প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ন্যাপকিন কোম্পানির বিজ্ঞাপনে মডেল নেই!

বিনোদন ডেস্ক: স্যানেটারি ন্যাপকিনের বিজ্ঞাপনের জন্য মডেল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, অধিকাংশ নারী মডেল এ ধরনের বিজ্ঞাপনে কাজ করতে চান না বলেও অভিযোগ আছে। প্রায়শই এই সঙ্কটে পড়তে হয় ন্যাপকিন কোম্পানি ও বিজ্ঞাপনি সংস্থাগুলোকে।

স্যানেটারি ন্যাপকিন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান সেনোরা সম্প্রতি এ ধরনের সমস্যায় পড়েছে বলে জানিয়েছে তাদের ফেসবুক পেজে। অন্য কোম্পানিগুলোকেও এ ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় বলে খোঁজ নিয়ে জানা যায়।

২৪ মে সেনোরা তাদের ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট দেয়। যা অসংখ্যা শেয়ার হয়। তারকারাও শেয়ার করেছেন পোস্টটি।

তারা তাদের পেজে লিখেছেন, ‘সরি আপু সেনোরার বিজ্ঞাপন করতে পারব না। সেনোরার বিজ্ঞাপনের মডেল খুঁজতে গিয়ে আমাদের প্রায়ই শুনতে হয়। পিরিয়ডের মতো খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয় নিয়ে এই অস্বাভাবিক সংকোচ ভাঙতে হবে আপনাকে, আমাকে, সবাইকে।’

এ স্ট্যাটাসের রেষ ধরে আরও একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন সেনোরায় প্রায় ১২ বছর ধরে কাজ করা জেসমিন জামান নামের একজন কর্মী। তিনি লিখেছেন, ‘প্রায় ১২ বছর সেনোরার জন্য কাজ করতে গিয়ে দেখেছি আজকের অনেক খ্যাতনামা মডেল, নারী ও পুরুষ অসাধারণ সব বিজ্ঞাপনের স্ক্রিপ্ট আর খুব ভালো এক্সপোজারের সুযোগ এক মুহূর্তে বাতিল করেছেন যখনই শুনেছেন ব্র্যান্ডের নাম সেনোরা। আমি সত্যি তাদের খুব একটা অভিযুক্ত করতে পারি না, কারণ পিরিয়ড নিয়ে ট্যাবু আমরা আজও খুব একটা ভেঙে বেরোতে পারিনি। শুনে অবাক হবেন যে কেউ কেউ সেনোরার বিজ্ঞাপনে ভয়েস দিতেও অস্বীকার করেছেন। তবে স্যালুট আপনাদের, যাদের আমরা সাথে পেয়েছি স্রোতের বিপরীতে গিয়ে পিরিয়ড সংক্রান্ত সচেতনতা বাড়াতে। আপনার কারণেই আমরা আশাবাদী যে পরিবর্তন হবেই।’

কিন্তু কেন এই সঙ্কট? অভিযোগটা কি আসলেই সত্য? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে। এ বিষয়ে কী ভাবছেন বাংলাদেশের মডেল, অভিনেত্রী ও নির্মাতারা? উত্তর জানতে প্রিয়.কম যোগাযোগ করেছিল মডেল শাবনাজ সাদিয়া ইমি ও অভিনেত্রী বন্যা মির্জার সঙ্গে, এ ছাড়াও লেখক ও কবি উম্মে রায়হানাসহ এ বিষয়ে কথা বলেছেন বিজ্ঞাপন নির্মাতা ও পরিচালক অমিতাভ রেজা চৌধুরী ও আশুতোষ সুজন।

শাবনাজ সাদিয়া ইমি বলেন, ‘এ বিষয়টিকে (স্যানিটারি ন্যাপকিনের বিজ্ঞপনে কাজ করা) সাধারণ একটা বিষয় হিসেবেই দেখি। ন্যাচারাল একটা প্রসেসিং। ন্যাচারাল প্রসেসিংয়ে যেমন মাথাব্যথার ওষুধ থাকে, তেমনই স্যানিটারি ন্যাপকিন থাকে পিরিয়ডের জন্য। এটাকে আলাদা করে দেখি না আমি।

আর মডেল পাওয়া যায় না বললে বলব, আমিই করব স্যানিটারি ন্যাপকিনের অ্যাড। কিন্তু আমাকে কি পেমেন্টটা দিতে পারবে ভালো? অনেক সময় দেখা যায় একজন মডেল স্যানিটারি ন্যাকিনের অ্যাড করলে ওই মডেলকে অন্য একটি অ্যাডে হয়তো নিতে চায় না। আর তাই এটা একটা মডেলের জন্য হয়তো রিস্ক।

আমি করব স্যানিটারি ন্যাপকিনের অ্যাড। কিন্তু আমাকে কি একটা ভালো পারিশ্রমিক দিতে পারবে?’

ইমি আরও বলেন, ‘তারা যদি ৫, ১০, ১৫ হাজার টাকা বাজেট নিয়ে অ্যাড বানাতে বসে তাহলে তো মডেল পাবেই না। এখন লাইফস্টাইল হাই হয়ে গেছে, টাকার মান কমে গেছে। অনারিয়াম হাই না করলে কেউই অ্যাড করতে রাজি হবে না। অন্যকে দোষ দেওয়ার আগে কোম্পানিকে তাদের নিজের দোষ খুঁজে বের করতে বলুন। একটা রিস্ক নিতে হলে তো মডেলকে একটা ভালো অ্যামাউন্ট দিতে হবে।’

অভিনেত্রী বন্যা মির্জা মনে করেন, ট্যাবুর ভয়ে কেউ স্যানিটারি ন্যাপকিনের বিজ্ঞাপন করতে চান না, তেমনটি নয়। তিনি বলেন, ‘এখন তো স্যানিটারি ন্যাপকিনের বিষয়ে মেয়েদের পজিশনই আলাদা হয়ে গেছে। তারা ব্লাড সমেত ছবি দিয়ে ক্যাম্পেইন করছে। ফলে আমার মনে হয় না ট্যাবুর জন্য কেউ কেউ বিজ্ঞাপন করতে চায় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘কেউ কেউ তো থাকবেই যে করতে চাইবে না। কারো কারো তো মনে হতেই পারে যে আমরা ন্যাপকিনের অ্যাডভারটাইজম্যান্ট করব না। সেটা হতে পারে। যারা ব্লাড সমেত ছবি দিয়ে স্যানিটারি ন্যাপকিনের ট্যাবু ভাঙার চেষ্টা করছে, তেমনও তো আছে। দুটোই হয়তো আছে।’

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঋতুস্রাব ও স্যানিটারি ন্যাপকিন বিষয়গুলো এখনো ট্যাবু আছে কি না, এ প্রশ্নের জবাবে বন্যা মির্জা বলেন, ‘অবশ্যই আছে, ট্যাবু থাকবে না কেন? আমরা যে স্টেজে আছি বলতে তো আপনি শহরের একাংশে দেখছেন। ট্যাবু তো আছেই। ট্যাবু ভেঙে ফেলা এত সহজ নাকি! আমরা একটু কথা বললাম ফেসবুকে, তাতে ট্যাবু ভেঙে যাবে? ভাঙা নিশ্চয়ই ভীষণ জরুরি, যারা কথা বলছেন, তাদের সাধুবাদ দিতে হবে যে তারা কথা বলছেন এবং তারা নিশ্চয়ই আরও মানুষকে সাহায্যও করছেন কথা বলতে। সবাই যে এ বিষয়ে কথা বলতে চাইবেন এমনও না। কেউ না বলতে চাইলে তো আপনি জোরও করতে পারবেন না। অনেকের পরিবারই খুব রক্ষণশীল।’

লেখক ও কবি উম্মে রায়হানা বলেন, ‘ট্যাবুর কারণটা আমার মনে হয় যে, নারীকে তো আসলে ইন্ডিভিজুয়াল হিসেবে দেখা হয় না, দেখা হয় সেক্স অবজেক্ট হিসেবে। এটা শরীরবৃত্তিয় কারণ হিসেবে ভাবতে না পাড়ার একমাত্র কারণ হচ্ছে, নারীর শরীর হচ্ছে যৌনতা, নারীর শরীরের যে কোনো কিছুই যৌনতা। এটা যতটা না সন্তান জন্মদানের সঙ্গে সম্পর্কিত, সুস্থতার সঙ্গে সম্পর্কিত, তারচেয়েও বেশি কিছু লোকের সুড়সুড়ির সঙ্গে সম্পর্কিত। যে কারণে আমরা এটি ওপেনলি বলতে পারি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘পবিত্র বা অপবিত্রের ধারণা থেকে আমরা অনেক আগেই বের হয়ে এসেছি। এগুলোকে আমরা পাত্তা দিই না। কিন্তু তারপরও দোকানে গিয়ে কেনা, পিরিয়ডের কারণে রোজা রাখিনি- এটা মুখ দিয়ে বলা, এটা কর্মক্ষেত্রে বলা যায় না, পরিবারে বলা যায় না, বাবা ভাই থাকলে বলা যায় না, এ রকম একটা অবস্থা। এটা পুরুষের মন মানসিকতার জন্য, সমস্যা আমাদের না।

যদি জিজ্ঞাসা করেন যে এর সমাধান কী হতে পারে, তাহলে বলব, সমাধান হচ্ছে পরিবার থেকে শিক্ষা দেওয়া।’

বিজ্ঞাপন ও চলচ্চিত্র নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরী বলেন, ‘আমি যখন বিজ্ঞাপন নির্মাণ করেছি, তখন এ ধরনের কোনো সমস্যা হয়নি। তবে আমি এটাকে সোশ্যাল ট্যাবুও ভাবি না। যে কোনো আধুনিক মানুষই করবে এ বিজ্ঞাপন।’

‘আসলে যারা পেশাদার শিল্পী, তাদের কাছে এটা বড় কোনো বিষয় না। একজন শিল্পী তো শিল্পীই। সে শিল্পীর জায়গা থেকেই তো কাজটা করবে আসলে। তার পেশা যদি শিল্প হয়, তাহলে সে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবে, সে তার ভাষা দিয়ে মানুষকে বোঝাবে’, স্যানিটারি ন্যাপকিনের বিজ্ঞাপনে কাজ করা নিয়ে এ কথাগুলো প্রিয়.কমকে বলেন বিজ্ঞাপন নির্মাতা আশুতোষ সুজন। সূত্র: প্রিয়. কম

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত