প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ইরানি অধ্যাপক সাদেঘ জিবাকালাম ও উদার চিন্তাবিদদের রহস্য

রাশিদ রিয়াজ : ইরানের তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাদেঘ জিবাকালাম মনে করছেন উদার চিন্তাবিদরা এখনো ইরানে গণতন্ত্র সম্পর্কে আশাবাদী। তাহলে ইরানে কি গণতন্ত্র নেই? নিয়মিত নির্বাচন ও ভোটারদের প্রত্যক্ষ ভোটে ইরানের সরকার পরিবর্তন হয়ে আসছে কিভাবে? বাকস্বাধীনতা না থাকলে তিনি জার্মানির বনে গিয়ে গ্লোবাল মিডিয়া ফোরামে বক্তব্য রাখার সুযোগ পেলেন কিভাবে? মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে গণতন্ত্র চর্চা, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোট দেয়ার সুযোগ বা নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে ক্ষমতার পালাবদল আশাই করা যায় না। এ নিয়ে পশ্চিমা মিডিয়া খুব একটা রা করে না, পশ্চিমা শাসকরা নন। সেদিক থেকে ইরান এজন্যে রোল মডেল যে দেশটিতে নিয়মিত নির্বাচন হচ্ছে। তারপর পশ্চিমা মিডিয়া ও শাসকরা ইরানে রেজিম চেঞ্জ প্রকল্প বাস্তবায়নে যে তৎপর তাও ওপেন সিক্রেট।

ইরানের অধ্যাপক সাদেঘ জিবাকালাম এবছর ডয়েস ভেলে ফ্রিডম অব স্পিস এ্যাওয়ার্ড পেলেন। তিনি বলছেন ইরানকে আরো আধুনিক ও গণতান্ত্রিক হিসেবে গড়ে তুলতে আন্দোলন চলছে। অধ্যাপক জিবাকালাম অবশ্য ইরানে শাহের আমলে রাজনৈতিক উন্নয়ন যে হয়নি তা স্বীকার করেছেন। এও বলেছেন, বিপ্লবের আগে যেখানে কোনো স্বাধীন সংবাদপত্র, রেডিও বা টেলিভিশন ছিল না কিন্তু এখন তা ইরানে আছে এবং তা স্বাধীন বলা যায়। জার্মানির এআরডি’র ফরেইন করেসপন্ডেন্ট রেইনহার্ড বামগার্টেন বলেছেন, ইরানের রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটকে চমৎকারভাবে বুঝে ওঠার জন্যে ইসলামি বিপ্লবের সমর্থক ও বিরোধী দুই পক্ষই তার বিরোধিতা করছে। তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে জিবাকালাম কোন পক্ষে?

এই ডয়েস ভেলে’কে জিবাকালাম বলেছিলেন, ইরানে যে সরকার বিরোধি আন্দোলন চলছে তার কারণ দেশটিতেই নিহিত এবং এর পেছনে বাইরের কোনো ইন্ধন নেই। অথচ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের টুইটে তিনি ইরান সম্পর্কে বলেছেন, ‘ইরানের জনগণ চূড়ান্তভাবে নৃশংস ও দুর্নীতিপরায়ন শাসকের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। প্রেসিডেন্ট ওবামা যে অর্থ বোকামির সাথে তাদের পেছনে ঢেলেছেন তা সন্ত্রাসে ও তাদের পকেটে গিয়েছে। মানুষগুলো খাবার পাচ্ছে কম, অধিক মুদ্রাস্ফীতি রয়েছে এবং কোনো মানবাধিকার নেই। আমেরিকা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে’। ট্রাম্পের এহেন বক্তব্য থেকে এটা পরিস্কার বিভিন্ন দেশে রেজিম চেঞ্জ বা শাসক পরিবর্তনে তারা টাকা ঢালেন। ইরানেও ঢালছেন। ইরান আন্তর্জাতিক মতের প্রতি আস্থা রেখেই তো জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ৬ জাতি পারমানবিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে এবং সে চুক্তি থেকে সরে এসে ট্রাম্প দেশটিকে ভীষণ এক ষড়যন্ত্রে ও বিশ্বে একঘরে করার চেষ্টা করছেন। তো এহেন ট্রাম্পের এধরনের বক্তব্য সম্পর্কে ইরানি অধ্যাপক জিবাকালাম কি বলবেন? ইরানের জনগণের জন্যে যদি এত দয়া মার্কিনিদের তাহলে দেশটির ওপর যুগ যুগ ধরে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে রাখার অর্থ কি? বিশৃংখলার পাশাপাশি সরকারকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে ফেলা নয় কি? জিবালকাম নিজেও তার বক্তব্যে বলেছেন, এধরনের অবরোধের কামড় সহ্য করতে হচ্ছে ইরানের সাধারণ জনগণকে। এজন্যেই ইরানের আদালত জিবাকালামের বিরুদ্ধে দেশটিতে আন্দোলনকারীদের পেছনে বিদেশি শক্তি নেই এমন বক্তব্যকে রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে অভিযুক্ত করেছে। তার বক্তব্যকে মিথ্যা তথ্য হিসেবে এবং ইরানের বিরুদ্ধে প্রপাগা-া হিসেবে বিবেচনা করেছে। তিনি যাতে এধরনের বিতর্কিত বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে না দেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এটিকে যদি বাকস্বাধীনতার সঙ্গে তুলনা করা হয় তাহলে তো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে বলছেন, তার দেশের মিডিয়া আমেরিকার সবচেয়ে বড় শত্রু এবং ফেক নিউজ তার দেশের সবচেয়ে ক্ষতি করছে, এহেন বক্তব্যের পর কি বলা ঠিক হবে যে যুক্তরাষ্ট্রে বাকস্বাধীনতা নেই।

লক্ষ্য করার মত ব্যাপার হচ্ছে, ডয়েচে ভেলের পরিচালক পিটার লিমবর্গ বলেছেন, অধ্যাপক জিবাকালামের দিকে তারা গভীর দৃষ্টি ও সমর্থন অব্যাহত রাখছেন। তেহরানের শাসনকে একনায়কত্বের সঙ্গে তুলনা করেছেন তিনি। তাহলে জিবাকালামের বিরুদ্ধে ইরানের আদালত ২০১৪ সালে রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে আদালতের বিচারক সালাভাতি তাকে ১৮ মাস কারাদ- দেওয়ার পর তা কমিয়ে জরিমানায় সীমাবদ্ধ হয় কিভাবে? সাধারণত একনায়কতন্ত্রের সরকার নিষ্ঠুর ধরনের আচরণ করে থাকে। জিবাকালাম সহজেই তার বিরুদ্ধে রায়ে আপিলের সিদ্ধান্তও নিতে পেরেছেন। গত জানুয়ারি মাসে তিনি ডয়েস ভেলেকে আরো বলেন, ইরানের শাসনব্যবস্থা নিয়ে আন্দোলনকারীরা চরম হতাশ। যদি ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একটি গণভোট হয় তাহলে ৭০ শতাংশ মানুষ ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে না বলবে। সহজেই প্রশ্ন ওঠে কোন ধরনের গণভোটের কথা বলছেন জিবাকালাম? গত নির্বাচনে অপেক্ষাকৃত তরুণদের ভোটেই তো দ্বিতীয়বারের মত জয়লাভ করেছেন প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি। রুহানি তৃতীয়বারের মত প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচন করতে পারবেন না। ইরানের শহর ও গ্রামের স্থানীয় নির্বাচনগুলো নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। কোনো নির্বাচন বাতিল হয়নি। ধর্মীয় নেতারা নির্বাচনী ব্যবস্থায় কোনো ক্ষমতা চর্চার সুযোগ পান না। প্রেসিডেন্ট ও মন্ত্রিপরিষদ বা সর্বোপরি সংসদ ইরানের ক্ষমতাকে পরিচালিত করার পাশাপাশি ধর্মীয় নেতারা নীতিনির্ধারনী ভূমিকা রাখেন মাত্র। বিচার বিভাগ পূর্ণ স্বাধীন। হ্যা পশ্চিমাদের কাছে ইরানের গণতন্ত্র ও ইসলামী অভিভাবকের উপাদানকে এক জটিল ও অস্বাভাবিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা বলে ভ্রম মনে হতে পারে তাই বলে অধ্যাপক জিবাকালাম কিভাবে ইরানে কোনো নির্বাচনী ব্যবস্থাই দেখতে পাচ্ছেন না কেন তা বোঝা মুস্কিল। তিনি তার বই মোকাদ্দামি বার ইনকিলাব-ই ইসলামি বা ‘এ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ইসলামিক রিভোলিউশন’ বইতে পাঠকের জন্যে সব ধরনের ষড়যন্ত্র তত্¦ ও পাহলবি শাসনের নীতি সম্পর্কে প্রচরিত জনপ্রিয় কাহিনী ও ইরানের বিপ্লবের মূল কারণগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন। জিবাকালাম তার বইতে লিখেছেন, ‘ তুমি যদি ইরান সম্পর্কে জানতে চাও তাহলে ইরানের শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িতদের কাছ থেকে সাহায্য নিতে হবে। তা করতে যেয়ে তুমি পশ্চিমা বা রাজনৈতিক প্রবাসীদের কাছে নিজেকে সীমাবদ্ধ করে ফেল না। আমি বলছি না ইরানের শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরাই ভাল জানে, এটা ঠিক প্রত্যেকের একটা বিশেষ দৃষ্টিকোণ ও একটি নির্দিষ্ট পক্ষপাত আছে, যদি তুমি কোনো সমস্যা বুঝতে চাও তাহলে যতটা সম্ভব বিভিন্ন মতামতের দিকে তাকাও। আবার বলছি কোনো তথ্যই পুরোপুরি সত্য কিংবা পুরোপুরি মিথ্যা নাও হতে পারে…

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি বলেছেন, তার দেশে বিশৃংখলা সৃষ্টির জন্যে অর্থ, অস্ত্র, রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা বৃত্তি থেকে শুরু করে সবধরনের অপচেষ্টা চলছে যার লক্ষ্য হচ্ছে ইসলামি ইরানের স্থিতিশীলতাকে বিনষ্ট করা। দি গার্ডিয়ান পত্রিকার কাছে অধ্যাপক জিবাকালাম নিজেকে ইসলামি ইরানের বিরোধী নন বলে দাবি করে এর আগে বলেন, মাসের পর মাস তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্যে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। অথচ ২০১৪ সালে তিনি ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়ে বলেন, যেহেতু জাতিসংঘ ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছে তাই তিনিও ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেন। তার এ বক্তব্যকে ইরানের নাগরিকরা চ্যালেঞ্জ করে বসে কারণ ইরান কখনো ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করে না। ইরানের কোনো নাগরিক যদি ইসরায়েলকে স্বীকার কিংবা ইসরায়েল ভ্রমণ করে তাহলে তার ৫ বছর কারাদ- হওয়ার বিধান আছে। এবং তা জেনেও কেন জিবাকালাম ইসলায়েলকে স্বীকৃতি দিলেন, তাহলে তিনি কি বিভ্রান্ত নাকি অন্যকে বিভ্রান্ত করছেন। ফেসবুকে তার অনুসারীর সংখ্যা ৩ লাখ ৭০ হাজার এবং তারাও যদি বিভ্রান্ত হন তাহলে তা বিশৃংখলা সৃষ্টির উপাদান হতে বাধ্য। যদিও এজন্যে তাকে ইরানে জেল খাটতে হয়নি, তবে তাকে ৫৯০ পাউন্ড জরিমানা দেওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়, ইরানের পারমানবিক কর্মসূচি নিয়ে প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির কাছে খোলা চিঠিতে মতামত দেওয়ার জন্যে। এ প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক ২০০০ সালে যখন অধ্যাপক জিবাকালাম জানজানে ইসলামিক আজাদ ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা করতেন তখন তিনি সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্যে আবেদন জানান কিন্তু সে আবেদন ইরানের অভিভাবক পরিষদ যথেষ্ট যোগ্যতা না দেখে গ্রহণ করেনি। এটাই কি অধ্যাপক জিবাকালামকে ইরান সম্পর্কে বিভ্রান্ত হতে কোনো ভূমিকা রেখেছে। তিনি তো রাজনৈতিকভাবে বন্দি, গৃহবন্দি ও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলছেন, প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিকে পত্র লিখছেন, তারপরও আমাদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় ইরানে বাকস্বাধীনতা নেই।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত