প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ইফতার রাজনীতি এবং ঈদ অর্থনীতি

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : চাঁদ দেখা সাপেক্ষেই ১৬ অথবা ১৭ জুন পৃথিবীর অনেক দেশের সঙ্গে বাংলাদেশেও ঈদ পালিত হবে। এ মুহূর্তে মানুষ ঈদের কেনাকাটা, নাড়ির টানে বাড়ি যাওয়া নিয়ে ব্যস্ত। দেশের রাজনীতি, শেখ হাসিনার জি-৭ সম্মেলনে যোগদান কিংবা খালেদা জিয়ার জেলবাস অথবা জামিন হলো কি হলো না- এ সব নিয়ে খুব বেশি মনোযোগী নয় বলেই মনে হচ্ছে। সে কারণে বিএনপির নেতারা অথবা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক কোথায় কী বললেন, বললেন না- এসব নিয়েও কেউ তেমন কোনো আগ্রহ প্রকাশ করছেন বলে মনে হচ্ছে না। একইভাবে বলা যায়, অর্থমন্ত্রী এম এ মুহিত গত ৭ জুন জাতীয় সংসদে যে বাজেট উত্থাপন করেছেন- তা নিয়েও খুব বেশি আলোচনা-সমালোচনা শোনা অথবা করার মতো পরিবেশ দেখা যাচ্ছে না। বস্তুত মানুষ এখন রোজার শেষ প্রান্তে এসে ঈদকে কেন্দ্র করে যার যার পরিকল্পনা নিয়েই ব্যস্ত আছে। এটি অতীতেও ঘটেছে, এখনো তাতে ব্যত্যয় ঘটেনি, নিকট-ভবিষ্যতে ঘটার কোনো কারণ দেখছি না। সময়টা আসলেই অন্যরকম। মানুষ রমজান ও ঈদকেন্দ্রিকতা থেকে সামান্য সরে আসার মতো নয় কিছুতেই। সে কারণেই রমজানের এক মাস দেশে রাজনীতি, আন্দোলন-সংগ্রাম বলে কিছু থাকে না। এখন অবশ্য ইলেকট্রনিক মিডিয়া ঘরে ঘরে প্রবেশ করায় মানুষ নেতাদের কথাবার্তা ঘরে বসেই শুনতে পায়। সুতরাং রাস্তার আন্দোলন-সংগ্রাম, সভা-সমাবেশের অতীত গুরুত্ব এখন আর সেভাবে নেই। মানুষের জীবনযাপন, চিন্তাভাবনা, চাওয়া-পাওয়া, বুঝ-জ্ঞানও এখন যার যার অবস্থান থেকেই বেশি চলে। দেশের রাজনীতি নিয়ে যার যার দলীয় অবস্থান ও বিশ্বাস পোষণ করলেও প্রকাশের ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। যারা এ দল ও দল তথা কোনো দলেই নেই- তারা আছেন দেশের রাজনীতি থেকে বেশ দূরে, তবে যার যার জীবন ব্যবস্থা, কর্মযজ্ঞ মোটেও থেমে নেই। রমজান মাসে যেহেতু ভিন্ন পরিবেশ সর্বত্র বিরাজ করে, তাই মানুষ অনেক বেশিই থাকে ভালোভাবে ঈদ উদযাপনকে কেন্দ্র করে নানা কাজে ব্যস্ত থাকা নিয়ে। ফলে পুরো পরিস্থিতি এই এক মাসে বছরের এগার মাস থেকে আলাদা হয়ে দেখা দেয়। তবে রাজনীতিবিদরা আমাদের দেশে এক মাস অলস সময় কাটানোর কথা ভাবতে পারেন না, শুধু ধর্মকর্ম করেও অতিবাহিত করবেন- তাও হয়তো তারা ভাবেন না। তারা বাহ্যিক হলেও ধর্মকর্মের সঙ্গে রোজার মাসটিকে ভিন্নভাবে অতিবাহিত করার পন্থা নির্ধারণ করে থাকেন। গত দেড়-দুই দশক থেকে দেশে রাজনৈতিক দলগুলো ‘ইফতার পার্টির’ সংস্কৃতি নামে একটি খাওয়া ও দেখা সাক্ষাতের ‘মডেল সংস্কৃতি’ চালু করেছেন। নিজের দলের, অঙ্গ সংগঠনের, এখন আবার জোটের দলসমূহের বড় বড় নেতাদের নিয়ে বড় বড় হোটেল-রেস্তোরাঁয় মিলিত হওয়ার ধারা চলছে। দলের শীর্ষ পর্যায়েই শুধু নয়, গ্রাম পর্যায়েও ‘ইফতার রাজনীতির’ আয়োজন চলে গেছে। মূলত স্থানীয় পর্যায়ে উঠতি নেতারা ব্যক্তিগত প্রভাব বাড়ানোর জন্যও ইফতার পার্টির আয়োজন করে থাকেন। এক দলের অভ্যন্তরেই একাধিক নেতা তা করে থাকেন। ইফতার পার্টির ইতিবাচক কোনো প্রভাব সাধারণ ভোটারদের ওপর না পড়লেও গ্রুপ হাতে রাখতে নাকি এর কোনো বিকল্প নেই বলে কেউ কেউ দাবি করে থাকেন।

অন্যদিকে কেন্দ্রে বিশেষত বিরোধী দলসমূহের নেতারা প্রায় প্রতিদিনই আয়োজিত কোনো না কোনো অনুষ্ঠানে ইফতারের আগে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে থাকেন, তাতে তারা দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় দোয়ার চাইতে রাজনৈতিক বক্তব্যই বেশি দিয়ে থাকেন। তাতে তাদের নেতাকর্মীদের কাছে এক ধরনের বার্তা পৌঁছে যায় বলে তারা বিশ্বাস করে থাকেন, তবে দেশে প্রতি বছর রমজান মাসব্যাপী কত সংখ্যক ইফতার পার্টি অনুষ্ঠিত হয়, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান আমাদের জানা নেই। তবে তাতে যে বেশ বড় অঙ্কের অর্থ হোটেল-রেস্তোরাঁর মালিকদের পকেটে যায়- সেটি নির্দ্বিধায় বলা চলে। এর অর্থনৈতিক মূল্য যেমন আছে, একই সঙ্গে অসংখ্য ইফতার সামগ্রীর বিক্রেতাদের রোজার মাসে আয়ের একটি উৎস হিসেবে কাজ করে থাকে। এতে অনেক স্থায়ী ব্যবসায়ী, কর্মচারী যেমন রয়েছে, একইভাবে মৌসুমি ইফতার বিক্রেতাও রয়েছে। ঈদে তাদের নতুন কাপড়চোপড় কেনার অর্থের সংস্থান হয়তো হয়। ইফতার পার্টিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে ছোলা, বুট, পেঁয়াজু, হালিমসহ রকমারি সামগ্রী দিয়ে ইফতার পসরা সাজানো হয়, অনেকে তা খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর গেলেন, ডাক্তাররা অবশ্য রমজান মাসে এসব ভাজাপোড়া খাদ্যদ্রব্য স্বাস্থ্যসম্মত নয় বলে মিডিয়ায় বারবার বলেও থাকেন। কিন্তু খাবার খেতে বসা মানুষ ডাক্তারের উপদেশ মতো চলেন কমই। সেটি ঘটলে দেশে এত ইফতার পার্টির ছড়াছড়ি হতো না। তাতে লাভ-ক্ষতির হিসাব শুধু অর্থনৈতিক নিক্তিতে নয়, রাজনৈতিক ব্যারোমিটারেও ওঠানামার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। ভোজন বিলাসী বাঙালি সারাদিন রোজার কারণে খেতে পারেন না, কিন্তু ইফতার পার্টি বোধ হয় সুদে-আসলে উসুল করে দেয়।

অন্যদিকে ঈদ উপলক্ষে দেশে নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ, গরিব-ধনী নির্বিশেষে সবাই সাধ্যমতো তো অবশ্যই, ধনীরা যে বিদেশে গিয়েও ঈদের কেনাকাটা করে থাকেন- সেটি প্রায় সবারই জানা। প্রতিটি পরিবারের প্রায় সব সদস্যের জন্য যে জামাকাপড়, জুতা-স্যান্ডেলতো কেনাকাটা করা হয়- সেটিও জানা কথা। আমাদের ছোটকালে অর্থাৎ গত শতকের পঞ্চাশ-ষাটের দশকে অনেকের ধারণাতেই নতুন জামাকাপড় জুতা-স্যান্ডেল ছিল না। খুব সীমিত আকারেই মানুষের তেমন কেনাকাটা করার সামর্থ্যটা ছিল। ঈদের দিন কিছু মিষ্টিজাতীয় খাবার তৈরির মধ্যে বেশির ভাগ মানুষের ঈদের আনন্দ সীমাবদ্ধ থাকতো। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে অবস্থা পাল্টাতে থাকে। গত তিন দশকে ব্যাপক মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তের বিকাশ ঘটেছে, নিম্নবিত্তেরও সংজ্ঞায় পরিবর্তন এসেছে। এর ফলে খাদ্যদ্রব্য, পোশাক ও ব্যবহার্য সামগ্রী ক্রয়ের চাহিদা দ্রুত বেড়ে যায়, একই সঙ্গে বাজারও সম্প্রসারিত হতে থাকে। ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে লাখ লাখ মানুষ যুক্ত হতে থাকে। রোজার পুরো মাসটিতে অপেক্ষাকৃত উন্নত খাবার তথা মাছ, মাংস, তরি-তরকারি কেনাবেচা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ঈদ উপলক্ষে নতুন কাপড় ও ব্যবহার্য সামগ্রীর আয়োজনও বিশেষভাবে বেড়ে যায়। ঈদকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতিতে লাখের অধিক হাজার কোটি টাকার পণ্য সামগ্রী বাজারে আনা হয়, এটিকে এক কথায় ঈদ অর্থনীতি বলেও অর্থনীতিবিদরা বলে থাকেন। দেশে ঈদ অর্থ অর্থনীতির জোগান দিতে অনেক পণ্যের প্রস্তুতি বছর জুড়েই থাকে, সেভাবে শিল্পী, কারিগর, শ্রমিক, মালিক বাজারে নতুন ধারণা এবং আয়োজন নিয়ে হাজির হন। এখন আমরা শহরগুলোর শপিংমলের দিকে তাকালেই দেখতে পাচ্ছি মানুষ বেজায় গরমকে উপেক্ষা করেও কেনাবেচায় ব্যস্ত, রাতদিন শহরের বাজারগুলো লোকারণ্য হয়ে থাকে, বেচাকেনা হচ্ছে, ফুটপাতেও ঢের মানুষ কেনাবেচা করে থাকেন। গ্রামগঞ্জে বাজারগুলোতে দোকানপাট সাজিয়ে বসে আছেন অসংখ্য বিক্রেতা, ক্রেতারও অভাব নেই। গ্রাম থেকে অনেকেই নিকটবর্তী শহর, এমনকি ঢাকা শহরেও পছন্দের কেনাকাটা করতে ছুটে আসছেন। বিদেশে কর্মরত ব্যক্তিরা ঈদ উপলক্ষে বিশেষ অর্থ পাঠানোর চেষ্টা করেন। তাতেও বিদেশি রেমিটেন্স আসার প্রবাহ স্বাভাবিকের চাইতে বেশ বেড়ে যায়। সেই অর্থের একটি বড় অংশই পরিবারের সদস্যরা কেনাকাটায় ব্যয় করে থাকেন। সে কারণেই বলছি, এখন আর আগের মতো অবস্থা নেই বাংলাদেশের সমাজ জীবনে। রমজানের শুরু থেকেই বিপুল অঙ্কের অর্থ বাংলাদেশে প্রবেশ করে, ঈদের আগে দ্বিতীয়বার তা ঘটে। এই অর্থের সিংহভাগই রমজান এবং ঈদ উপলক্ষে ব্যয়িত হচ্ছে। মানুষ সে সব আয়োজনে অনেক বেশি ব্যস্ত। গ্রাম ও শহর কোথাও যেন থেমে নেই নতুন নতুন পছন্দের সামগ্রী ক্রয় করা। সবাই চাচ্ছেন, ঈদ উপলক্ষে এক সঙ্গে মিলিত হবেন, উপহার বিলিয়ে নিকটজনদের ভালোবাসা পাবেন। শহর থেকে এ উপলক্ষে লাখ লাখ মানুষ গ্রামের দিকে ছুটে যাচ্ছেনও একই কারণে। জীবনের নানা ঝুঁকি নিয়েই মানুষ ছুটছে শহর থেকে গ্রামে। শুধু একটিই আশা পরিবার ও নিকটজনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করা, দেখা-সাক্ষাৎ করা, নিজেদের সম্পর্ক ধরে রাখা। আমি জানি না, পৃথিবীতে দ্বিতীয় আর কোনো দেশ আছে কিনা, যেখানে এত বিপুল সংখ্যক মানুষ ঈদ উপলক্ষে এভাবে শহর ছেড়ে গ্রামে দল বেঁধে যেতে, যানবাহনের স্বাভাবিক অবস্থার চাইতে কয়েকগুণ চাপ সৃষ্টি করতে। প্রতি বছরই ঈদ উপলক্ষে বাড়তি চাপের কারণে সড়ক দুর্ঘটনায় অনেকেই প্রাণ হারান, পঙ্গু হয়ে পড়েন। তারপরও থেমে নেই ঈদ উপলক্ষে গ্রামে যাওয়া, আপনজনদের সঙ্গে ক’দিন কাটিয়ে আসা। আসলে গোটা দেশ ও জাতি যেন ঈদ উপলক্ষে এতসব ব্যক্তিগত আনন্দ-আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে আছে। সে কারণেই দেশের রাজনীতি নিয়ে কারো কথা শোনার আগ্রহ নেই, সময় নেই, বাজেট নিয়েও দুশ্চিন্তা করার পর্যায়ে নেই। জীবনকে এভাবেই প্রতি বছর আমাদের প্রায় সবাই কমবেশি উপভোগ করতে চায়, আনন্দ পেতে চায়। এর মধ্য দিয়ে দেশ ঈদ অর্থনীতির এক সচল গতিতে তুঙ্গে উঠে আসে। নিঃসন্দেহে এটি আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে এসবই অবদান রাখছে। অনেক শিল্প-কলকারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে, অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ এভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে, যাবে।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়/ সূত্র: ভোরের কাগজ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ