প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘মৃত্যুর কাছে হেরে যেতে চাই না’

বিনোদন ডেস্ক: জীবনের এপিঠ-ওপিঠ দেখেছেন চলচ্চিত্রের একসময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা আবদুস সাত্তার। তিনি এখন রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে দিনযাপন করছেন। গত সাত মাস ধরে সেখানে আছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার শরীরের অবস্থা এমনই থাকবে, যদি না বিস্ময়কর কিছু ঘটে।

শয্যাশায়ী এই অভিনেতার খোঁজখবর নিতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন এই প্রতিবেদক। সে সময় উঠে আসে তার বর্তমান সময়ের বিভিন্ন চিত্র।

আবদুস সাত্তারের ভাষ্য, জীবনের এই পর্যায়ে আসার পর দুই-একজন ছাড়া চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট কেউই তার খোঁজখবর রাখছেন না। এ নিয়ে ভীষণ দুঃখ তার। ঠিকমতো কথা বলতে না পারলেও ভাঙা স্বরে জানিয়েছেন একমাত্র চাওয়ার কথা। তিনি বলেন, ‘আমি বাঁচতে চাই, মৃত্যুর কাছে হেরে যেতে চাই না।’

অভিনেতা আবদুস সাত্তার সহশিল্পী হিসেবে পেয়েছিলেন চিত্রনায়িকা রোজিনা, অঞ্জু ঘোষ, নায়করাজ রাজ্জাক ও চিত্রনায়িকা শাবানাকেও। এ ছাড়া বেশ কয়েকজন জনপ্রিয় নায়িকাকে তিনি সহশিল্পী হিসেবে পেয়েছেন। তার জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের মধ্যে ‘রঙিন রূপবান’, ‘অরুণ বরুণ কিরণ মালা’, ‘শুভদা’, ‘সাত ভাই চম্পা’ উল্লেখযোগ্য।

আবদুস সাত্তারের স্ত্রী আয়েশা আক্তার কাকলী বলেন, ‘এফডিসিতে শিল্পী সমিতিতে আমার স্বামীর অসুস্থতার বিষয়টি জানালেও তারা এরপর আর কোনো খবর নেননি।’

আবদুস সাত্তার ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে বলেন, ‘এ দেশে শিল্পীদের সম্মান সব এফডিসির ভেতরেই। সেখান থেকে বের হয়ে গেলে কেউ আর সম্মান করে না। আজ আমার এ অবস্থা। অথচ কেউ একবারের জন্য হলেও দেখতে আসেনি, কিংবা ইন্ডাস্ট্রির যারা সিনিয়র অভিনেতা-অভিনেত্রী আছেন, তারাও কোনো ধরনের খবর নেননি। আমার যৌবনের পুরোটা সময় আমি এখানে ব্যয় করেছি। কী স্বার্থপর এ সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি! আমার ঘৃণা হয় ভেবে!’

কথাগুলো বলতে বলতে কণ্ঠ ভারী হয়ে যায় অভিনেতা সাত্তারের। এরপর কাঁদতে শুরু করেন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘জীবন তো বয়ে চলা নদীর মতো। অথচ এই নদীতে কোনো মাঝির দেখা পেলাম না, যে আমার জীবনটাকে বেয়ে নিয়ে সুন্দর আরেকটা জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে।

বিধাতার কত খেলা দেখলাম এক জীবনে! আরও তো দেখতে হবে। আমি তো বাঁচতে চাই, মৃত্যু যেন আমাকে আলিঙ্গন করতে না পারে। মৃত্যুর কাছে হেরে যেতে চাই না।’

সাত্তারের স্ত্রী কাকলী বলেন, ‘আমার স্বামী প্রতিদিনই জানতে চান, সিনেমার কেউ তাকে দেখতে আসবে কিংবা কথা হয়েছে কি না। আমি তাকে প্রায়শই মিথ্যা বলি, আজ বলি ওর কথা, কাল বলি আরেকজনের কথা। আইসিইউর একটা রোগীকে মিথ্যা বলা ছাড়া আমার কিইবা করার আছে! কিন্তু তারা কেউ আজও আসেনি।

এটা তারা অন্যায় করে ফেলেছে। কারণ তারা একজন সিনিয়র শিল্পীর কোনো খবর রাখছে না। নিশ্চয়ই কোনো না কোনো দিন তারাও এর প্রতিদান পাবেন।’

এই অভিনেতা দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ রক্তচাপ, ফুসফুসে সংক্রমণ ও ডায়াবেটিসসহ ১৩টি রোগে ভুগছেন। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের চতুর্থ তলার সাত নম্বর ওয়ার্ডের ৪০ নম্বর বিছানায় আছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে ৩০ লাখ টাকা দিয়েছেন।

২০১২ সালে স্ট্রোক করে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে অভিনয় থেকে দূরে সরে যান আবদুস সাত্তার। অসুস্থ হওয়ার আগে তিনি শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন। আশির দশকে তার সঙ্গে রোজিনা-অঞ্জু ঘোষ জুটি জনপ্রিয় ছিল।

সর্বশেষ ২০১২ সালে পিএ কাজলের ‘চাচ্চু আমার চাচ্চু’ ছবিতে দেখা গিয়েছিল সাত্তারকে। নারায়ণগঞ্জের কলেজ রোডের বাসিন্দা কাকলী সাত্তারের দ্বিতীয় স্ত্রী। এ ঘরে তার পাঁচ সন্তান।

প্রথম স্ত্রীর পরিবারের কেউ এই অভিনেতার খোঁজ নিচ্ছেন না বলে দাবি করেছেন দ্বিতীয় স্ত্রী। কাকলী যখন এ প্রতিবেদকে কথাগুলো পাশে বসে বলছিলেন, তখন বিছানায় শুয়ে ডুকরে কাঁদছিলেন সাত্তার। ‘এ জীবনের মানে কী?’ বলে প্রতিবেদককে ছুড়ে দেন এ অভিনেতা। তারপর বলেন, ‘আমি এভাবে কষ্ট পেয়ে মরতে চাই না। হেরেও যেতে চাই না।’

চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর চিত্রনায়ককে এককালীন ৫০ হাজার টাকা দিয়েছেন। এরপর থেকে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা দিচ্ছেন। এ কথা প্রিয়.কমকে কাকলী জানান। তিনি বলেন, ‘না হলে আমার আর বিপদের উপায় থাকত না। এখন ওপরওয়ালা যদি তার জীবনটা আমাকে ভিক্ষা দিয়ে যায়, আমি তার কাছে শুকরিয়া।

আমি তার স্ত্রী হয়ে এটাই কামনা করি। এই মেডিকেলে ভর্তির পর সে সিসিউতে (করোনারি কেয়ার ইউনিট) ছিল। তখন ১১ জন চিকিৎসক বলেছেন, সে মারা যাবে। কিন্তু তারপরও সে আজ এ অবস্থায়।’

বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে কাকলী বলেন, ‘এখানে চিকিৎসার পর তিনি ১৫-২০ মিনিট পর উঠে বসতে পারেন। তবে এরপর আবার শুয়ে পরেন। এখানে অাসার পর এ উন্নতি হয়েছে। এ ছাড়া গত কয়েকদিন ধরেই বেশ জ্বর। কোনোভাবেই কমছে না। এখানকার চিকিৎসকরা বেশ সহায়তা করছেন। না হলে আরও বড় বিপদে পড়ে যেতাম।

আসলে টাকার ক্রাইসিস (সংকট) অনেক। যদি না বলি, সেটা ভুল হবে। আমি চাচ্ছিলাম, তাকে বিদেশে নিয়ে যেতে। টাকার সংকটের কারণে নিয়ে যেতে পারছি না। আমাদের যা, সব তো শেষ। এখন সহযোগিতা নিয়ে চলছি। আমার দেশের মানুষের কাছে আমার একটাই চাওয়া, স্বামীকে যেন সুস্থ করতে পারি। যদি করতে না পারি, আমি এমনিতে বানের জলে ভাসতেছি, আরও বেশি ভাসতে হবে। আমার সন্তানরা বাবাহারা হয়ে যাবে।’

কাকলীর ভাষ্য, আবদুস সাত্তারের প্রথম পরিবারের লোকজন তার সঙ্গে বেশ দুর্ব্যবহার করেছেন। তারা চায় নারায়ণগঞ্জে নিয়ে গিয়ে কোনো একটা হাসপাতালে সাত্তারকে চিকিৎসা করানোর জন্য। এতে আপত্তি জানানোতে একটা সময় গিয়ে কাকলীকে তারা মারতেও চেয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সহায়তা নিয়ে তিনি সে পরিবারের নামে জিডি করেছেন।

‘আমার স্বামীর পাশে আমি আর আমার সন্তানেরা ছাড়া আর কেউ নেই’, বলেন কাকলী।

অভিনেতা সাত্তার চান আগের মতো সুস্থ হয়ে সুন্দর একটা জীবনযাপন করতে। সুন্দর এ পৃথিবীতে আরও অনেক দিন বেঁচে থাকতে। তার ভাষ্য, ‘কেউই কী নেই আমাকে বাঁচতে, আমার পাশে দাঁড়াতে, আমাকে বাঁচাতে। সিনেমার গল্পে তখন প্রেম হারিয়ে গিয়েছিল, আমার ছবি দিয়ে হলমুখী হয়েছিল দর্শক। বিনিময়ে ইন্ডাস্ট্রির লোকেরা আমাকে ভালোবাসা দিলো না।’
সূত্র: প্রিয়.কম

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত