প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কেন ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অবরোধ মেনে নেবে না ভারত

রাশিদ রিয়াজ : ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ সাফ বলে দিলেন জাতিসংঘের কোনো অনুমোদন ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে আরোপিত অবরোধ মানবে না তার দেশ। কারণ হিসেবে তিনি বলে দিয়েছেন তার দেশের পররাষ্ট্রনীতি স্বাধীন ও অন্যকোনো দেশের চাপে তা নতি স্বীকার করবে না। ভারত ইতিমধ্যে মার্কিন ডলারের পরিবর্তে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেন রুপিতে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সুষমা স্বরাজের এ বক্তব্য দেওয়ার কয়েক ঘন্টার মধ্যে ওয়াশিংটন থেকে রাশিয়ার এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার ব্যাপারে ভারতকে সতর্ক করে দেয়া হয়। যদিও ওয়াশিংটন আগে এধরনের ক্ষেপণাস্ত্র কেনার ব্যাপারে তাদের কোনো আপত্তি নেই বলে জানিয়েছিল। ভারত পুরোনো মিত্র রাশিয়া ও অংশীদার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বুঝে শুনেই চলতে চাইছে। যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে হয়ত ভারত এখন বাধার মুখে পড়তে পারে। চীনের সঙ্গে শক্তির ভারসাম্য এবং আফগানিস্তানে পাকিস্তানের প্রভাব খর্ব করে ভারত তার প্রভাব বৃদ্ধি করতে যেয়ে এর আগে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা পেয়েছে।

ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের মুখোমুখি দিল্লির শক্ত অবস্থান নেয়ার স্পষ্ট আভাস দিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। সোমবার নয়াদিল্লিতে নিজের বার্ষিক প্রেস কনফারেন্সে তিনি বলেন, ভারত শুধু জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা অনুসরণ করে। যুক্তরাষ্ট্র অথবা অন্য কোনো দেশের নিষেধাজ্ঞা ভারত মানবে না। তেহরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ভারত ইরান থেকে তেল কিনবে কিনা এ মর্মে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। সুষমা আরো বলেন, অতীতে আমরা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান, ভেনিজুয়েলা ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ব্যবসা করেছি। যুক্তরাষ্ট্র সরকার উত্তর কোরিয়ায় দূতাবাস বন্ধের অনুরোধ করলেও আমরা কর্ণপাত করিনি। এবারো আমাদের নীতির ব্যত্যয় হবে না।

ইরান সম্পর্কে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠিন অবস্থান শুধু যে মনস্তাত্ত্বিক কূটনীতি নয়, রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি এবং দলীয় রাজনীতিরও স্বার্থে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের যে হারে মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে, তাতে ইরানের মতো দীর্ঘদিনের সহযোগীকে ছেড়ে নতুন উৎস খুঁজতে যাবে কেন ভারত। মনে রাখতে হবে যখন মার্কিন অবরোধের মুখে কেউ ইরানের কাছ থেকে তেল কিনতে সাহস পায়নি তখন চীন ও ভারত ইরানের কাছ থেকে তেল কিনেছে। অবশ্য ইরানের কাছে তেল ক্রয় বাবদ ভারতের দেনা বাড়ছে। অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনের ৮০ শতাংশ জ্বালানি ভারত আমদানি করে। ইরানের বিরুদ্ধে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার সময়ও ভারত সেদেশ থেকে তেল কিনেছে। কম সময়ে সরবরাহে সক্ষম ইরান ভারতকে তেল পরিবহনের ব্যয় থেকেও ছাড় দেয়। বিশ্বে তেলের তৃতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক দেশটি তাহলে কেন ইরান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে? উপরন্তু নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকারের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতেও তেলের মূল্যে সতর্ক চোখ রাখতে হচ্ছে।

দিন কয়েক আগে ১২ বার তেলের মূল্য বৃদ্ধির পর সর্বশেষ এক পয়সা তেলের মূল্য কমিয়েছে ভারত। তেলের মূল্য ওঠানামায় ভারত এধরনের নাজুক অবস্থায় থাকে। কারণ এর উপর নির্ভর করে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়, কমে যায় অর্থনৈতিক কর্মকা- ও ভোগব্যয়। ভারত সরকারের চলতি হিসাব ঘাটতি এখন জিডিপির ২ শতাংশ, যা তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আরো বাড়বে। ব্যাংক অব আমেরিকা মেরিল লিঞ্চ বলেছে, তেলের দাম ব্যারেলে ১০ ডলার বাড়লে ভারত জিডিপির শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ হারায়। এ অবস্থায় আগামী বছর নির্বাচনকে সামনে রেখে নরেন্দ্র মোদি সরকার নিশ্চয়ই তেল বাবদ আমদানি ব্যয় বাড়াতে চাইবে না। সুষমা স্বরাজ সেজন্যই সোমবার সংবাদ সম্মেলনের পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন। এ থেকেই স্পষ্ট, মার্কিন চাপাচাপি সত্ত্বেও নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া ছাড়া ভারতের হাতে অন্য কোনো বিকল্প নেই।

এদিকে আগামী জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিসের সঙ্গে সংলাপে বসবেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন অবশ্যই এসময় ইরান ও রাশিয়ার সংগে সম্পর্কের ব্যাপারে ভারতের কাছে জানতে চাইবে।

যুক্তরাষ্ট্রের মুখ্য উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী (রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা ) টিনা কাইদানো গত শুক্রবার ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের বলেছেন, শুধু ভারত নয়, সব দেশই এটা বুঝবে, রাশিয়ার কাছ থেকে চড়া দামের অস্ত্রপাতি কিনলে আমাদেরকে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

এছাড়া যতটা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নত করতে চেয়েছিল ভারত, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি সে আশায় গুড়ে বালি দিয়েছে। উপরন্তু চীনের আগ্রাসী উন্নয়ন নীতি ভারতের প্রতিবেশি দেশগুলোকে নিয়ে যাচ্ছে এমন এক উচ্চতায় যেখান থেকে পিছিয়ে পড়ছে ভারত নিজেই। সুতরাং নতুন ভরসা পুরোনো মিত্র রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ঝালিয়ে তোলা। পাকিস্তানের সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার সম্পর্কের গতি ভারতকে বাধ্য করছে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে। ভারত দেখতে পাচ্ছে তার প্রতিবেশি দেশগুলোর সঙ্গে চৈনিক মিত্রতা কি সুগভীর হয়ে হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। মালদ্বীপ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার পাত্তাই দিচ্ছে না ভারতকে, পাকিস্তান তো নয়ই। তাই অর্থনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রাশিয়ার সঙ্গে বৃদ্ধি করার কোনো আপাতত বিকল্প নেই ভারতের কাছে। রাশিয়ার সঙ্গে ঠা-া যুদ্ধের আগের সম্পর্ক ফিরে পেতে চায় ভারত।

চীনের সঙ্গে সিল্ক রুটে যোগ না দিয়ে নিজেকে গুটিয়ে রেখে যে ভুল করেছে ভারত তা শুধরাতেই রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করছে। সম্পর্ক উন্নয়নের মিশন নিয়েই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাশিয়া সফরের পর দুই দেশের মধ্যে এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কমপ্লেক্স নির্মাণে চুক্তি হয়েছে মোট ৪০ হাজার কোটি টাকার। রাশিয়ার উপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতা থেকে এই চুক্তিকে মুক্ত রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ভারত। আগামী অক্টোবরে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের বাৎসরিক সম্মেলনেই চুক্তিটির পূর্ণাঙ্গ ঘোষণা দেয়া হবে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস গত এপ্রিলে মার্কিন কংগ্রেসের শুনানিতে বলেন, ভারতের এস-৪০০ কেনার প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দিল্লি এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চীনের সঙ্গে তাদের সীমান্ত ঘেঁষে মোতায়েনের পরিকল্পনা করেছে।

কিন্তু এটি করতে যেয়ে ভারত মহাসাগরকে সামরিক ঝুঁকিতে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। রাশিয়া বঙ্গোপসাগরে বড় ধরনের নৌ সামরিক শক্তি হিসেবে মিয়ানমারকে সাহায্য করার পাশাপাশি চীনের ধীরগতির সামরিক সহায়তা পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এমনকি মালদ্বীপেও বাড়ছে। এর পাশাপাশি ভারত পাকিস্তানের নৌশক্তির চারপাশে পাল্টা নৌ শক্তি গড়ে তুলছে। গত বছর ভারত পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন থেকে ব্যালেস্টিক মিসাইল ছোড়ার পর এখন দেশটি হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছে কিভাবে এ অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। কারণ পাকিস্তানও ইতিমধ্যে সাবমেরিন থেকে ক্রুজ মিসাইল ছুড়ে পরীক্ষা করেছে। যা পারমাণবিক শক্তি পরীক্ষার প্রতিযোগিতাকে এ অঞ্চলে আরো ত্বরান্বিত করবে।

এদিকে রাশিয়া ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পর ২০২৫ সালে তা ৩০ বিলিয়নে উন্নীত করতে গত মার্চে দু’দেশের মন্ত্রীরা সবধরনের বাঁধা অপসারণ করতে একমত হন। রাশিয়ার সহায়তায় ইউরাশিয়ান ইকোনোমিক ইউনিয়নে একটা ভূমিকা রাখতে চায় ভারত। জাহাজ নির্মাণ, জালানি, এভিয়েশন, ইলেক্টোনিক্স, ভারী শিল্প, ওষুধ ও কম্পিউটার শিল্প নিয়ে এ দুটি দেশের আন্তঃসরকার কমিশন ব্যাপকভাবে কাজ শুরু করেছে। দুটি দেশের মধ্যে স্থল সীমান্ত না থাকায় ৮০ ভাগ পণ্য সেন্টপিটার্সবার্গ থেকে সুয়েজখাল হয়ে নৌপথে আনতে হয়। এজন্যে রাশিয়া, ভারত, ইরান ও আজারবাইজান একটি বিকল্প রুট ‘ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট করিডোর’ তৈরিতে কাজ করছে। মধ্য এশিয়ার দেশগুলোকে রেলপথের মাধ্যমে এ করিডোরে সংযুক্ত করলে ভারত বিকল্প একটি বাণিজ্য রুট পাবে। যা রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের নৌ পথের ওপর নির্ভরশীলতা বেশ কিছুটা কমাবে। একই সঙ্গে ভারত ও ইউরোপের মধ্যে প্রচলিত নৌ রুটের চেয়ে ৩০ ভাগ সস্তা ও ৪০ ভাগ কম দূরত্বের এ নতুন রুট সঙ্গতকারণে গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া, ভারত ও ইরানের অন্তত ২ হাজার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এ রুট ব্যবহারে আগ্রহী। যা রাশিয়া ও ইরানের ওপর মার্কিন অবরোধের বিকল্প হিসেবে কার্যকর।

এও প্রশ্ন উঠেছে ভারত কি তার অন্যতম মিত্র ফ্রান্সকে পাশ কাটিয়ে রাশিয়ার ওপর আরো বেশি ঝুঁকে পড়ছে। যেমন ঠা-া যুদ্ধের পর রাশিয়ার বিকল্প হিসেবে ভারত বেছে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রকে। ফ্রান্স পাকিস্তানে অস্ত্র বিক্রির পরিমাণ বৃদ্ধি করার পর কিছুটা হলেও চিড় ধরেছে দেশটির সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে। আর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যে কমপ্লেক্স রুশ সহযোগিতায় গড়তে চাচ্ছে ভারত তা ফ্রান্সের চেয়ে অপেক্ষাকৃত সস্তায় করা সম্ভব হচ্ছে। তাই বলে ফ্রান্সের সহায়তায় প্রতিরক্ষা শিল্পের ভিত্তি গড়ার সুযোগ হাতছাড়া করছে না ভারত। দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়া ভারতকে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন ভাড়া দিয়েছে। ভারত পরখ করে নিশ্চিত হয়েছে ফ্রান্সের তুলনায় রুশ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি কৌশলগতভাবেই অধিক কার্যকর ও সস্তা। উপরন্তু ভারত মহাসাগর বা দক্ষিণ চীন সাগর ছাড়াও দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর, আফ্রিকা ও ভূমধ্যসাগরে চীনের সরব সামরিক উপস্থিতি ভারতকে রাশিয়ার দিকে আরো ঝুঁকতে একপ্রকার তাড়া করেছে।

যদিও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে বিশেষ ও কৌশলগত বলছেন, একই সাথে রাশিয়া ভারতের চিরশত্রু হিসেবে বিবেচিত পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করছে। ভারতের ইকোনোমিক টাইমস বলছে মোদি ও পুতিন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নন-ব্লক নিরাপত্তা অবকাঠামো গড়ে তুলতে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে কাজ করতে রাজি হয়েছে যাতে ওই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয়। এ দুই নেতার আলোচনার পর ভারতের তরফ থেকে ‘মাল্টিপোলার ওয়ার্ল্ড অর্ডার’এর ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এধরনের ভূমিকায় কাজ করছে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র। আবার যুক্তরাষ্ট্রের যে অবরোধ রয়েছে রাশিয়া ও ইরানের ওপর সেখানে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে ভারত চাইছে সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে। সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশনের সদস্য হতে রাশিয়ার সহযোগিতা চেয়েছে ভারত। যা পেলে ইউরাশিয়ান রাজনীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তায় ভারত সম্পৃক্ত হয়ে তার পররাষ্ট্রনীতিকে আরো ক্ষুরধার করে তুলবে। গত ৫ বছরে ভারত তার ৬২ ভাগ অস্ত্রশস্ত্র আমদানি করেছে রাশিয়া থেকে। মোদি ও পুতিনের আলোচনার পর রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ তাস’কে বলেছেন, ভারত রাশিয়ার নেতৃত্বে ইউরাশিয়ান ইকোনোমিক ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য জোন গড়তে চায়।

গত দেড় দশকে ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের পরিধি বৃদ্ধি পায় বেশি। ২০০৪ সালে মনমোহন সিং’এর উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক দ্রুত বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এখন উল্টোরথে চলতে চাচ্ছে ভারত। যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র ক্রয়, ভারতীয় কর্তাদের দেশটি সফর, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধি, সফটওয়্যার ক্ষমতা, যৌথ সামরিক মহড়ায় এতদিন প্রিয় অংশীদার বলেই মনে হত ভারতকে। কিন্তু ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট নীতি’ এ সম্পর্কে ছেদ টেনেছে। যতটা আশা করা হয়েছিল ততটা কাঙ্খিত মার্কিন বিনিয়োগ ভারতে আসেনি। রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া থেকে ভারত কিছুটা পিছিয়ে গেলেও, ভারতীয় সমরবিদরা যুক্তরাষ্ট্রের দিকে একটু বেশি ঝুঁকেছেন। এর প্রায়শ্চিত্য করতে শুরু করেছে ভারত। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা কমিয়ে এনে পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও কাজাখাস্তান ছাড়াও মধ্য এশিয়ার আরো দুটি দেশের সঙ্গে যে নতুন বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাচ্ছে ভারত তাতে ইরান ও রাশিয়াকে কাছে চান নরেন্দ্র মোদি। বুঝে শুনেই ইরানের চবাহার বন্দরে বিনিয়োগ করেছে ভারত। কারণ পাকিস্তান পাল্টা গদার বন্দরটি উন্নয়নে চীনের কাছ থেকে যথেষ্ট সাহায্য পাচ্ছে। এর ফলে ওই অঞ্চলে যে সামরিক গুরুত্ব সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে বাদ পড়তে চায় না ভারত। পাকিস্তানের সঙ্গে রাশিয়ার যৌথ সামরিক মহড়ার সিদ্ধান্তে ভারতের টনক নড়ে গেছে। কারণ চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া থেকে অস্ত্র সংগ্রহের পর পাকিস্তান তা যদি সম্মিলিতভাবে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহারের সুযোগ পায় তা মোকাবেলার উপযুক্ত সময় এখন। চীন ও পাকিস্তানকে মোকাবেলায় রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কন্নোয়নে ভারতের বিলম্ব করার সময় নেই যখন রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবরোধ করছে যুক্তরাষ্ট্র ও এক্ষেত্রে রাশিয়ার সঙ্গে যে কোনো শত্রুকে ভারতের একা মোকাবেলা করার চেয়ে যৌথ প্রচেষ্টাই এর কার্যকারিতাকে নিশ্চিত করবে। ১.৩ বিলিয়ন জনসংখ্যার এই দেশটির বাজার যে কোনো দেশের জন্যে বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ভারত চাইছে রাশিয়াকে আরো কাছে পাওয়ার পর চীনের সঙ্গে বৈরিতা হ্রাস করা যায় কি না। বৈশ্বিক ক্ষমতার পরিবর্তন ও ভারসাম্য সৃষ্টির জন্যে ভারত ও রাশিয়া একে অপরকে এভাবেই মূল্যবান ভেবে পারস্পরিক অনুভূতি ও লেনদেনের ক্ষেত্রে একসঙ্গে আরো এগিয়ে যেতে চাইছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত