প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

গাছে ঝুলছে পাকা আম, ক্রেতা নেই

বণিক বার্তা : গাছ পাকা টইটম্বুর রসে ভরা পাকা আমের কদর নেই এ ভরা মৌসুমে। ৪০ থেকে ৫০ টাকায় খুচরা বিক্রি হচ্ছে নানা জাতের আম। তাহলে পাইকাররা তা আরো কম দামে কিনছেন বাগান থেকে। আর বাগান লাখ লাখ টাকা দিয়ে কিনে যারা এতদিন লাভের আশায় বসেছিলেন তাদের তো মাথায় হাত। রাজশাহী সদরের আম ব্যবসায়ী মো. আনোয়ারুল হক এবার ৪০ বিঘা জমিতে প্রায় সাত প্রজাতির আমের বাগান করেন। রফতানির উদ্দেশ্যে অনুসরণ করেছেন ব্যাগিং পদ্ধতিও। তবে রফতানি করতে পারেননি। মৌসুমের শুরুতে গোপালভোগ আমের কিছুটা দাম পেলেও এখন কোনো আমই বিক্রি করতে পারছেন না। ঈদের পর ৪৪০ কেজি ক্ষীরসাপাতি আম পাড়লেও বিক্রি করতে পেরেছেন মাত্র ১০০ কেজি। ক্রেতার অভাবে বাকি আম স্থানীয় বাজারে দাম ছাড়াই এক প্রকার ছেড়ে দিয়েছেন।

একই অবস্থা সাতক্ষীরা সদর উপজেলার লাবসা গ্রামের আমবাগান মালিক লিয়াকত হোসেনের। চলতি মৌসুমে ২৫ বিঘা জমিতে আমের বাগান করেন। দুই বছর আগে প্রতি কেজি হিমসাগর আম ৭০ টাকায় বিক্রি করলেও এবার পেয়েছেন ৪০ টাকারও কম। আ¤্রপালির দাম পেয়েছেন আরো কম, প্রতি কেজি মাত্র ২৫ টাকা। যদিও ২৫ বিঘা জমির লিজ, উৎপাদন, পরিবহন, পরিচর্যা ও শ্রমিক বাবদ প্রায় ১৩ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। ৮০ শতাংশ আম বিক্রি করে ৭ লাখ টাকার মতো ঘরে তুলতে পেরেছেন। অবশিষ্ট আম বিক্রি করে আসতে পারে বড়জোর ১ লাখ টাকা। ফলে চলতি মৌসুমে ৪-৫ লাখ টাকা লোকসানে পড়ার আশঙ্কায় আছেন এ আমচাষী।

রাজশাহী ও সাতক্ষীরার মতোই আম নিয়ে বিপদে আছেন সারা দেশের চাষী ও ব্যবসায়ী। আম পাড়ার সময় বেঁধে দেয়াকে এর বড় কারণ হিসেবে দেখছেন তারা। তাপমাত্রার কারণে সময়ের আগে আম পরিপক্ব হলেও পাড়তে পারছেন না। পাশাপাশি ঈদুল ফিতর উপলক্ষে পরিবহন সংকট, কুরিয়ার সার্ভিস বন্ধ থাকা, রফতানির সুযোগ কম পাওয়াকেও দুষছেন তারা।

রাজশাহীর বানেশ্বর মোকামের আড়তদার বজলুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, বরাবরই এখানে বাইরে থেকে ব্যাপারীরা আম কিনতে আসেন। এবারো এলেও সংখ্যাটা খুবই কম। গত বছরের তুলনায় অর্ধেকেরও কম ব্যবসায়ী এসেছেন রাজশাহী অঞ্চলের বাজারগুলোয়। ক্রেতা না থাকায় আম নিয়ে চরম বিপাকে আছেন এখানকার কৃষক, বাগান মালিক ও আড়তদাররা। গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন দামে আম বিক্রি হচ্ছে। গত মৌসুমের অর্ধেক দামও মিলছে না।

দেশে আম বেচাকেনার সবচেয়ে বড় বাজার চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট। এ বাজারের আম আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড সূত্রে জানা গেছে, গত মৌসুমে গাছ থেকেই হিমসাগর মণপ্রতি ২ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছিল। ল্যাংড়া বিক্রি হয়েছিল ২ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকায়। এবার অর্ধেক দামেও বিকোচ্ছে না। রাজধানীতে আম নিয়ে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হওয়ার কারণে ব্যবসায়ীরা আসছেন না। ফলে স্থানীয় বাজারগুলো অনেকটাই ক্রেতাশূন্য। জমেনি কানসাটের আমের বাজারও।

কানসাট মোকাম থেকে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে নিয়মিত আম সরবরাহ করেন সেখানকার বাসিন্দা মিজারুল ইসলাম। তার ভাষ্য, রকমভেদে ২৫ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে আম বিক্রি করতে হচ্ছে। পরিবহন খরচ যোগ করে আমে এবার লাভ হচ্ছে না বললেই চলে। তার পরও বাধ্য হয়ে দীর্ঘদিনের এ ব্যবসা চালিয়ে নিতে হচ্ছে।

বিষয়টি স্বীকার করেন রাজশাহীর বানেশ্বর মোকামের আড়তদার বজলুর রহমানও। তিনি বলেন, বরাবরই বাইরে থেকে আম কিনতে ব্যাপারীরা আসেন। কিন্তু এবার সেভাবে আসেননি। ক্রেতা না থাকায় আম কিনে চরম বিপাকে এখানকার আড়তদাররা। গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন দামে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন জাতের আম।

হাঁড়িভাঙ্গা আমের জন্য বিশেষ পরিচিতি রয়েছে রংপুরের। সপ্তাহখানেক আগে স্থানীয় বাজারে এ জাতের আম ওঠা শুরু হলেও ক্রেতাদের উপস্থিতি নগণ্য। ফলে কম দামেই আম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন বাগান মালিকরা। ঈদের আগে ও পরে পরিবহন বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীরা রংপুরের বাইরে আম পাঠাতে পারেননি। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় অনেকটা পানির দরেই আম বিক্রি করছেন তারা।

নগরীর আমের হাট ঘুরে দেখা যায়, প্রতি মণ আম বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায়। একই আম গত বছর এ সময় বিক্রি হয়েছিল ২ হাজার ৫০০ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকায়। নগরীর নীলকণ্ঠের আম ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এ বছর ১১ লাখ টাকায় ছয়টি বাগান লিজ নিয়েছিলাম। গত বছর ১১ লাখ টাকায় সাতটি বাগান নিয়েছিলাম। সে বছর সব খরচ বাদে মুনাফা হয়েছিল দেড় লাখ টাকার মতো। আমের দাম না থাকায় এবার আর তা হবে না বলেই মনে হচ্ছে। তার পরও আশায় আছি— দাম যদি কিছুটা বাড়ে।

রংপুর কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এবার রংপুর জেলায় ৩ হাজার ৫ হেক্টর জমিতে আমের ফলন হয়েছে। এর মধ্যে হাঁড়িভাঙ্গার আবাদ হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬০০ হেক্টরে। ফলনও ভালো হয়েছে। এ বছর হাঁড়িভাঙ্গার উৎপাদন আশা করা হচ্ছে ২০ হাজার টনের উপরে। গত বছর জেলায় এ জাতের আম পাওয়া গিয়েছিল ১৬ হাজার টনের কাছাকাছি।

উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আম উৎপাদন হয় মেহেরপুরেও। জেলায় এবার আমের ভালো ফলনের পরও দাম না পাওয়ায় লোকসানের আশঙ্কায় আছেন আমচাষী ও ব্যবসায়ীরা।

এখানকার আমচাষী ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত বছর প্রতি মণ আম ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হলেও এবার ১ হাজার ২০০ টাকার বেশি দাম পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতি বছর বাইরে থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে আম কিনতে এলেও এবার আসেননি। আম পাড়ার সময় প্রায় কাছাকাছি নির্ধারণ করায় সরবরাহ বেড়ে গেছে, যা আমের দাম আরো কমিয়ে দিচ্ছে।

মেহেরপুরের আমচাষী সিরাজুল ইসলাম বলেন, মেহেরপুর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম একই সঙ্গে রমজানে বাজারজাত করা হয়েছে। রমজানে এমনিতেই আমের চাহিদা তুলনামূলক কম থাকে। তার ওপর সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম অস্বাভাবিক কমে গেছে।

মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় ২ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে আমের বাগান রয়েছে। এ পরিমাণ বাগান থেকে উৎপাদন লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার টন।

দেশে সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত ফল এখন আম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রাক্কলিত হিসাব বলছে, এ সময় বাংলাদেশে আম উৎপাদনের পরিমাণ ছিল সাড়ে ১২ লাখ টন। এর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মৌসুমি ফলটির উৎপাদন ছিল ১১ লাখ ৬১ হাজার ৬৮৫ টন। তারও আগে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে আম উৎপাদন হয়েছিল ১০ লাখ টন। আম উৎপাদনে এ ঊর্ধ্বমুখিতার ধারা চলতি অর্থবছরেও বজায় থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চলতি অর্থবছর সব মিলিয়ে দেশে ১৩ লাখ টন আম উৎপাদন হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

আম উৎপাদনে কৃষককে ধরে রাখতে হলে সঠিক দাম নিশ্চিত করার বিকল্প নেই বলে মনে করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) সাবেক মহাপরিচালক ও হরটেক্স ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কৃষিবিদ মো. মনজুরুল হান্নান। তিনি বলেন, নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে ফলন বাড়াতে হবে। রফতানি শিল্পকে বিকশিত করতে হবে। মূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রে পাল্প শিল্পকে আরো বিকশিত করার সুযোগ দিতে হবে। এছাড়া আমের উৎপাদন ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায় আরো সচেতনতা বাড়াতে হবে। আমে ফরমালিন মেশানো নিয়ে যেসব ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে, সেগুলো দূর করতে হবে। কয়েক হাজার কোটি টাকার আমের বাজারে প্রক্রিয়াজাত ও বিপণনে জোর দিতে হবে। এখনই স্টোরেজ গড়ে তুলতে হবে আম উৎপাদনকারী জেলাগুলোয়।

উল্লেখ্য, শতাধিক প্রজাতির আম রয়েছে দেশে। এর মধ্যে ৪৫টির বেশি প্রজাতি টিকে আছে। জনপ্রিয়তায় সবচেয়ে এগিয়ে আছে ল্যাংড়া, ফজলি, ক্ষীরসাপাতি (গোপালভোগ), হিমসাগর, লক্ষ্মণভোগ, মোহনভোগ, গোপালভোগ, বোম্বাই জাত। এখন নতুন যোগ হয়েছে আ¤্রপালি ও মল্লিকা। দিনাজপুরের সূর্যপুরীও বিখ্যাত হচ্ছে। দেশে প্রায় ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে আমের উৎপাদন হলেও সবচেয়ে বেশি আবাদ হচ্ছে বৃহত্তর রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। এছাড়া সাতক্ষীরা, মেহেরপুর, রংপুর, দিনাজপুর জেলায়ও আমের আবাদ বেড়েছে।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ