প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

তাদের কাছে ‘ঈদের আনন্দ’ নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক : সারাদেশের মানুষ যখন ঈদ উৎসব পালন করছেন তখন সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকার ‘বাঘ বিধবারা’ একমুঠো ভাতের জন্য সুন্দরবনের বিভিন্ন নদীতে মাছ শিকারে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তাদের কাছে ঈদের আনন্দ বলতে কিছু নেই।

এমনই একজন ‘বাঘ বিধবা’ হলেন শাহিদা বেগম। সুন্দরবনের কোলঘেষা মুন্সীগঞ্জ এলাকায় বাস করনে তিনি। কথা হয় শাহিদা বেগমের সঙ্গে । তিনি বলেন, ‘নদীতে মাছ না ধরলে দিন চলে না। একটা ছেলে আছে, সে কলেজে পড়ে। তার পড়াশুনার খরচ দিতে পারি না। সে আমার সঙ্গে নদীতে মাছ ধরে। দুজনের মাছ শিকারের টাকা দিয়ে কোনও রকম দিন কেটে যায়। তাও আবার প্রতিদিন মাছ পাওয়া যায় না। খাওয়া হয় না ঠিকমতো। ঈদে আনন্দ করবো কিভাবে?’

শাহিদা বেগম আরও বলেন, ‘পত্রিকায় নিউজ করে কী হবে? ছবি প্রকাশ হলে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও চেয়ারম্যান দুই একদিন খোঁজ খবর নেন। আগে একবার আমাকে নিয়ে নিউজ প্রকাশ করা হয়েছিল। ইউএনও সাহেব ৫ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। তা দিয়ে ঋণ শোধ করেছিলাম। তার পর আবার যা তাই।’

স্থানীয় সুন্দরবন গবেষক পিযূল বাউয়ালি পিন্টু বলেন, ‘সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় বর্তমানে প্রায় সাড়ে এগারশ ‘বাঘ বিধবা’ নারী মানবেতর জীবনযাপন করছেন। শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নে ২৮৫, বুড়িগোয়ালীনি ইউনিয়নে ৮১ ও মুন্সীগঞ্জে ১৪৩ জনসহ সুন্দরবনের কোলে প্রায় ১ হাজার ১৬০ জন ‘বাঘ বিধবা’ রয়েছেন।’ বাংলা ট্রিবিউন

তিনি বলেন, ‘সরকারি হিসাব অনুযায়ী ২০০৯ সালেই সুন্দরবনে গিয়ে মারা যান ১২০ জন। তবে স্থানীয়দের ভাষ্যমতে এ সংখ্যা আরও বেশি। যারা অবৈধভাবে সুন্দরবনে গিয়ে মারা যান তাদের নাম সরকারি খাতায় ওঠে না। ফলে স্বামীহারা বিধবার সংখ্যা আরও অনেক।’

বাওয়ালি পিন্টু বলেন, ‘এই এলাকার মানুষের ঠিকমতো খাওয়া হয় না। কেনাকাটা করবে কিভাবে? সকাল হলেই যাদের সুন্দরবনে যাওয়া অভ্যাস। সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল যাদের জীবন। তাদের কাছে কিসের আনন্দ। এই এলাকায় বসবারত সব ‘বাঘ বিধবা’ নারীদের একই দশা।’

গাবুরার নেবুবুনিয়া এলাকার আজিজুল ইসলাম নামে একজনের কাছে ঈদের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘কপোতাক্ষের মাঝখানে আমাগো ঈদ। নদীতে মাছ ধরে ঈদে ছেলেমেয়েদের কাপড় চোপড় কিনে দিতে হয়, বাজার ঘাট করতে হয়। সরকারিভাবে পোনা ধরা বন্ধ ঘোষণা করায় পাশের নদীতেও নামা যাচ্ছে না। মাঝেমধ্যে লুকিয়ে নদীতে যায় কিন্তু মাছ মেলে না।’

ঈদের আগে সরকারি সহায়তার (ভিজিএফ) কথা স্মরণ করিয়ে দিতেই পাশে বসা কচি বিবির সাফ জবাব, ‘দশ কেজি সেদ্ধ চালি কি আনন্দ করবো?। আমরা ত্রাণ চাইনে, আমাগো বাঁধ বেন্ধে (বেঁধে) দেও। তাহলি লবন পানি না ঢুকলি দুটো ফসল-পাতি ফলিয়ে আয় রোজগার করে ঈদ করতি পারবো। ছাওয়াল-মেয়েগো মুখি সেমাই-পায়েশ দিতি পারবো।’

এমন অবস্থা শুধু আজিজুল কিংবা কচি বিবির ক্ষেত্রে নয়। গোটা গাবুরা ইউনিয়নের জেলেপাড়াজুড়ে একই অবস্থা। ২০০৯ সালে আইলার পর থেকে কর্মসংস্থানের অভাবে উপকূলীয় এ এলাকার মানুষের জীবন হয়ে পড়েছে সুন্দরবন আর পাশের নদী নির্ভর। মুষ্টিমেয় উচ্চবিত্তের বাইরে গোটা এলাকার মানুষ এখন পেশাসূত্রে জেলে পরিচয়ে পরিচিত। ইউনিয়নের নাপিতখালী থেকে চাঁদনীমুখা, আর ডুমুরিয়া থেকে গাগড়ামারী গোটা এলাকা এখন জেলেপল্লি। ওপারের সুন্দরবনে ডাকাতের উপদ্রব থাকায় প্রায় সাড়ে সাত হাজার পরিবারের একমাত্র আয় আসে মাছ শিকার থেকে। তাই নদীতে মাছের স্বল্পতা এবং দারিদ্রের সঙ্গে মিলিয়ে চলছে তাদের নিত্য জীবন।

এদিকে বৃহস্পতিবার সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলায় খোলপেটুয়া নদীর বেড়িবাঁধ ভাঙনের সঙ্গে ম্লান হয়ে গেছে ওই এলাকার মানুষের ঈদের আনন্দ। এসব এলাকার অধিকাংশ মানুষ খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন। এদের কপালেও নেই ঈদের আনন্দ।

শ্যামনগর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সেলিম খান জানান, গাবুরার সুবিধা বঞ্চিত মানুষের জন্য মাথাপিছু ১০ কেজি করে মোট আট হাজার দুইশ পরিবারের জন্য ভিজিএফ’র চাল বিতরণ করা হয়েছে।

স্থানীয় গাবুরা ইউপি চেয়ারম্যান জিএম মাসুদুল আলম বলেন, ‘আইলার পর সরকারি বেসরকারি সহায়তা থাকায় ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও ঈদে কিছুটা হলেও আনন্দ ছিল। কিন্তু গত চার-পাঁচ বছরে সাহায্য সহযোগীতা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এলাকার মানুষের প্রতিটি দিন কাটে নদীর উপর নির্ভর করে।’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত