প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আওয়ামী লীগে কোন্দল, স্বস্তিতে বিএনপি

নিজস্ব প্রতিবেদক : নোয়াখালী-২ (সেনবাগ ও সোনাইমুড়ীর একাংশ) সংসদীয় আসনটি বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এরশাদ স্বৈরশাসনের পতনের পর নবম সংসদ পর্যন্ত সব নির্বাচনে দলটির প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। অন্যদিকে দুই মেয়াদে সরকারে থাকায় কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় আছে আওয়ামী লীগ। বিএনপি নির্বাচন না করায় দশম সংসদ নির্বাচনে আসনটি ক্ষমতাসীন দলের কবজায় চলে যায়। কিন্তু দলে কোন্দল ও একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী থাকায় একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে অস্বস্তি আছে আওয়ামী লীগে। অন্যদিকে বিএনপিতে কোন্দল থাকলেও সেটা থিতিয়ে এসেছে। এ ছাড়া আগামী সংসদ নির্বাচনে দলের একজন সম্ভাব্য প্রার্থীই এখন পর্যন্ত মাঠে থাকায় স্বস্তিতে আছে বিএনপি।

এই আসনে দশম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকিটে জয়লাভ করেন শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেঙ্গল গ্রুপ ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আরটিভির চেয়ারম্যান মোরশেদ আলম। খবর কালের কণ্ঠ’র।

নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে আছেন বর্তমান সংসদ সদস্য মোরশেদ আলম, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি তমা গ্রুপের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান ভূঁইয়া মানিক, জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. জামাল উদ্দিন আহম্মেদ, সেনবাগ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও কানকিরহাট কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জাফর আহমেদ চৌধুরী।

অন্যদিকে বিএনপি নেতাকর্মীরা জানায়, দলটির সম্ভাব্য প্রার্থী জয়নুল আবদিন ফারুক। উল্লেখ্য, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে টানা বিজয়ী হন তিনি।

আওয়ামী লীগ : নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেনবাগ-সোনাইমুড়ী নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগে রয়েছে কোন্দল। এ কোন্দল নিরসনের জন্য জেলা ও কেন্দ্র থেকে চেষ্টা করা হলেও তা মেটেনি।

সংসদ সদস্য মোরশেদ আলম বলেন, ‘সেনবাগে আওয়ামী লীগ আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। সাধারণ মানুষও আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের মতো এত উন্নয়ন আগে দেখেনি।’ তিনি গত ৯ বছরে উন্নয়নের বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘বিগত বিএনপি সরকারও এমন উন্নয়ন করতে পারেনি। এ ছাড়া সেনবাগ উপজেলায় বিভিন্ন ইউনিয়নে তৃণমূল আওয়ামী লীগ ও যুবলীগকে শক্তিশালী করা হয়েছে। আগামী দিনে নৌকার জয় কেউ ঠেকাতে পারবে না।’

এলাকায় দানবীর হিসেবে সুপরিচিত নোয়াখালী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তমা গ্রুপের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান ভূঁইয়া মানিক। জেলা আওয়ামী লীগের এই নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিগত সময়ে আমি দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি এলাকার সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করার চেষ্টা করেছি। এটি একসময়ে বিএনপির ঘাঁটি থাকলেও দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে প্রতি সপ্তাহে সেনবাগ পৌরসভাসহ সব ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে সাধারণ মানুষের কাছে গিয়েছি, মহিলাদের নিয়ে উঠান বৈঠক, মতবিনিময় সভা করেছি। শেখ হাসিনা দেশের উন্নয়নের জন্য দিনরাত্রি কাজ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, সে বিষয়ে অবহিত করে জনমত সৃষ্টি করেছি। নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে দলকে সুসংগঠিত করেছি।’

মানিক বলছিলেন, তিনি ব্যক্তিগত তহবিল থেকে সোনাইমুড়ি উপজেলায় পাঁচ কোটি টাকা খরচে মসজিদ কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ, বারগাঁও ইউনিয়নে আতাউর রহমান ভূঁইয়া কলেজ ও উচ্চ বিদ্যালয়, হতদরিদ্র পরিবারের অসহায় মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থা করা, প্রতিটি ইউনিয়নে অসহায়, দরিদ্র ৩০টি পরিবারের টিনের ঘর নির্মাণ করে দেওয়া, বিনা মূল্যে চিকিৎসাব্যবস্থা করা, প্রতিটি ইউনিয়নে মসজিদ ও মাদরাসা সংস্কারের ব্যবস্থা করার মতো কাজ করেছেন। এ ছাড়া এলাকার ৫০০ বেকার শিক্ষিত যুবকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন তিনি। তিনি বলেন, তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগে এসব করলেও তাতে আওয়ামী লীগই উপকৃত হয়েছে। আগামী নির্বাচনে দলের সভাপতি তাঁকে মনোনয়ন দিলে তিনি নেত্রীকে আসনটি উপহার দিতে পারবেন বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

আওয়ামী লীগের আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী ড. জামাল উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, ‘গত ২০০৮ সালে নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর থেকে আমি এলাকায় নিবিড়ভাবে কাজ করছি। প্রতি সপ্তাহে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে নেতাকর্মীদের নিয়ে উঠান বৈঠক, মতবিনিময় সভা করেছি।’ তিনি বলছিলেন, মুক্তিযোদ্ধা ও দুস্থদের মধ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতার তহবিলের অনুদানের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি তিনি সেনবাগ উপজেলায় ৩৫টি উচ্চ বিদ্যালয়, ২০টি মাদরাসা, তিনটি কলেজে ল্যাপটপ বিতরণ ও ওভারহেড প্রজেক্টর ব্যবস্থা করেছেন, যাতে এলাকায় শিক্ষার বিস্তার ঘটে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ৭৫ কিলোমিটার পল্লী বিদ্যুতের সংযোগের ব্যবস্থা করেছেন তিনি।

সংসদ সদস্য না হয়েও এলাকায় দলীয় কাজের পাশাপাশি উন্নয়নকাজ করছেন জানিয়ে ড. জামাল বলেন, আগামী নির্বাচনে নেত্রী তাঁর সততা, নিষ্ঠা ও যোগত্যার কারণে মনোনয়ন দেবেন বলে তিনি আশা করেন।

পর পর দুবার উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন জানিয়ে আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী জাফর আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘এ আসনে ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ আমাকে মনোনয়ন দিয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় ষড়যন্ত্র করে আমাকে পরাজিত করা হয়েছে। এর পরও নিজের অর্জিত অর্থে আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছি।’ তাঁর দাবি, বর্তমান সরকার সারা দেশে উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দিলেও এখানে সেই ছোঁয়া লাগেনি। এ আসনে রাস্তাঘাটের দুরবস্থা, একটি মাত্র হাসপাতালের অবস্থাও করুণ। সেনবাগ সরকারি কলেজ, সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ও বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট রয়েছে। এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়নি কোনো শিল্প-কারখানা। এলাকায় মাদকের ছড়াছড়ি। বিচার সালিসের নামে চলছে সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম, ভেঙে পড়ছে সামাজিক ব্যবস্থা। এমন অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য তিনি আগামী নির্বাচনে দলের মনোনয়ন চান।

বিএনপি : এই নির্বাচনী এলাকায় বিএনপিতে কোন্দল চোখে পড়ার মতো নয়। সেনবাগের বিএনপি নেতা সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কাজী মফিজুর রহমানসহ কিছু নেতাকর্মী জয়নুল আবদিন ফারুকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও এখন তাঁরা কোণঠাসা। ফারুকের চাচাতো ভাই আবদুল্লাহ আল মামুনও তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু মামুন এখন পিছু হটেছেন। বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের বেশির ভাগই ফারুকের পক্ষে। পাশাপাশি কেন্দ্রে তাঁর অবস্থান দৃঢ় হওয়ায় আগামী নির্বাচনে এখানে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পাবেন জয়নুল আবদিন ফারুক—এমনটাই মনে করে দলের বেশির ভাগ নেতাকর্মী।

বিএনপির চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক বলেন, ‘সেনবাগ হচ্ছে খালেদা জিয়া তথা বিএনপির ঘাঁটি। এখানে সাধারণ মানুষ ধানের শীষের বাইরে কাউকে ভোট দেয় না। সরকার যদি ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করে, আমাদের নেত্রীকে ছেড়ে দিয়ে শেখ হাসিনার সরকার নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করে তবে এখানে নৌকার জামানত থাকার সম্ভাবনাও নেই।’ তিনি আরো বলেন, ‘বিগত ৯ বছরে সরকারি দল নিজেরা মারামারি করে আমাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যে অভিযোগে মামলা দিয়ে হয়রানি করেছে। তারা সেনবাগে কোনো উন্নয়ন করেনি, শুধুু লুটপাট করে নিজেরা তাদের আখের গুছিয়েছে।’

আগামী নির্বাচনে জয়নুল আবদিন ফারুকই দলের প্রার্থী—এ কথা জানিয়ে সেনবাগ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোক্তার হোসেন বলেন, ‘বিএনপির যে জনপ্রিয়তা রয়েছে তাতে জয়নুল আবদিন ফারুক আবারও বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন।’

অন্যান্য দল : জাতীয় পার্টি থেকে দলের সেনবাগ উপজেলা শাখা আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সাবেক ছাত্রনেতা হাসান মঞ্জুর নির্বাচন করবেন। নির্বাচন করার জন্য তিনি এলাকায় গণসংযোগ ও মতবিনিময় সভা করছেন।

হাসান মঞ্জুর বলেন, ‘তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের যথেষ্ট সমর্থন পেয়েছি। সাধারণ মানুষ এখনো চায় যে এরশাদের নেতৃত্বে দেশ পরিচালিত হোক। কারণ সন্ত্রাস, দুর্নীতি, নারী নির্যাতন, খুন, গুম থেকে সবাই বাঁচতে চায়।’

অন্যদিকে সাবেক ছাত্র নেতা ও ইসলামি শ্রমিক আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাওলানা খলিলুর রহমান এলাকায় গণসংযোগ ও মতবিনিময়সভা করছেন। তিনি বলেন, ‘এ আসনে আমরা শুধু নেতা নয়, নীতির পরিবর্তন চাই।’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত