প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারে বিড়ম্বনার শিকার গ্রাহকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক : সাভার ব্যাংক কলোনির বাসিন্দা সজীব সাহা কিছু দিন আগে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘হঠাৎ করেই মাঝ রাতে বিদ্যুৎ চলে যায়। এরপর ঘর অন্ধকার। প্রচণ্ড গরমে বাসার সবার ঘুম ভেঙে যায়। প্রিপেইড কার্ডে টাকা না থাকায় বিদ্যুতের লাইন বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু গভীর রাতে কার্ডে টাকা রিচার্জের কোনো সুযোগ নেই। তাই অন্ধকারেই পরিবারের সবাইকে সকালের অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে।’ তিনি আরো লিখেছেন, ‘আগে প্রতি মাসে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা বিদ্যুৎ বিল আসত। প্রিপেইড মিটার চালু হওয়ার পর এখন ৮০০ টাকায় ১২ দিন যায়। পুরো মাস শেষ হতে আগের চেয়ে তিনগুণ বেশি বিল দিতে হয়।’ খবর ভোরের কাগজ’র।

সাভারের অপর এক বাসিন্দা ফেরদৌস আহমেদ ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আগে ৩০০ টাকায় মাস চলে যেত। প্রিপেইড মিটারের পর গত মে মাসে ১৬ দিনে ১ হাজার টাকা চলে গেছে। বিদ্যুৎ এখন রক্তচোষার মতো, দেখা যায় না, বোঝা যায় না, মাঝখানে শুধু মাল (টাকা) চলে যায়।’ বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারে বিড়ম্বনার শিকার গ্রাহকরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এভাবেই তাদের ক্ষোভ ও কষ্টের কথা জানাচ্ছেন। এ ছাড়াও প্রিপেইড মিটার নিয়ে গ্রাহকদের ভোগান্তির শেষ নেই। অনেক এলাকাতেই ভোর রাতে ব্যাংকের সামনে লাইন ধরে টোকেন সংগ্রহ করতে হয়। তারপর আবার দুপুর ১২টার মধ্যে ব্যাংকে গিয়ে টাকা জমা দিতে হয়। এ সময়ের মধ্যে না গেলে ওই দিন আর টাকা জমা নেয়া হয় না। ফলে প্রিপেইড কার্ডের টাকা জমা দিতেই অনেক গ্রাহকের পুরো দিন চলে যায়।

খিলগাঁওয়ের নন্দীপাড়া এলাকার বাসিন্দা সাহিদুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, চরম একটি ভোগান্তি তৈরি করেছে বিদ্যুতের প্রিপেইড কার্ড। এই এলাকার বাসিন্দারা রোজার মাসে সেহরি খাওয়ার পরই আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের সামনে গিয়ে লাইন ধরতেন। তখন ব্যাংকের দারোয়ান তাদের একটি করে টোকেন দিতেন। পরবর্তীতে সকাল ১০টা থেকে এই টোকেন নিয়ে যারা ব্যাংকে উপস্থিত হতেন তারাই বিল দিতে পারতেন। টোকেন ছাড়া যারা গেছেন তারা বিল দেয়ার সুযোগ পাননি। পুরো রোজার মাসই এলাকার প্রিপেইড কার্ডে বিল পরিশোধকারী গ্রাহকদের একইভাবে ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে। বর্তমানেই একই পদ্ধতি চলছে।

শ্যামলী এলাকার বাসিন্দা শামসুল আলম অভিযোগ করেন, প্রিপেইডে কার্ডে বিদ্যুৎ বিল দেয়ার ভোগান্তির ব্যাপারে অভিযোগ করার কোনো জায়গা নেই। ঢাকা পাওয়ার ডিস্টিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) অফিসে গিয়েও অভিযোগ জানানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তারা কেউ অভিযোগ নেয়ার জন্য দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নন বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। কোথায় অভিযোগ নেয়া হয় তা জানেন না বলেও জানিয়েছেন।

ভুক্তভোগীদের সবারই অভিযোগ, বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির উদাসীনতার কারণেই গ্রাহকদের ভোগান্তি বেড়েছে। কোম্পানি গ্রাহকদের ওপর প্রিপেইড মিটার চাপিয়ে দিয়েছে। কিন্তু প্রিপেইড কার্ডের রিচার্জ করার প্রক্রিয়াটি সহজ করেনি। বিদ্যুৎ ব্যবহারের আগেই বিল দেয়ার ব্যবস্থা করে কোম্পানি লাভবান হচ্ছে, কিন্তু গ্রাহকদের অনেকেরই আগের চেয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণের বেশি টাকা গচ্চা দিচ্ছে। রিচার্জের জন্য সময় নষ্ট হচ্ছে। আবার কার্ড ফুরিয়ে যখন-তখন লাইন বন্ধ হওয়ার যন্ত্রণা তো আছেই।

ভোগান্তির শিকার গ্রাহকরা মনে করেন, মোবাইল ফোন রিচার্জের মতো বিদ্যুতের প্রিপেইড কার্ডের রিচার্জও সহজলভ্য করা উচিত। তা ছাড়া মোবাইলে অ্যাপসের মাধ্যমে বিল পরিশোধের ব্যবস্থাও থাকা দরকার। তাহলে গ্রাহকরা যে কোনো সময় মোবাইলের মাধ্যমেই বিল পরিশোধ করলে ভোগান্তি কমবে। তবে সবকিছুর আগে যে ব্যাংকগুলোকে বিদ্যুতের প্রিপেইড কার্ড রিচার্জের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, তাদের কার্যক্রম মনিটরিং করা উচিত। কিন্তু ডিপিডিসি তা করছে না।

জানা গেছে, চুরি ও লোকসান প্রতিরোধ, বিল দিতে গ্রাহকদের ভোগান্তি কমানো এবং বিদ্যুতের পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে গ্রাহকদের জন্য প্রিপেইড মিটার স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ইতোমধ্যেই রাজধানীর অনেক এলাকা প্রিপেইড মিটারের আওতায় এসেছে। প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করে অনেক গ্রাহকের অর্থও সাশ্রয় হচ্ছে। সেই সঙ্গে বন্ধ হয়েছে মিটার রিডারদের ধান্ধাবাজির সুযোগও।

কিন্তু এই প্রিপেইড মিটার নিয়ে অসন্তুষ্টিও কম নয়। কার্ড রিচার্জের দুর্ভোগ ছাড়াও কারিগরি ত্রুটি, অব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুৎ বিভাগের উদাসীনতার কারণে অনেক গ্রাহকই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। তা ছাড়া কয়েকটি কোম্পানি মিটার বিক্রি করার অনুমতি পেয়ে ফায়দা লুটছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। ছয়টি নির্দিষ্ট কোম্পানি ছাড়া অন্য কারো অনুমোদিত মিটার গ্রাহকরা কিনতে পারছে না। বিল পরিশোধের পাশাপাশি ভাড়াটিয়াদের ভ্যাট পরিশোধ করতে হচ্ছে। অথচ এই ভ্যাটের টাকা বাড়িওয়ালার দেয়ার কথা ছিল। তা ছাড়া মিটার স্থাপন করার পর কোনো ধরনের কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে তা মেরামত বা ত্রুটি সারানোর জন্য শুধু ডিপিডিসির লোকজনের এই মিটারে হাত দেয়ার নিয়ম রয়েছে। জরুরি মুহূর্তের বাইরের কোনো ইলেকট্রিশিয়ান নিয়ে মিটার খোলা যাবে না। তাহলেই মোটা অঙ্কের জরিমানা গুনতে হবে। আবার ডিপিডিসির লোকজনকে খবর দেয়ার পরও তারা আসতে গড়িমসি করেন। মিটার ঠিক করতে এলে তাদের মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হয়।

ডিপিডিসি সূত্রে জানা গেছে, প্রায় আড়াই লাখ গ্রাহককে এখন পর্যন্ত বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটার দেয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বিদ্যুতের সব মিটারকেই প্রিপেইডের আওতায় আনার কাজ চলছে। আগামী দিনগুলোতে প্রিপেইডের ব্যবহার আরো বাড়বে। বিল পরিশোধের জন্য ২৬টি ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তিও রয়েছে। এ ছাড়া ডিপিডিসির স্টেশনগুলোতেও বিল পরিশোধের ব্যবস্থা রয়েছে। বিল জমা নেয়ার রসিদ ডিপিডিসি থেকে সরবরাহ করা হয়। যদি কোনো ব্যাংকে ওই রিসিট না থাকে তাহলে ব্যাংক বিল নিতে পারে না। এ কারণে অনেকেই ব্যাংকে বিল পরিশোধ করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েন। তখন কিছুটা বিড়ম্বনার সৃষ্টি হয়। বিদ্যুৎ অফিসে বিল দিতে কোনো ঝামেলা নেই।

কিন্তু রাজধানীর আসাদগেট বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে দেখা যায়, গ্রাহকদের দীর্ঘ লাইন। একজন গ্রাহককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এখানে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে বিল পরিশোধ করতে হয়। এখানেও বিভিন্ন ব্যাংক ঘুরে বিল জমা দিতে আসা লোকজনের সঙ্গে কথা হয়। তারাও জানান, ব্যাংকে প্রিপেইড বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের মতো ঝামেলার কাজ আর দ্বিতীয়টি নেই।

এ ব্যাপারে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান বলেন, গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটার দেয়ার ফলে আমাদের সিস্টেম লস কমেছে। ভবিষ্যতে ঢাকায় বিদ্যুতের সব মিটার প্রিপেইড হয়ে যাবে। এখন কোনো কোনো জায়গায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে বলে শুনেছি। আমরা সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি। কোনো কাজ শুরু করতে গেলে কিছুটা সমস্যা হয়। আশা করছি কিছুদিন পরে এ ধরনের সমস্যা থাকবে না।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত