প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ট্র্যাফিক জ্যাম এবং মান্যতার সংস্কৃতি

মেজর ডা. খোশরোজ সামাদ:

১। স্কুল পাঠ্যসূচীতে একটি ট্রান্সলেশন প্রায়ই থাকতো ,’ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগী মারা গেল’। এটা পড়ে কিশোর মনে এমনই ধারণা হত যে, , তাবৎ ডাক্তার প্রজাতি এতটাই সময় জ্ঞান এবং কর্তব্যবোধ রহিত যে, অন্তত মুমূর্ষু রোগীর কাছেও সময়মত পৌঁছে না । ফলে তার মাশুল হিসেবে রোগীকে প্রাণ পর্যন্ত দিতে হচ্ছে । সময়ের বিবর্তনে রাজধানীর ট্রাফিকজ্যামের ক্ষেত্রে ‘ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগী মারা গেল’ কথাটি অহরহই প্রযোজ্য হয়ে গেল । এখন মৃত্যু পথযাত্রী রোগীকে হাসপাতালে নেয়ার পথে এম্বুলেন্সের শত সাইরেন বাজানো সত্তে¡ও সাইড দেয়া হয় না । ফলে ডাক্তার যখন রোগীর কাছে পৌঁছায় তখন যমরাজ যা করার কথা সেটি আগেই করে গেছে ।

২। যে কোন রাজধানীবাসীকে যদি জিগ্যেস করা হয় তার দৈনন্দিন জীবনের প্রথম সমস্যা কোনটি ? সবাই এক বাক্যে উচ্চারণ করবে ‘ট্রাফিক জ্যাম’ । এই ট্রাফিক জ্যামের কারণে প্রতিদিন যে কত কোটি টাকা ‘সিস্টেম লস’ হচ্ছে তার হিসেব হয়ত অর্থনীতিবিদদের কাছে আছে । কিন্তু রাজধানীবাসীকে ট্রাফিক জ্যামে পরে নিত্য হাজারো কষ্ট পোহাতে হচ্ছে । এই ট্রাফিক জ্যামের শিকার নিম্ন আয়ের নারী গার্মেন্টস কর্মী, ছাত্র , রিকশাওয়ালাসহ নানা শ্রেণীর শ্রমজীবি মানুষ, নিম্নবিত্ত মধ্যবিত্ত এমনকি ধনাঢ্য ব্যক্তিরা। কেরানীগিরি যিনি করেন তার মত আপাতভাবে ক্ষমতাহীন মানুষ থেকে ‘প্রটোকল পাওয়া বিশেষ কর্মকর্তা’ কেউই এর যন্ত্রণা এবং করাল থাবা থেকে মুক্ত নন ।

৩। আমাদের অর্থনীতির অন্যতম বুনিয়াদ গার্মেন্টস খাত । সকাল নয়টায় যদি গার্মেন্টসের চাকা সচঁল হয় তবে ঠিক সময় ফ্যাক্টরিতে পৌঁছুনের জন্য গার্মেন্টস কর্মিকে ‘ব্যাক ক্যালকুলেশন’ করতে হয় । যেহেতু তাঁরা নিম্ন আয়ের মানুষ লোকাল বাসই তাদের একমাত্র সম্বল । যেখান থেকে তিনি যাত্রা শুরু করেন এবং যে গন্তব্যে তিনি পৌঁছুবেন তার দূরত্ব ১০ কিলোমিটার হলে গন্তব্যে পৌছুতে তার খুব বেশী হলে আধা ঘণ্টা লাগবার কথা । কিন্তু,‘অফিস আওয়ারের পিক টাইমে’ বাদুর ঝোলা হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সম্ভাব্য সময়ের দ্বিগুণ, তিনগুন বা তারও বেশি সময় লেগে যায় । মিনিট কয়েক দেরী হলেই তার বেতন কাটা যাবে । তাই তার যাত্রা শুরুর প্রাক প্রস্তুতির জন্য স্বামী-সন্তানের নাস্তা বানানো ,হেঁসেল ঠেলা, অফিসের যাবার পোশাক পরা ইত্যাদি ইত্যাদি করবার জন্য মাঝরাতে তাকে উঠতে হয় । আবার অফিস আওয়ারের পিক টাইমে ভয়াবহ ট্রাফিক জ্যামে ঠেলে বাসায় পৌঁছুতে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত ছুঁয়ে যায় । সারাদিনের অমানুষিক শ্রমের শেষে তাকে আবার রান্নাঘরে ঢুকতে হয় । রাতে বিশ্রামের যথেষ্ট সময় তার জোটে না । এমন করে তার কাটে একদিন, দুইদিন, বছরের পর বছর ।

৪। ট্রাফিক জ্যাম একদিনে এমন ভয়াবহ হয় নি। দুইযুগ আগেও এটা সহনীয় পর্যায়ে ছিল। অপরিকল্পিত নগরায়ন, আবাসিক এলাকায় অনুমোদনহীন অফিস-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দোকানপাট, ‘ছয়তলার অনুমোদনে নয়তলা’ জাতীয় স্থাপনা, খেলার মাঠ দখল করে হাইরাইজ নির্মাণ, মান্ধাতা আমলের ট্রাফিক ব্যবস্থা, পাতাল রেলটিউব জাতীয় পরিবহন না থাকা প্রাইভেট কারের সংখ্যাধিক্য, আন্তসিটি নির্ভর যোগ্য পরিবহন ব্যবস্থা না থাকা ইত্যাদি ইত্যাদি অসংখ্য কারণ শুধু নগর পরিকল্পনাবিদেরাই নয়, আমাদের মত ‘ম্যাঙ্গো পাবলিকরা’ দিব্যি বুঝতে পারি । এই ট্রাফিক জ্যাম মূলত আমাদেরই সৃষ্টি এবং সমাধান করতে গেলে আমাদেরই এগিয়ে আসতে হবে ।

৫। ট্রাফিক জ্যাম বর্তমান বাস্তবতায় পুরোপুরি সমাধান করা হয়ত সম্ভব নয় । তবে সদিচ্ছা, নিজের আপাত লাভ, সর্বোপরি ‘মান্যতার সংস্কৃতি’ এটাকে অনেকটাই সহনীয় মাত্রায় আনতে পারে । যেসব হাইরাইজ যথেষ্ট আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিং ছাড়া অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে তাদেরকে রাতারাতি ‘স্টিম লাইনে’ আনা সম্ভব নাও হতে পারে ।

৬। ট্রাফিক আইন অমান্য করবার সংস্কৃতিকে ‘ছোট অপরাধ বা কোন অপরাধই নয় ‘এই মন্তব্য থেকে বেরিয়ে আসতে হবে ।‘ঈযধৎরঃু নবমরহং ধঃ যড়সব’, আপনি আচরি ধর্ম । একটি পরিবারের থেকেই এই আন্দোলনের শুরু করা যেতে পারে । পারে দূরন্ত পথচারী জেব্রাক্রসিংএ সবুজবাতি জ্বলবার জন্য অপেক্ষা করবার মত নূন্যতম ধৈর্য ধারণ করলেই গাড়ির স্রোত অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে । ওভারব্রীজ থাকা সত্বেও মূলসড়ক দিয়ে হেঁটে যাবার প্রবণতা ট্রাফিক জ্যামকে উস্কে দেয় । এটিকে বন্ধ করবার জন্য বাড়তি অর্থ ব্যয় করবার দরকার নেই । শুধু মান্যতার সংস্কৃতির ‘মাইন্ডসেট’ই যথেষ্ট ।

৭। ঢাকার রাস্তায় ওভারস্পীড করবার সম্ভাবনা কম । তারপরেও সামান্য সুযোগ পেলেই ওভারস্পীডের প্রবণতা ভয়াবহ ট্রাফিক জ্যামের বীজ বপন করে । এই অসুস্থ চর্চা বন্ধে পেশাদার ড্রাইভারদের পরিবহন মালিকদের দ্বারা প্রেষণা, প্রয়োজনে শাস্তির আওতায় আনা যেতে পারে । ঢাকার রাস্তায় পরিবহণ ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করছে উবার, পাঠাও ইত্যাদি । এরা ব্যাপক পরিমানে মটর সাইকেল নামিয়েছে । দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাবার জন্য এরা মটর সাইকেল ফুটপাথে উঠিয়ে দিচ্ছে । লাললাইটে আটক সারিবদ্ধ গাড়ির ফাঁক ফোঁকর গলিয়ে আরও সামনে যেয়ে ট্রাফিক জ্যামের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিচ্ছে । এইসব মটর সাইকেল চালকদের অধিকাংশই ছাত্র । এরা আগামীদিনের নাগরিক । এদের ট্র্যাফিক আইন ভাঙবার প্রবণতা অঙ্কুরে বিনাশ না করলে পরে সেটা মহীরূহ হয়ে ডালপালা ছড়িয়ে আমাদের এই নগরীকে ‘ট্রাফিক জ্যামে রুদ্ধ’ নগরীতে পরিণত করতে পারে । ফুটপাথ হকার আর ভিক্ষুকদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে । এদের পুনর্বাসন বা হকার্স জাতীয় মার্কেট গড়ে তোলার উদ্যোগ সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নিতে হবে । আবার, আমাদের আপাত অসুবিধে মেনে নেয়ার ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে । ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যা শুধু ভিআইপি এলাকায় নয়, সব ট্রাফিক জ্যামের স্পটে বাড়াতে হবে ।তাঁদের প্রশিক্ষণ, হালনাগাদ লাগসই প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি দিয়ে সমৃদ্ধ করতে হবে ।

৮। লোকাল পরিবহনগুলো কেবলমাত্র নির্ধারিত স্টপেজে শুধু নির্ধারিত সময় নাগাদ থাকবে । যাত্রীরা টিকেট কেটে লাইন ধরে সেই গাড়িগুলোতে উঠবে- নামবে। শোনা যায় এইসব পরিবহনের অনেক দুর্বিনীত, গডফাদার । এদের অঙ্গুলি হেলনে পরিবহনগুলি যে কোন মুহূর্তে, যে কোন স্থানে থামায় এবং তাদের সুবিধামত সময় নাগাদ অপেক্ষা করায়, চলন্ত গাড়িতে যাত্রীদের উঠায় নামায় । শোনা যায়, এই ব্যবস্থায় নগদ নারায়ণের লেনদেন চলে ।

৯। আবাসিক এলাকায় অনুমোদনহীন কিন্ডারগার্টেন, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ছাতার মত গজিয়ে তোলা হয়েছে । এদের অধিকাংশেরই নিজস্ব ক্যাম্পাস না থাকায় এদের ‘ক্রাইটেরিয়া’ নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে তেমনি ধনাঢ্য ব্যক্তির এক এক জন পুত্রকন্যার জন্য এক একটি প্রাইভেট কার ট্র্যাফিক জ্যামের মহাযজ্ঞ লাগিয়ে দেয়। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুগোপযোগী ,বাস্তবসম্মত নীতিমালায় এনে নগরীর কেন্দ্রস্থানের বদলেন্ত্রান্তসীমায় নিয়ে গেলে যানজট অনেকটাই কমবে । আশার কথা এর মধ্যে এই প্রক্রিয়া হাটি হাটি পা পা করে এগুতে শুরু করেছে ।

১০। মাত্র দুই যুগ আগের বাংলাদেশের আন্ডার ডগ ক্রিকেট এখন বিশ্বের ক্রিকেট খেলুড়ে দেশগুলোকে অন্তত একবার করে হারিয়েছে। সেই বিচারে বলা যায়, ক্রিকেটে । আমেরিকার অন্যতম উঁচু দালানের স্থপতি বাঙালি আর্কিটেক্ট এফ আর খান । লন্ডনসহ বিভিন্ন দেশের মানুষের ভালবাসায় ধন্য হয়ে ‘জনপ্রতিনিধি ‘হয়েছেন অনেক বঙ্গসন্তান । জাতিসংঘের বøু হেলমেটের ছায়ায় কাজ করা বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা অন্তত ৪০ টি দেশের যুদ্ধ থামিয়েছে বা যুদ্ধ থামানোর কাজে দারুণ সাফল্য দেখিয়ে যাচ্ছে । আর সেই দেশের নাগরিকেরা নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধান করতে পারবে না ? মান্যতার সংস্কৃতির বিপুল শক্তিতে অরাজকতাপূর্ণ ট্র্যাফিক জ্যামকে পুরোপুরি না হোক সহনীয় মাত্রায় একদিন আসবে সেই আশায় স্বপ্ন দেখি আমি আপনি আমরা সকলেই ।
লেখক: উপ-অধিনায়ক, আর্মড ফোর্সেস ফুড এন্ড ড্রাগস ল্যাবরটরী/সম্পাদনা: মোহাম্মদ আবদুল অদুদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ