প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভাগ্যাহত কোরআন পাখিদের হৃদয়ের কান্না

আমিনুল ইসলাম হুসাইনী: রমজানের চাঁদ উদিত হওয়ার সাথে সাথে কোরআনের গুনগুন কোরাসে গুঞ্জরিত হতে থাকে পৃথিবীর প্রতিটি পাড়া। তরঙ্গিত হতে থাকে ঐশ্বরিক মোহনায়। এই মোহনায় সবচেয়ে বেশি যারা মাধুর্য্য ঢালেন, তারা হলেন হাফেজে কোরআন। রমজানের প্রথম তারাবিহ থেকেই শুরু হয় তাদের এই উচ্চাঙ্গগীত। তাদের একে অপরের তিলাওয়াত করা ও শোনার মুগ্ধতায় কল্পনার পর্দায় ভেসে ওঠে সেই নূরাণী দৃশ্য। মাহে রমজান এলে কোরআনের পাখি তথা হাফেজে কোরআনদের তেলাওয়াতের সুমধুর আওয়াজে মসজিদগুলো হয়ে ওঠে অধিকতর প্রাণবন্ত। মুমিন অন্তরে সৃষ্টি হয় তাকওয়ার আবহ। হাফেজে কোরআনগণও খতমে তারাবিহতে মুসল্লিদের কোরআন শুনিয়ে প্রশান্তিতে মন ভরিয়ে নেন। তবে যে সকল হাফেজে কোরআনগণ কারণবশত তারাবিহ পড়াতে পারছেন না, তাদের মনের গহীনে যে কষ্ট, তা ভাষায় বর্ণনা করা অসম্ভব। তাদের মনের দীঘিতে যেই বেদনার ঢেউ, সেই ঢেউ অগোচরে বেরিয়ে আসে সলিল হয়ে। এমনই ক’জন বেদনা বিদূরিত, ভাগ্যহত হাফেজে কোরআনদের কথা তোলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে এই লিখনীতে। তাদের তপ্তাশ্রুতে হয় তো আপনাদের চোখও ভিজে ওঠতে পারে বারবার।

হাফেজ মুহাম্মদ সাদেকুল ইসলাম
হাফেজ সাদেকুল ইসলাম। বর্তমানে কসবা নুরুল কোরআন হাফিজিয়া মাদরসার প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম। শিক্ষকতার জীবনে গড়ে তোলেছেন শতাধিক হাফেজে কোরআন। যারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে ভূষিত। টানা ২১ বছর খতমে তারাবিহ পড়িয়েছেন। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে গত দুইবছর পড়াতে পারছেন না। এই না পাড়ায় তাঁর মনের বাতিঘরে জমেছে আক্ষেপের আঁধার। তিনি বলেন, ‘রমজানে তারাবিহ উপলক্ষ্যে যে পরিমাণ তেলাওয়াত হয় তা অন্য সময় হয় না। হাদিসে এসেছে ‘যে ব্যক্তি কোরআন শরীফের কোনো একটি হরফ পাঠ করবে, তার জন্য দশটি সওয়াব’। রমজান মাসে তো এই সওয়াব সত্তরগুণে বৃদ্ধি হয়। কিন্তু আফসোস, এই দুবছর তারাবিহ না পড়নোতে এতো এতো নেকি থেকে মাহরুম থাকছি। তাছাড়া একজন হাফেজে কোরআনের স্বার্থকতা তো তখনই, যখন সে তারাবিহ’র মুসল্লিদের এক খতম কোরআন শোনায়। এই শোনানোতে হাফেজে কোরআনদের কাছে যে সুখ অনুভূত হয়, সে সুখ তুলনাহীন।

হাফেজ মাওলানা জমির উদ্দীন
তিনি ঢাকার ‘জামিয়া আম্বরশাহ আল ইসলামিয়া কাওরানবাজার’ মাদরাসায় কিতাব বিভাগে শিক্ষকতা করেন। টানা ১১ বছর গ্রাম এবং শহরের বিভিন্ন মসজিদে তারাবিহ পড়িয়ে মুসুল্লিদের মুগ্ধ করেছেন সুললিত তিলাওয়াতে। কোরআনের সাবলিল গতিচ্ছন্দে তিনি যেমন মুসল্লিদের দোলায়িত করতেন, তেমনি নিজেও কোরআনের আধ্যাত্মিকতা, আত্মশুদ্ধি আর আত্মোৎকর্ষতায় পুলকিত হতেন। কিন্তু গত তিন বছর যাবত সেই চেনা ভালোলাগা থেকে দূরেই সরে আছেন তিনি। এর কারণ মাদরাসার দায়িত্ব। রমজান এলেই তার কাধে ন্যস্ত করা হয় দায়িত্বের বোঝা। তাই তারাবিহ পড়ানো হয়ে ওঠে না আর। এই না পড়ানোর অতৃপ্তি প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘নিজে তারাবিহ পড়িয়ে যে তৃপ্তি পাওয়া যায়, তাকি আর অন্যের পেছনে জুটে’? অন্যের পেছনে তারাবিহ পড়লে মনে হয় সব কিছুই ঠিক আছে, কিন্তু তারপরও কী যেন নেই। একটা শূন্যতা এসে জাপটে ধরে। তিনি তারাবিহ না পড়ালেও নিয়মিত তিলাওয়াত করছেন বলে জানিয়েছেন।

হাফেজ মুহাম্মদ শরীফুল ইসলাম
বর্তমানে ‘জামিয়া কাওমী মাদরাসা হাজিগঞ্জ, চাঁদপুর’ এ জালালাইন পড়ছেন। তিনি বিগত ৭ বছর তারাবিহ পড়িয়েছেন নিজ জেলার বিভিন্ন মসজিদে। সর্বশেষ তারাবিহ পড়িয়েছেন ২০১৬ সালে। তার মানে গত দুবছর যাবত তিনি খতমে তারাবিহ পড়ানো থেকে বিরত আছেন। তার এই বিরত থাকার কারণ বাবার অসুস্থতা এবং পারিবারিক কিছু জটিলতা। গত দুই বছর তারাবিহ না পড়াতে পারায় তার মনেও জমে আছে কষ্টের কালো মেঘ। গাঢ় হয়েছে অতৃপ্তির দীর্ঘ শ্বাস। বিগত তারাবিহ’র অনুভূতি জানতে চায়লে তনি বলেন, ‘সারা বছর রমজানের অপেক্ষায় থাকতাম। কারণ রমজান এলেই মনে উৎফল্লতা এসে ভীড় জমাতো। নামাজে দাঁড়িয়ে কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে যে একটা ভালোলাগার আবহ বা স্বাদ পাওয়া যেত, তা আর অন্য কিছুতে পাওয়া যেত না। তাই অপেক্ষা থাকতাম কখন রমজান আসবে’। অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাইলে তিনি এক অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতার কথা শোনান। তিনি বলেন, ‘সাত বছর তারাবীহ পড়িয়ে এবং বন্ধুদের থেকে জেনে অভিজ্ঞতার ঝুঁড়িতে যে সব অভিজ্ঞতা হয়েছে তন্মধ্যে কিছু অপ্রিয় সত্য হলো কিছু কিছু হাফেজরা তারাবিহ শুরু করার আগে বলে যে, ভুল হলে যেন লোকমা না দেই। আর বেশিরভাগ এমন করেন হাফেজ সাহেব যদি এলাকার বা মসজিদের ইমাম-খতিব হয়। এটা অত্যান্ত গর্হিত কাজ বলেই মনে করি’।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত