প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আওয়ামী লীগ-বিএনপির প্রেস্টিজের লড়াই

নিজস্ব প্রতিবেদক :  গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রচারণাযুদ্ধ শেষ, এবার ব্যালটের লড়াই দেখার অপেক্ষা। রাত পোহালেই ভোটগ্রহণ। নানা কারণে ব্যাপক আলোচিত এই নির্বাচন। একে তো নৌকা ও ধানের শীষের সরাসরি লড়াই। তার ওপর জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজধানীর নিকটবর্তী ও গুরুত্বপূর্ণ সিটি করপোরেশন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের পরীক্ষা। এ নির্বাচনের প্রভাব পড়বে আগামী জাতীয় নির্বাচন এবং মাত্র মাসখানেক পর হতে যাওয়া রাজশাহী, সিলেট ও বরিশাল সিটি নির্বাচনে। তাই এই লড়াই উভয় দলের জন্যই ‘প্রেস্টিজ ইস্যু’। জিতলে ক্ষমতাসীনরা দাবি করবে তাদের উন্নয়নের রাজনীতি জনগণ গ্রহণ করেছে, সমর্থন বেড়েছে। আর ধানের শীষের প্রার্থী জিতলে বিএনপি বলবে, জনগণ আওয়ামী লীগ সরকারকে প্রত্যাখ্যান করেছে। বিএনপির অবশ্য হারলেও ক্ষতি নেই। সে ক্ষেত্রে তারা অভিযোগ তুলবে, এই সরকার ও বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। নির্বাচনকালীন ‘নিরপেক্ষ সরকার’ ও নিরপেক্ষ ইসির দাবি আরো জোরালো করবে দলটি। এ কারণে ইসির জন্যও নিরপেক্ষতা-সক্ষমতা প্রমাণের একটি বড় চালেঞ্জ এই নির্বাচন। এমন প্রেক্ষাপটে কেমন হবে গাজীপুর নির্বাচন? কে জিতবে এখানে, কত ব্যবধানে জিতবে? ফলাফলের ফ্যাক্টর কী হবে? এসব জানতে গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় আছেন রাজনৈতিক মহলসহ সারা দেশের মানুষ। সবারই নজর এখন গাজীপুর সিটি নির্বাচনের দিকে।

বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জন্য গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এখানে জয়লাভের জন্য উভয় দল ও তাদের প্রার্থীরা মরিয়া। নির্বাচনের ফলাফলের সঙ্গে উভয় দলেরই ভাবমূর্তি জড়িত। নৌকার প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের বিজয়ের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা প্রমাণের চ্যালেঞ্জ। গত মেয়র নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এডভোকেট আজমত উল্লা খান এক লাখের বেশি ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন। এবার আর আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে পরাজিত হতে চায় না। তাই ‘উইনিং ক্যান্ডিডেট’ বিবেচনায় এবার আজমত উল্লার পরিবর্তে তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে এডভোকেট জাহাঙ্গীর আলমকে মনোনয়ন দেয়া হয়। পরবর্তীতে এই মনোনয়ন নিয়ে দলের ভেতরেই কিছুটা বিরোধ সৃষ্টি হয়। ফলে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম কিছুটা হলেও বিড়ম্বনায় পড়েন। কিন্তু নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে দলের প্রয়োজনে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে জাহাঙ্গীরের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন। কেন্দ্রীয় এবং গাজীপুর জেলা ও মহানগর কমিটির নেতারা ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনী মাঠে নেমে পড়ায় নৌকা মাঠ গুছিয়ে নিয়েছে। আওয়ামী লীগের জন্য এই নির্বাচন উন্নয়নের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ। খবর ভোরের কাগজ’র।

জাহাঙ্গীর আলম বলেছেন, তিনি সবগুলো ওয়ার্ডের নেতাকর্মীদের সঙ্গে দেখা করে ভোট ও দোয়া চেয়েছেন। নির্বাচনে জয়লাভের ব্যাপারেও দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, গাজীপুরের উন্নয়নের জন্য আমিই যোগ্য ব্যক্তি। আমি নির্বাচিত হলে গাজীপুরের মানুষের সমস্যা সমাধান হবে। জলাবদ্ধতা থাকবে না। রাস্তায় যানজট থাকবে না।

অন্যদিকে এই নির্বাচন বিএনপির জন্যও এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিএনপির প্রার্থী হাসান সরকার জয়লাভ করলে বিএনপির ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল হবে। সারা দেশে নেতাকর্মীরা আরো চাঙ্গা হবে। সাংগঠনিক কার্যক্রমে গতি ফিরবে, নেতাকর্মীরা আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবে। এ কারণে হাসান সরকার ও বিএনপির জন্যও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জয়ের বিকল্প নেই। তারা এখানে দুর্গ রক্ষার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ধানের শীষের প্রার্থী হাসান সরকার ও বিএনপির শীর্ষ নেতারা নির্বাচনে জয়লাভের ব্যাপারে আত্মাবিশ্বাসী। হাসান সরকার বলেছেন, ২৬ জুনের নির্বাচনে জয়লাভের ব্যাপারে তিনি শতভাগ আশাবাদী। এবারো গাজীপুরের মানুষ ধানের শীষের পক্ষে থাকবে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের ওপর দেশের মানুষ বিরক্ত। এ কারণেই গাজীপুরের জনগণ গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী এম এ মান্নানকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করে।

বিএনপির নেতারা জানান, ধানের শীষ বিজয় ছিনিয়ে নিতে পারলে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে বলে দেশবাসীর কাছে প্রমাণ করতে পারবে। যদি জয়লাভ করতে না পারে তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে অনেক প্রশ্ন তুলতে পারবে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রভাব বিস্তার করেছে বলেও প্রচার চালাবে। বর্তমান ইসি ও শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু হবে না বলেও জোরালো দাবি তুলতে পারবে।

গাজীপুরের নির্বাচন যে কোনো মূল্যে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে চায় সরকারও। কারণ চলতি বছরের শেষদিকে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্তমান সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে। গাজীপুরের নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও নানা প্রশ্ন তুলতে পারে। তখন সরকার বেকায়দায় পড়বে। অওয়ামী লীগ এই মুহূর্তে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে কোনো প্রশ্নের মুখে পড়তে চায় না। এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনে জয়লাভের জন্য অনৈতিক কর্মকাণ্ড না করতে সর্বস্তরের দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন। সবাই ধারণা করছেন, গাজীপুরের নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। তাই আওয়ামী লীগের অধীনে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব করতে গাজীপুরের নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন সুষ্ঠু হলে ওয়ামী লীগও বলিষ্ঠ কণ্ঠে দাবি করতে পারবে, শেখ হাসিনার সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। দলীয় প্রার্থীর পক্ষে সরকার কোনো প্রভাব খাটায়নি।

গত ১৮ জুন থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর পর থেকে মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা বিরামহীনভাবে প্রচারণা চালিয়েছে। ভোটারদের কাছে টানতে শেষ মুহূর্তেও মেয়র প্রার্থীদের মরিয়া অবস্থা লক্ষ্য করা গেছে। প্রচার-প্রচারণার জন্য নির্বাচন কমিশনের বেঁধে দেয়া সময় গতকাল মধ্যরাতে শেষ হয়েছে। এরপর থেকে গাজীপুর এখন শান্ত। কোথাও কোনো মাইকের শব্দ নেই। রাস্তায় নেতাকর্মীদের লিফলেট হাতে ছোটাছুটি নেই। তবে গাজীপুরের সাধারণ মানুষের মাঝে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা থেমে নেই। চায়ের দোকান, রেল স্টেশন, বাজার, বাসস্ট্যান্ড, এমনকি গণপরিবহনের যাত্রীদের মাঝেও নির্বাচনী আলোচনা চলছে। শেষ মুহূর্তে প্রচারণায় মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন স্থানে দিনভর জোরালো প্রচারণা চালিয়েছেন। দলের নেতাকর্মীরাও পিছিয়ে ছিলেন না। গতকাল নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে উভয় দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নৌকা ও ধানের শীষের প্রার্থীরা তাদের দুর্বলতা কাটিয়ে নির্বাচনী মাঠ গুছিয়ে নিয়েছেন। প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মেয়র প্রার্থীরা নিজেদের জয়ের ব্যাপারে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

এদিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা স্পষ্টভাবেই বলেছেন, গাজীপুরে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে সব চেষ্টাই করা হবে। এ লক্ষ্যে সম্ভাব্য সব প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছে ইসি। এখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। আজ থেকে ৪২৫টি ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে ২৯ প্লাটুন বর্ডার গার্ড (বিজিবি) মোতায়েন থাকবে। এ ছাড়া র‌্যাবের বিপুলসংখ্যক সদস্য সশস্ত্র অবস্থায় টহল দেবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে ভোটকেন্দ্রগুলোতে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে গাজীপুরের পুলিশ সুপার হারুন উর রশিদ জানিয়েছেন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত