের সমালোচনা করে ব্যবসায়ী নেতা মনজুর আহমেদ বলেন, এ বাজেট শুধু ব্যবসায়ীবিরোধী নয়, এটা সরকারবিরোধী বাজেট। যারা ট্যাক্স দিয়ে ব্যবসা করছেন এবং যারা ট্যাক্স দিচ্ছেন না, তাদের মধ্যে বিরাট গ্যাপ তৈরি করা হয়েছে। রাজস্ব বাড়াতে হলে করজাল বাড়াতে হবে। আমরা এজন্য প্রস্তাবিত বাজেটে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু বাজেটে তার কোনো প্রতিফলন হয়নি।

রাজস্ব আহরণে বিভিন্ন সংস্কার চলছে জানিয়ে এনবিআর সদস্য (ভ্যাটনীতি) রেজাউল হাসান বলেন, আগামী বছর থেকেই ভ্যাটের সব কার্যক্রম অনলাইনের মাধ্যমে হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের এরই মধ্যে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এটি হলে রাজস্ব ফাঁকির প্রবণতা কমে যাবে। রাজস্ব আহরণ বাড়াতে আরো কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় ব্যাংকিং খাত নিয়ে কথা বলেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান। তিনি বলেন, এ মুহূর্তে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৬০টির মতো ব্যাংক আছে। টাকা নেই বলে কোনো ব্যাংক থেকেই কোনো চেক রিটার্ন হয়নি। ফারমার্স ব্যাংককে আমরা হাতে নিয়েছি। এটা শেষ হয়ে গেল, এমন মন্তব্য করার সুযোগ এ মুহূর্তে নেই। ব্যাংকের করপোরেট কর কমানো নিয়ে সমালোচনা আসছে। কিন্তু বাজেটে যে ঘোষণা করা হয়েছে, তা শুধু প্রস্তাব। এটি চূড়ান্ত নয়। বিভিন্ন সমালোচনা সরকার শুনছে। বাজেট পাসের সময় এসব বিষয় অবশ্যই বিবেচনা করা হবে।

বিভিন্ন অভিযোগের জবাবে আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, আমাদের সময়ে ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম হয়নি, এমন কথা বলব না। তবে আমরা ব্যাংক ও আর্থিক খাত সংস্কার করব। সংস্কার এনে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরো শক্তিশালী করব। আমরা কোনো ব্যবস্থাই নিইনি, এমন অভিযোগ সঠিক নয়। উইন উইন সিচুয়েশন আমরা ম্যাচ করব। যারা ভালো তাদের যত প্রকারের উৎসাহ দেয়া যায় দেয়া হবে। আর খারাপরা যত বড়ই হোক, তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর ব্যবস্থা করব।

ব্যাংকিং খাতের করপোরেট কর কমানোর বিষয়ে তিনি বলেন, রফতানি ও সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়াতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে হবে। করপোরেট কর অনেক বেশি। এ করহার না কমালে বিদেশীরা বিনিয়োগ করবে না। ফলে ব্যাংকের মতো অন্যান্য খাতেও ভবিষ্যতে করপোরেট কর কমানো হবে।

২০৩০ সাল নাগাদ প্রতিবেশী দেশকে বাংলাদেশ ঋণ দেবে উল্লেখ করে মুস্তফা কামাল বলেন, ২০২৩ সাল নাগাদ আমাদের আর অন্য দেশ থেকে টাকা ধার করতে হবে না। আমরা বরং টাকা ধার দেব। চীন আমাদের ঋণ দিচ্ছে, অথচ ওদের ঋণের পরিমাণ জিডিপির তুলনায় ১৮৫ শতাংশ। ১০০ শতাংশের নিচে কোনো দেশে নেই। আমার লেখাপড়া যদি সত্য হয়, তাহলে ২০৩০ সাল নাগাদ আমরা আশপাশের দেশকে ঋণ দেব। সূত্র: বণিক বার্তা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত