প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাংলাদেশের বিজয়: নারী ক্রিকেটারদের জন্য প্রস্তাবনা

মাসুদা ভাট্টি : বাংলাদেশ অনেক দিন পর একটি নিপাট উদ্যাপনের উপলক্ষ পেলো। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে একটি উল্লেখ করার মতো বিজয় অর্জন করলো বাংলাদেশ। সম্মানজনক এশিয়া কাপ বিজয় নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য একটি বিশাল অর্জন। কিন্তু এই অর্জনে একটি ‘কিন্তু’ আছে, এই ‘কিন্তু’টি আর কিছুই নয়, এই বিজয় অর্জন করেছে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট দল। গতকালই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিই একথা লিখতে দ্বিধা করেননি যে, আমরা আজ খুউব আনন্দিত, তবু কোথায় যেনো কষ্টটা থেকেই গেলো। এই কষ্ট আর কিছুই নয়, দেশের পুরুষ ক্রিকেট দলটির ক্রমাগত ‘খারাপ খেলা’ এবং সর্বশেষ আফগানিস্তানের কাছে ‘ধবল ধোলাই’-এর শিকার হওয়া জনিত কষ্ট।

বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে কোনো বিজয় অর্জন করেছে বলে এতোদিন আমরা জানতে পারিনি। হ্যাঁ, কিছু উল্লেখযোগ্য বিজয়তো এসেইছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো এদেশে ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে এক ধরনের নতুনতর জাতীয়তাবোধের জন্ম হয়েছে, যাকে অগ্রাহ্য করা যাবে না। কিন্তু ক্রিকেট খেলায় বড় বিজয়টি এনে দিলো এদেশের মেয়েরা, যারা এক কথায় শুধু অবহেলিতই নয়, বরং বলা ভালো অপাঙতেয়। এটা শুধু মাত্র ক্রিকেটের ক্ষেত্রে তাই-ই নয়, সর্বক্ষেত্রেই যে মেয়েরা অবহেলিত সে কথা নতুন করে বলার মতো বিষয় নয়। যদিও বাংলাদেশ সরকার নারীর ক্ষমতায়নের জন্য বিশেষ ভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত। কিন্তু সমাজ যদি রাষ্ট্রের ক্ষুদ্রাংশ হয়ে থাকে তাহলে সেখানে নারীর অবস্থান কেবল নড়বড়ে, তাই-ই নয়, বেশ নাজুকও বটে।

বাংলাদেশে যে একটি নারী ক্রিকেট দল আছে এবং তারা যে এতো বড় একটি বিজয়ও অর্জন করেছেন, ছয় বারের চ্যাম্পিয়ন ভারতীয় দলকে হারিয়ে, সেটা নিয়েও অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। এই নারী ক্রিকেটারদের আমরা বিজ্ঞাপনে দেখি না, আমরা তাদেরকে রাষ্ট্রীয় কোনো আয়োজনে দেখি না, এমনকি তাদের নিয়ে আমাদের তাবৎ ক্রীড়া সাংবাদিকরা এক লাইনও লেখেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। একটা দায়সারা রিপোর্টই এতোদিন আমরা দেখেছি। মজার কথা হলো, যেখানে পুরুষ ক্রিকেট টীমের সদস্যরা একেকজন কোটিপতি বললেও কম বলা হবে সেখানে নারী সদস্যদের বেতন-ভাতা নিয়ে কোনো প্রতিবেদন চোখে পড়েনি আজও। আমার দেখা বা জানার ভুলও হতে পারে, কিন্তু আমরা কেউই কিন্তু জানি না যে, এখনও নারী ক্রিকেটারদের বেতনের অঙ্কটি একেবারেই অনুল্লেখ্য। আজকে হয়তো এই লেখাটিও লেখা হতো না যদি না তারা এশিয়া কাপ বিজয়ী হতো। তার মানে হচ্ছে, যেখানে এদেশের পুরুষ দলটিকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করতে তাদের জন্য নামি-দামী কোচ আনা থেকে শুরু করে তাদের জন্য সকল প্রকার সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে সেখানে নারী ক্রিকেট দলের প্রতি অবহেলাটা কেবল লক্ষ্যনীয় নয়, দৃষ্টিকটু। এবং তারা এসব অগ্রাহ্য করে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটাঙ্গনে উজ্জ্বল করে তুলেছে।

দুর্ভাগ্যজনক সত্য হলো, বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দল বলতে কিন্তু আমরা এখনও কেবল পুরুষ দলটিকেই বুঝি। একথা বাকি সব খেলার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ইতোমধ্যেই এদেশের ফুটবলে নারী দলটি আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দিয়েছে দেশকে। অথচ এদেশের পুরুষ ফুটবল দলটির কথা উল্লেখ করার মতো কিছু আছে কিনা সে প্রশ্ন না তোলাই হয়তো শ্রেয়। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের ক্রিকেটের একটি আন্তর্জাতিক অর্জনকে সামনে রেখে নিম্নলিখিত কয়েকটি প্রস্তাবনা সংশ্লিষ্টদের বিবেচনার জন্য রাখছি, মানা না না-মানা সেটা রাষ্ট্রের ব্যাপার:

১. এখন থেকে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল লিখে তারপর নারী ও পুরুষ লেখা হোক।

২. পুরুষের সমান সম্মানী দেওয়া হবে কিনা বলতে পারবো না, তবে নারী ক্রিকেটারদের আন্তর্জাতিক মানের সম্মানী নিশ্চিত করা হোক।

৩. নারীদের এই বিজয়ের পুরস্কার হিসেবে তাদের ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা থাকে এমন কোনো স্থায়ী পুরষ্কারের ব্যবস্থা করা হোক।

৪. এখন থেকে আর কোনো গণমাধ্যমেই ‘প্রমীলা’ শব্দটি কোনো খেলাধুলার ক্ষেত্রেই ব্যবহার করবে না।

৫.দেশের বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলি সেলিব্রিটি পুরুষ ক্রিকেটারদের পাশাপাশি নারী ক্রিকেটারদের সেলিব্রিটি হিসেবে সুযোগ করে দিক।

৬. রাষ্ট্র সমাজ ও ব্যক্তিমানসকে বাধ্য করুক নারীকে তার প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে।

সধংঁফধ.নযধঃঃর@মসধরষ.পড়স

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ