প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, তৃতীয় নয়নে দেখা

মেজর ডা. খোশরোজ সামাদ 

১। এই তো ঈদ চলে গেল! উৎসবের রেশ এখনও পুরোপুরি কাটে নি। ঢাকার রাস্তা এখনো কিছুটা ফাঁকা। অফিস আদালত পাড়ায় কার কেমন ঈদ কাটল সেই গল্পের উচ্ছাস এখনও আছে। ঈদের আগে একমাসব্যপী ছিল রমজানের মাস। সংযমের মাস রমজান। এটা প্রত্যাশিত ছিল যে , সর্বক্ষেত্রের এই সংযম দ্রব্যমূল্যেও থাকবে। বাস্তবে আমরা ভিন্ন চিত্র দেখেছি। রমজান শুর হতেই দ্রব্যমূল্য বিশেষত ইফতার বা সেহেরী সামগ্রীর মূল্য আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছিল। ছোলা, মুড়ি, শসা, পিঁয়াজ , বেগুন, তৈল , খেজুর ইত্যাদি নিম্নবিত্ত এমন কি মধ্যবিত্তের ক্রয় ক্ষমতার বাহিরে চলে যায় । ফলে ভোক্তারা পরিবার পরিজন নিয়ে অপুস্টিকর , নিম্নমানের , প্রয়োজনের চেয়ে কম ক্যালরীযুক্ত খাবার খেতে বাধ্য হয়। এই খাবার খেয়ে দীর্ঘ সময়ে ,কাঠফাটা রোদে রোজা রাখা কষ্টসাধ্য হয়ে উঠে ।

২। ব্যবসার প্রাথমিক উদ্দেশ্য মুনাফা করা । সুতরাং , ব্যবসায়ীরা ব্যবসাতে লাভ কর তাতে কারো আপত্তি থাকবার কথা নয়। কিন্তু , সংযমের মাসে হুট করে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি অপরাধের সামিল। পত্র-পত্রিকায় দেখতে পাই মুনাফার লোভে সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয় । এই অচ্ছেদ্যচক্র বাজারের পুরো বিপণন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে । ফলে বাজারে পণ্য সরবরাহ যথেষ্ট পরিমাণে থাকলেও প্রায় সকল খুচরা ব্যবসায়ী একযোগে দাম বাড়িয়ে দেয়। ফলে ভোক্তাদেরকে বাধ্য হয়েই বেশীদামেই সেইসব খাদ্যসামগ্রী কিনতে হয় । দোকানীদেরকে জিজ্ঞেস করলে ভাঙা রেকর্ডের মত একই সুরে বলতে থাকে ‘বেশী দামে কেনা ,কমদামে বেচুম কেমনে?’ মধ্যসত্তভোগীরা উৎপাদিত পণ্য কমদামে কৃষকের কাছে কিনে নেয় এবং বিপুল মুনাফায় ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করে। পণ্য পরিবহনসহ , দোকানপিছু চাঁদা ‘প্রপার চ্যানেলে গড ফাদারদের কাছে ‘দিতে হয় এমন অভিযোগের কথাও শোনা যায় । চাঁদাবাজির বাড়তি খরচ পুষিয়ে নিতে বিক্রেতারা ছুরি চালান আর বলির পাঁঠা হন আমজনতা ক্রেতাকুল ।

৩। রমজানের সংযম শুধু সারাদিন না খেয়ে থাকাই নয় , ইফতার বা সেহেরী বাহুল্যবর্জিত পরিমিত থাকবে এটাই প্রত্যাশিত । কিন্তু, কিছু ধনাঢ্য ব্যক্তির ইফতার মেনুতে সংখ্যাগত আর গুণগতমানের বন্যা বইয়ে দেয়া হয়। পুরোনো ঢাকার চকবাজার , বেইলি রোড, বনানী, গুলিস্থান থেকে ‘বড় বাপের পোলায় খায়’সহ বিভিন্ন উচ্চমূল্যের ইফতার সামগ্রী দিয়ে খাবার টেবিল ঠাঁসা হয় । অধিকাংশ সময় এগুলি সবটুকূ  খেতে না পারায় উচ্ছিষ্ট আকারে  ভাগাড়ে যায় । পাড়া মহল্লা ক্লাবে ইফতার পার্টিতে কতপদের কতদামী খাবার পরিবেশন করা যায় তার  মূষিক দৌড় প্রতিযোগিতা শুর হয়। সম্প্রতি শুর হয়েছে সেহেরী কালচার। মধ্যরাতে দলবেঁধে নগরীর পাঁচ তারকা সম্বলিত হোটেল থেকে শুরু করে মধ্যমমানের হোটেলে চর্ব্য চোষ্য লেহ্য পেয় আকন্ঠ গলধঃকরণ ভোজন পিয়াসীদের ফ্যাশানে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। পাহাড়সমান  এইসব খাবার সামনে রেখে সেলফি তুলে ফেসবুকে  আপলোড করেন হালজমানার অনেকেই । পিৎজা বার্গার ইত্যাদি ফাস্টফুডের দোকানে ‘অফুরন্ত খাবার আর অফুরন্ত পানীয়’ দিয়ে বিশেষ প্যাকেজ পরিবেশিত হয়। ভোজনরসিকরা লহমায় এগুলি সাবাড়  করে ফেলেন এবং বাড়ির সপ্তপদী খাবার ‘পার্সেল’ বগলদাবা করে বাসায় ফেরেন ।

৪। এই বাড়তি খাবারের ধাক্কা কাঁচা বাজারেও লেগেছিল । অভিজাত পাড়ার  বাজারের অস্থিরতা  ‘অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের এলাকার ‘ কাঁচা বাজারেও  সংক্রমিত হয় । সাপাই এন্ড ডিমান্ড ‘রেশিওতে সাপাইয়ের ঘোড়া পিছনে পরে যায় । যার ভুক্তভোগী হয়েছিলেন  নিম্নবিত্ত , মধ্যবিত্ত প্রকারের সবাই । এই যথেচ্ছ খাবারের অসংযমী ভোজন বিলাসীরা নীহারিকাবাসী নন। এদেশের, এ মাটিরই সন্তান। এদের এই অসম  প্রতিযোগিতা থামানো গেলে ইফতার সামগ্রীসহ অনেককিছুরই মূল্য সহনীয় হবে। অন্তত সংযমের মাসে দ্রব্যমূল্যকে সহনীয় রাখতে পারলে জাতি হিসেবে আমাদের নৈতিকতাকেও ঋজু রাখবে। যদি ঘরের ভিতর থেকে আওয়াজ আসে তবে সেটি বেশী কার্যকরী হবে । লেডী ম্যাকবেথের প্ররোচনায় ম্যাকবেথ রাজত্বের লোভে পিতৃসম রাজাকে নিজহাতে হত্যা করে। যদি মাতা -বধূ-ভগ্নী কন্যারা একবার বলেন অবৈধ উপার্জনের টাকায় তারা সেহেরীর লোকমা মুখে তুলবেন না ,ইফতার ভাংবেন না। তবে এই উপার্জনকারীদের অধিক ধন সম্পদ বানানোর ‘প্যাশন’ অনেকটাই কমে যাবে। ফলে দ্রব্যমূল্য অনেকটাই সহনীয় হবে ।

৫। ঈশপের গল্পে দেখি বিড়ালের ভয়ে ইঁদুরেরা মিটিং করে বলেছিল ‘ইঁদুরের  গলায় যদি ঘন্টা বাঁধা যায় তবে আক্রমণ উদ্যত ইঁদুর কাছে আসলেই তার উপস্থিতি বুঝে পালিয়ে বাঁচা যাবে। কে এই অসংযমী খাদ্যরসিকদের বোঝবার ঘন্টা বাঁধতে যাবে? শুধু আমিই? একজন সামাণ্য কলাম লেখক। আচ্ছা ,আমিই না হয় ঘন্টা বাঁধার সিরিজ চেইন রিএকশনের অন্তত কলম যুদ্ধ শুর করলাম।একে এগিয়ে নিতে হবে আমাকে সবাইকে !

লেখক: উপ অধিনায়ক , আর্মড ফোর্সেস ফুড এন্ড ড্রাগস ল্যাবরটরী/সম্পাদনা: মোহাম্মদ আবদুল অদুদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত