প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ট্রাম্প-কিম বৈঠক: উত্তেজনা বন্ধের প্রতিশ্রুতি

লিহান লিমা: সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত বহুল প্রতিক্ষার বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন। সান্তোসা দ্বীপের এই শান্তি প্রচেষ্টায় উত্তর কোরিয়া কোরিয় উপদ্বীপকে পরমাণু অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে নিজেদের দৃঢ় প্রতিশ্রুতির কথা জানায়। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোন সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় নি। বৈঠকের পর ট্রাম্প বলেছেন, কিম প্রধান ক্ষেপণাস্ত্রের ইঞ্জিনের পরীক্ষাগার ধ্বংসের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে মার্কিন শর্ত অনুযায়ী নিরস্ত্রীকরণ সম্পন্ন হওয়ার পূর্বে কোন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হবে না। প্রথমবারের মত মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার নেতার এই বৈঠকের ইতিবৃত্ত এখানে তুলে ধরা হল:-

প্রতিক্রিয়া

জাপানের প্রধানমন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সময় উত্তর কোরিয়ায় আটককৃত অন্যান্য দেশের নাগরিকদের ইস্যুতে কথা বলার জন্য ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান। মুন বলেন, ট্রাম্প-কিম সাহস এবং একনিষ্ঠতা দেখিয়েছেন। তবে কোরিয় উপদ্বীপে মহড়া বন্ধের বিষয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সিউল জানায়, আমাদের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া দরকার। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এটিকে ‘ইতিবাচক পদক্ষেপ’ বলে উল্লেখ করেন। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং লি বলেন, চীন কোরিয় উপদ্বীপের প্রতিটি সমস্যার সমাধানের জন্য ভূমিকা পালন করে যাবে। ইউরোপিয় ইউনিয়ন জানায়, এটি শান্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে ইরান চুক্তির বিষয়ে সতর্ক করে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাসযোগ্য নয়। মঙ্গলবারের বৈঠকের আগে সোমবার ট্রাম্প জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে এবং দক্ষিন কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জে ইনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। সাংবাদিকদের অ্যাবে বলেন, উত্তর কোরিয়ার প্রতি জাপান, যুক্তরাষ্ট্র এবং দক্ষিণ কোরিয়া একই নীতি বজায় রাখবে।’ মঙ্গলবার মুন বলেন, ‘গতরাত তিনি (উত্তেজনায়) ঘুমোতে পারেন নি। আশা করছি একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। মন্ত্রী-পরিষদের বৈঠকের সময় ট্রাম্প-কিমের বৈঠক দেখে মুচকি হাসছিলেন মুন।

সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প

কিমের সঙ্গে দুই দফার বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ‘অতীতের সেই দিন আর নেই। নেই পূর্বের প্রশাসনও, যারা এটি কখনোই করতে পারত না। আমরা কোন কিছুতে ছাড় দেই নি।’ ট্রাম্প বলেন, ‘কিম আমার কাছে তাদের গুরুত্বপূর্ণ মিসাইল পরীক্ষাগার ধ্বংসের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।’ ট্রাম্প আরো বলেন, গত ৭০ বছর আগে কোরিয় উপদ্বীপে সংঘাত শুরু হয়েছে। অনেক মানুষ মারা গিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সামরিক মহড়া বন্ধ করে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার করে নেবে। এই সময় দেশকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য কিমের ভূমিকার প্রশংসা করেন ট্রাম্প বলেন, তিনি দারুণ মেধাবী এবং সক্ষম। ২৬ বছর বয়স থেকে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। তাকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানিয়েছি, তিনি তা গ্রহণ করেছেন। আরেকটি বৈঠকের প্রত্যাশা করছি। আমি কিমকে বিশ্বাস করি আর তিনি আমাকে। তার সঙ্গে দারুণ বন্ধুত্ব হয়েছে। আশা করছি কিম এই চুক্তি অক্ষুণœ রাখবেন। ট্রাম্প আরো বলেন, নিরস্ত্রীকরণ সম্পূর্ণ হলে উত্তর কোরিয়ার ওপর থেকে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হবে। সিএনএন জানায়, এক বছরেরও বেশি সময়ে এটি ট্রাম্পের পূর্ণাঙ্গ সংবাদ সম্মেলন। যদিও নিরস্ত্রীকরণের বিষয়গুলো দুই পক্ষের কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় নি। প্রসঙ্গত সংবাদ সম্মেলন শেষ করেই যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে রওনা দেন ট্রাম্প।

চুক্তি ও সমঝোতা

দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর ট্রাম্প-কিম চুক্তি স্বাক্ষর করেন। দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরের পর ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, আমরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ নথিতে স্বাক্ষর করেছি। কিম বলেন, এই ঐতিহাসিক নথি স্বাক্ষর এবং বৈঠক সুন্দরভাবে সম্পন্নের জন্য ট্রাম্পকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
কিম এই সম্মেলনকে ‘শান্তির পূর্বমুহুর্ত’ বলে উল্লেখ করেন। ট্রাম্প বলেন, আমিও তাই মনে করি। ট্রাম্প বলেন, খুব দ্রুতই পরমাণুনিরস্ত্রীকরণের প্রক্রিয়া আরাম্ভ হবে। আন্তমহাদেশিয় ক্ষেপণাস্ত্র এবং শক্তিশালী পারমাণবিক অস্ত্র সমৃদ্ধশালী উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে হওয়া এই চুক্তিটি যথাযথ নয়। বরং যা আশা করা হচ্ছিত তার চেয়ে অনেক দুর্বল চুক্তি হয়েছে।

দুই দফার বৈঠক

প্রথম দফায় যৌথ এবং ব্যক্তিগত বৈঠকের পর দ্বিতীয় দফায় বৈঠক করেন ট্রাম্প কিম। এই সময় পরমাণু অস্ত্র ত্যাগ করবেন কি না এই প্রশ্নের উত্তর দেন নি কিম। তবে ট্রাম্প বলেন, তিনি এই ইস্যুতে একসঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। এই সময় কিমের সঙ্গে ছিলেন পার্টি সেন্ট্রাল কমিটির ভাইস-চেয়ারম্যান কিম ইয়ং চোল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী রি ইয়ং হো, ওয়ার্কাস পার্টির ভাইস-চেয়ারম্যান রি সু ইয়ং। ট্রাম্পের সঙ্গে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও, চিফ অব স্টাফ জন কেলি, জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা জন বোল্টন।

শরীরি ভাষা

কিম আসন গ্রহণের পর নিজের চেয়ারে বসেন ট্রাম্প। ট্রাম্প মজা করে ফটোগ্রাফারদের বলেন, এমন ছবি তুলুন যাতে আমাদের সুন্দর, হ্যান্ডসাম এবং ফিট দেখায়। করমর্দনের পর ট্রাম্প বলেন, আগে আমরা অনেক ভয়ানক সম্পর্ক পার করেছি। কিম বলেন, সববাধা কাটিয়েই আজ আমরা এখানে। প্রায় এক ঘণ্টা প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকের পর আধ ঘণ্টার মত হেঁটে-বসে একান্তে আলাপ করেন ট্রাম্প-কিম। একান্ত বৈঠকে কিম ট্রাম্পকে বলেন, অনেকেই এটিকে সায়েন্স ফিকশন মুভি মনে করবেন।

আচরণ কূটনীতি

ট্রাম্পের পরামর্শকরা তাকে বলেছিলেন, কিমের সঙ্গে বেশি বন্ধুত্বর্পূণ না হতে। তারা বলেন, এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা হিসেবে কাজে লাগানো হতে পারে। উচ্চপদস্থ মার্কিন কর্মকতা বলেন, কিমকে সম্মান, মর্যাদা এবং উষ্ণ সংবর্ধনা দেয়া হবে কিন্তু আন্তরিক ও হাস্যোজ্জল ভাবে তাকে স্বাগত জানানো হবে না।

সাধারণ মার্কিনি ও কোরিয়রা কি ভাবছেন

পর্দায় সম্মেলন দেখছেন উত্তর কোরিয়রা

বেশিরভাগ আমেরিকান এই সম্মেলনকে সমর্থন করেন। তবে খুব কমই বিশ্বাস করেন উত্তর কোরিয়া পরমাণুনিরস্ত্রীকরণে রাজি হবে। ৭২ ভাগ মনে করেন ট্রাম্প একজন কঠোর শাসকের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এদের মধ্যে অর্ধেকই ডেমোক্রেট। তবে শুধুমাত্র ২০ ভাগ বিশ্বাস করেন উত্তর কোরিয়া পরমাণু অস্ত্র ত্যাগ করবে। ৬৮ ভাগ বলেন, কিম এটি কখনোই করবে না। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ বলেন, ছোট্ট এই দেশটিকে নিয়ে কিম যুক্তরাষ্ট্রকে মাথা ঘামাতে বাধ্য করেছেন। এই বৈঠক উত্তর কোরিয়ার স্বীকৃতিও বটে।

কেন সিঙ্গাপুর

এক চিলতে সিঙ্গাপুর

পিয়ংইয়ং থেকে কিমের যাত্রার সহজ স্থান হিসেবে সিঙ্গাপুর সেরা, ভৌগলিক দিক থেকে এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নিরাপদ। এছাড়া এই দ্বীপরাষ্ট্রটি ওয়াশিংটনের কাছের নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক সহযোগী। সিঙ্গাপুরে এই দুই দেশেরই দূতাবাস আছে। এবং বিক্ষোভ ও সংবাদ সম্মেলনের মত ঝক্কি ট্রাম্প-কিমকে পোহাতে হবে না।

মধ্যস্ততায় ডেনিস রডম্যান

দুই নেতার সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক রয়েছে তার

ট্রাম্প কিমের ঐতিহাসিক করমর্দনের ৮ ঘণ্টা আগে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বীরই বন্ধু ও সাবেক এনবিএ স্টার ডেনিস রডম্যান। রডম্যানের সহকারী ড্যারেন প্রিন্স বলেন, বন্ধুদের সমর্থন দিতে স্বেচ্ছায় চলে এসেছেন তিনি। ডেনিস বলেন, এই শান্তি প্রচেষ্টার অংশ হতে পেরে গর্বিত আমি। আশা করছি সম্মেলন সফল হবে। মঙ্গলবার সিএনএনকে উচ্ছ্বসিত ডেনিস বলেন, আজ একটি সেরা দিন।

নির্ভার ‘রকেটম্যান’ ও ‘বিকারগ্রস্ত বুড়ো’

রাতের সিঙ্গাপুর দেখে মুদ্ধ কিম

কানাডার কুইবেকে জি-৭ নেতাদের সঙ্গে এররকম ঝগড়া করে শনিবার সিঙ্গাপুরর্ ওনা দিয়েছিলেন ট্রাম্প। এমনকি এয়ার ফোর্স ওয়ানে থাকাকালীন সময়েও কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর ওপর নিজের রাগ ঝেড়েছেন ট্রাম্প। তবে বৈঠকের আগের দিন রাতে দুই নেতাকেই খোশ মেজাজে দেখা গিয়েছিল। পম্পেও ও জন কেলিকে নিয়ে সময়ের কিছু আগেই নিজের জন্মদিন উদযাপনের ছবিতে বেশ হাস্যোজ্জল ছিলেন ট্রাম্প। অন্যদিকে কিমকে সিঙ্গাপুরেরর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণের সঙ্গে ঝটিকা ভ্রমণে রাতের সিঙ্গাপুর পরিদর্শনে বের হতে দেখা যায়। এই সময় সিঙ্গাপুরের সৌন্দর্য দেখে বিস্ময় ও মুগ্ধতা প্রকাশ করেন কিম।

সময়ের কিছু আগেই খোশমেজাজে জন্মদিন পালন ট্রাম্পের

‘হবে কি, হবে না’

বৈঠকের ভেন্যু ক্যাপিল্লা হোটেল

নানা দোলাচল ও টালবাহানার পর ১২জুন মঙ্গলবার সিঙ্গাপুরের সান্তোসা দ্বীপের ফাইভ স্টার ক্যাপিল্লা হোটেলে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠক নির্ধারণ করা হয়। গত ৬৫ বছর ধরে বর্হিবিশ্বের থেকে একরকম বিচ্ছিন্ন ছিল উত্তর কোরিয়া। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পিয়ংইয়ংয়ের দুই পুরনো মিত্র বেইজিং ও মস্কোর সম্পর্ক ছিল ওপেনসিক্রেট

৮ মার্চ মার্কিন প্রশাসন জানায়, উত্তর কোরিয়া ট্রাম্পকে তাদের নেতা কিমের সঙ্গে বৈঠকের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে। ট্রাম্প বৈঠকের প্রস্তাবে সম্মতি দিয়ে টুইট বার্তায় লিখেন। ‘বৈঠকের প্রস্তুতি চলছে’। এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং উত্তর কোরিয়া সম্মেলনে প্রস্তুতি হিসেবে গোপনে এবং সরাসরি কথা বলতে থাকেন। ১৮ এপ্রিল ট্রাম্প নিশ্চিত করেন সিআইএ প্রধান মাইক পম্প্ওে (বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী) কিমের সঙ্গে সাক্ষাত করতে পিয়ংইয়ং যাবেন। ১০ মে ট্রাম্প ঘোষণা দেন সিঙ্গাপুরে হতে যাচ্ছে ঐতিহাসিক বৈঠক। তবে উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে ২৪ মে বাতিল হয়ে যায় ট্রাম্প-কিম বৈঠক। তবে এর একদিন পর ২৫ মে ট্রাম্প জানান তিনি ১২ জুনের বৈঠকের জন্য প্রস্তুত। ৩০ মে উত্তর কোরিয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কিম ইয়ং চোল মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর সঙ্গে নিউ ইয়র্কে দেখা করেন। ১ জুন চোল ওয়াশিংটন ডিসিতে ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করেন। এবং ওভাল অফিসে এক ঘণ্টার বৈঠকের পর চোল ব্যক্তিগত ভাবে ট্রাম্পের কাছে কিমের চিঠি পৌঁছে দেন। ওইদিন ট্রাম্প বৈঠকের বিষয়টি পুনরায় নিশ্চিত করেন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত