প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে কর্তাদের কি কোনো বোধদয় হচ্ছে?

অ্যাড. তৈমূর আলম খন্দকার: বাংলাদেশ এবং এর জাতিসত্বা একইসঙ্গে এর রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে অনেক কথা দীর্ঘ দিনের। কোনো কোনো ইতিহাসবিদদের মতে, বঙ্গোপসাগর থেকে জেগে উঠা বিরাট চর অর্থাৎ ব-দ্বীপের অংশই বর্তমান বাংলাদেশ। একটি ভ‚-খণ্ড, সাগরের বুক চিরে দ্বীপ জাগতে পারে, কিন্তু একটি জাতি শুধুমাত্র ভ‚-খণ্ড ভিত্তিক গড়ে উঠে না। একটি ভ‚-খণ্ড ও একটি জাতিস্বত্বা নিয়েই একটি জাতি প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতিস্বত্বার নিজস্ব সংস্কৃতি যথেষ্ট গুরুত্ব লাভ করলেও স্বত্বাটাই জাতির মূল পরিচয়। বিভিন্ন গোষ্ঠী, জাতি, উপজাতির বিভিন্ন সংস্কৃতি থাকতে পারে, কিন্তু এক ও অভিন্ন স্বত্বা না হলে একটি জাতি গঠিত হয় না, যদিও কাগজে-কলমে একটি জাতি গড়ে উঠতে পারে, কিন্তু তাতে জাতিস্বত্বার চেতনা পরিস্ফুটিত হয় না।

বাঙালির বীরত্বগাঁথা অনেক ইতিহাস (যেমন-ফকির ও কৃষক বিদ্রোহ, ফরায়েজী ও জিহাদ আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ প্রভৃতি) রয়েছে। কিন্তু সার্বিক ইতিহাস কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যক্তি বিশেষ বাঙালির কর্মকাণ্ড জাতীয়তাবাদের পক্ষে নয় বরং বিশ্বাস ঘাতকতার নজির খুবই নোংরা এবং মুষ্টিমেয় বিশ্বাস ঘাতকদের নিকট গোটা জাতি বিভিন্ন সময়ে বিপর্যস্ত হয়েছে। অবশ্যই স্বীকার করতে হবে শুধু বাঙালি বা বাংলার ক্ষেত্রে নয়, বিশ্ব ইতিহাসে ঈমানদারের চেয়ে বেঈমানের সংখ্যা বেশি, বিশ্বস্থতার পরিবর্তে বিশ্বাস ঘাতকদের ঘটনা ঘটেছে অনেক, ত্যাগীর চেয়ে স্বার্থবাদী ও সুবিধা ভোগীদের সব সময়ই জয়ই হয়েছে বেশি, তবে সব জয়ই সম্মানের নয়। যেমন- মীর জাফরের হাতে সিরাজউদ্দৌল্লার পরাজয়ে মীর জাফর কলঙ্কিত হয়েছে, সম্মানিত হয়নি। কারবালার প্রান্তরে ইয়াজিদের হাতে হযরত হোসাইন(রা.) পরাজয়ে বিশ্ব মুসলমানদের নিকট তিনি সম্মানিত হয়েছেন। বাংলাকে শাসন করেছে হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান এবং মুসলমানরা। যার যার নিজস্ব একটি সংস্কৃতি ছিল। কিন্তু বর্তমানে চলছে ধার্মিক ও ধর্মনিরপেক্ষতা নামান্তরে অপসংস্কৃতি। ধর্ম নিরপেক্ষতার গান গাইতে গাইতে যখন ধার্মিকদের ‘বিশ্বাসের’ চাদরে হাত পড়ে যায় তখনই দেখা দেয় মত বিরোধ। তবে ধার্মিকরা এখন কোণ্ঠাসা হয়ে পড়েছে। কারণ ধর্মের কথা বলতে গেলেই বলা হয় সম্প্রদায়িক।

সাম্প্রদায়িকতাকে ইসলাম প্র¯্রয় দেয় না। সাম্প্রদায়িক রাজনীতিও এদেশের মানুষ মেনে নেবে না। ইসলাম নিজেই একটি অসাম্প্রদায়িক ধর্ম। শুধুমাত্র ধর্মীয় কারণে কাউকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার রেকর্ড ইসলাম ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা হযরত মুহাম্মদ (সা.) জীবনীতে পাওয়া যায় না। অথচ যারা ইসলাম ধর্ম নিয়ে কথা বলে তাদের সম্প্রদায়িক খেতাব দেওয়া হয়। ‘ধর্ম’ কোনো কারণেই কাউকে নির্যাতনের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার হতে পারে না, এটাই আমার দৃঢ় বিশ্বাস। ধর্মকে বাদ দিয়ে বা উপহাস করে যারা সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠাতা করতে চায় এটা তাদের মায়া কান্না ছাড়া আর কিছুই নয়। ধর্মই মানুষের জীবনের প্রধান সংস্কৃতি।

ভারতের পশ্চিবঙ্গে বাংলাদেশের অর্থে ভবন গড়ে উঠুক বা কারও কপালে ভাগ্য ফোটা দেওয়া হোক তাতে দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে মানুষকে সরানো যাবে না বা নতুন করে কোনো দেশ থেকে আমদানিকৃত সংস্কৃতিকে চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। এ দেশের রাজনীতিবিদদের মনে রাখতে হবে, মুক্তিযুদ্ধ এ দেশের একটি মাইল ফলক, ফলে যারা মনে মনেও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চেতনাকে লালন করেন, তাদের জনগণ গ্রহণ করবে না। অন্যদিকে জোর করে শাসন ক্ষমতায় থাকার জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করার ছদ্মাবরণে যারা চেতনা বিরোধী কাজ করে এক দলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করছে, দেশ লুটে খাচ্ছে, বাকস্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকার হরণসহ প্রতিপক্ষকে পুলিশি হয়রানী করে বিপর্যস্থ করছে তারাও জনগণের সমর্থন ও শ্রদ্ধা হারাচ্ছে। তবে এখন মানুষ প্রতিবাদ করতে পারছে না। যেমনটি পারেনি বৃটিশ ও পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে। কিন্তু যখন বাঙালি স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বোচ্চার হয়েছে তখন কেউই রেহাই পায়নি।

এই সেই বাংলাদেশ যেখানে দুজন রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক খুন হয়েছেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি (এরশাদ/মোশতাক) কারাবন্দী হয়েছিলেন। বর্তমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীদ্বয়ও জেল খেটেছেন। অবসরপ্রাপ্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীদের পুলিশ পেটায় (বাবর, মতিন চৌধুরী, মো. নাসিম)। ধমকের মুখে চাকরিরত অবস্থায় প্রধান বিচারপতির দেশ ছেড়ে পলাতে হয়। সাবেক প্রধান সেনাপতি আমেরিকায় দৌড়াচ্ছেন, সাবেক প্রধান উপদেষ্টাকে জানাজার নামাজ থেকে জনতার রোষানলে পড়ে পালাতে হয়। এ সব দেখার পরও ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী মনে করে বিরোধীদের উপর যারা নিপীড়ন করে যাচ্ছে তাদের (বর্তমান শাসকদের) ভাগ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে কি কর্তা ব্যক্তিত্বের কোনো বোধদয় হচ্ছে? একটু সর্তকতা বোধ কি তাদের মধ্যে কাজ করছে না? তাই সময় ফুড়ানোর পূর্বেই অবচেতন মন বলে ‘সাধু সাবধান’!
লেখক : কলামিস্ট ও আইনজীবী
ঃধরসঁৎধষধসশযধহফধশবৎ@মসধরষ.পড়স

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত