প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ফিলিস্তিনে ইহুদি বসতি স্থাপনকে যে চোখে দেখতেন গান্ধী

ডেস্ক রিপোর্ট : ভারত-ইসরায়েল পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় ১৯৯২ সালের জানুয়ারিতে। আড়াই দশকের ব্যবধানে ২০১৭ সালের জুলাই মাসে ইসরায়েল সফর করেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এই ২৫ বছরে ইসরায়েল ভারতের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সামরিক মিত্রে পরিণত হয়েছে। ২০১৭ সালেই ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মোট রফতানিকৃত অস্ত্রের ৪১ শতাংশ ক্রয়ের মধ্য দিয়ে ভারত ইসরায়েলি অস্ত্রের সবচেয়ে বড় বাজারে রূপান্তরিত হয়েছে। তবে এই ২৫ বছরের কথা বাদ দিলে বিগত ইতিহাস দাঁড়িয়ে আছে ভিন্ন এক মাত্রা নিয়ে। স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরুর পর ভারতের প্রায় সাড়ে চার দশক সময় লেগেছিল দিল্লিতে ইসরায়েলি দূতাবাস স্থাপন (১৯৯২ সাল) করতে। এর প্রধানতম কারণ, ফিলিস্তিনি মুক্তিকামী জনতার প্রতি ভারতের অকুণ্ঠ সমর্থন, যার প্রেরণায় ছিলেন ভারতের জাতিগত মুক্তি আন্দোলনের প্রবাদ-ব্যক্তিত্ব মহাত্মা গান্ধী। ইহুদি জনগোষ্ঠীর ওপর জার্মান বিদ্বেষের সূচনার দিনগুলোতে তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল গান্ধী ‘দ্য জিউস’ শিরোনামে এক নিবন্ধ লিখেছিলেন। বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকদের জন্য ১৯৩৮ সালে রচিত সেই নিবন্ধের ভাষান্তর হাজির করেছেন সারোয়ার তুষার।

এমন অনেক চিঠি আমার হাতে এসেছে যেগুলোতে ফিলিস্তিনের আরব-ইহুদি প্রশ্ন আর জার্মানিতে ইহুদি নিপীড়ন সম্পর্কে আমার মতামত প্রত্যাশা করা হয়েছে। খুবই জটিল এই প্রসঙ্গকে ঘিরে আমার নিজের মতামত অস্বস্তিহীন নয়, যা আপনাদের সামনে হাজির করার ঝুঁকি নিচ্ছি।

ইহুদিদের প্রতি আমার পরিপূর্ণ সহানুভূতি রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকাতে আমি তাদের ঘনিষ্ঠভাবে জেনেছি। কেউ কেউ আমার সারা জীবনের সঙ্গী হয়ে গেছেন । সেই বান্ধবদের কাছ থেকে আমি তাদের ওপর বহু বছর ধরে চলতে থাকা নিপীড়নের ইতিহাস সম্পর্কে জেনেছি । খ্রিস্ট ধর্মবিশ্বাসীদের কাছে তারা অস্পৃশ্য । ইহুদিদের প্রতি খ্রিস্টানদের আচরণ আর নমশূদ্রদের প্রতি হিন্দুদের আচরণের মধ্যে ঘনিষ্ঠ মিল রয়েছে । উভয় ক্ষেত্রেই অমানবিক আচরণের বৈধতা প্রতিষ্ঠায় দোহাই তোলা হয়েছে ধর্মীয় অনুমোদনের। সুতরাং বন্ধুত্বের বাইরেও ইহুদিদের প্রতি আমার সমবেদনার একটা সাধারণ সর্বজনীন পাটাতন রয়েছে । তবে সমবেদনার সেই প্রশ্নটি আমাকে ন্যায়বিচারের অপরিহার্যতার প্রশ্নে অন্ধ রাখতে পারেনি। কেবল ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের জন্য একটি জাতীয় রাষ্ট্রের আকুতি আমার মনে তেমন কোনও আবেদন সৃষ্টি করতে পারেনি। এর পক্ষে যুক্তি খোঁজা হয় বাইবেল আর সেই গ্রোথিত বিশ্বাসের মধ্যে যে, ইহুদিরা ফিলিস্তিনে প্রত্যাবর্তনের জন্য আকুল।

কিন্তু কেন ইহুদিরা দুনিয়ার আর সবার মতো জন্ম নেওয়া আর জীবিকা যাপন করার দেশকে জন্মভূমি ভাবতে পারে না ? ফিলিস্তিন আরব জনগণের, ঠিক যে অর্থে ইংল্যান্ড ইংরেজদের অথবা ফ্রান্স ফরাসিদের। ইহুদি জনগোষ্ঠীকে আরবদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একইসঙ্গে ভুল আর অমানবিক। ফিলিস্তিনে বর্তমানে যা ঘটে চলেছে তাকে নৈতিকতার কোনও মানদণ্ডেই ন্যায্যতা দেওয়া যায় না । চলমান বাস্তবতার তাৎপর্য একটাই, বিগত যুদ্ধের বৈধতা প্রতিষ্ঠা। আরবদের অপদস্থ করে ফিলিস্তিন অংশত কিংবা পুরোপুরি ইহুদিদের জাতীয় আবাস হিসেবে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হলে নিঃসন্দেহে তা মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধের শামিল হবে। এর চেয়ে বরং যেখানে ইহুদিদের জন্ম ও রুটি-রুজি সেখানেই তাদের সাথে ন্যায্য আচরণের দাবির প্রতি জোর দেয়া উচিত। ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করা একজন ইহুদি ততটাই ফরাসি, যতটা ফরাসি সেখানে জন্ম নেওয়া একজন খ্রিস্টান ।

ইহুদিদের যদি ফিলিস্তিন ছাড়া আর কোনও আবাস না থাকে, তাহলে কি তারা পৃথিবীর অন্য যেসব প্রান্তে এতকাল ধরে বসতি স্থাপন করে আছে, সে সবের বেলায় কী হবে? সেই সব স্থান থেকে তাদের উচ্ছেদ করতে চাওয়া হলে তারা কি তা সহজভাবে নেবে? নাকি তারা কোনও দ্বৈত আবাসভূমি চায়, যেখানে তারা খেয়ালখুশি মতো থাকতে পারবে? জাতীয় আবাসভূমির জন্য এই তোড়জোড় জার্মানির ইহুদি বিতাড়নকেই কৃত্রিম বৈধতা দেয়। তবে ইতিহাসে জার্মানির ইহুদি নিপীড়নের সমতুল্য কোনও নজির নেই। প্রাচীনকালের নিপীড়কেরাও হিটলারের সমান উন্মাদ হতে পারেনি। ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে হিটলার এটা করছেন। একচেটিয়া ও জঙ্গি জাতীয়তাবাদ হলো হিটলারের সেই ধর্মীয় মতবাদ, যার মাধ্যমে যেকোনও অমানবিক কাজকেই বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য মানবিক বলে স্বীকৃত ও পুরস্কৃত করা যায়।

একজন নির্দয় উন্মাদ তরুণের অপরাধ তার গোটা জাতিকে অবিশ্বাস্যরকমের হিংস্রতা সমেত তাড়া করে ফিরছে। সমগ্র জাতির ওপর অনিয়ন্ত্রিত নিপীড়ন প্রতিরোধ করতে জার্মানির বিরুদ্ধে মানবতার নামে ও মানবতার স্বার্থে একটা ন্যায়যুদ্ধ সংঘটিত হয় তাহলে সেটা সম্পূর্ণ ন্যায্য হবে। কিন্তু যুদ্ধে আমার কোনও আস্থা নেই। এমন একটি যুদ্ধের ইতি-নেতি নিয়ে আলাপ আলোচনা করা তাই আমার মনোগত অবস্থান ও নীতির বাইরে। ইহুদিদের সাথে এমন অপরাধ সংঘটিত করার পরেও জার্মানির বিরুদ্ধে কোনও ন্যাযুদ্ধ নাই হতে পারে। তবে কোনোভাবেই জার্মানির কোনও মিত্র থাকতে পারে না। যে জাতি (যুক্তরাজ্য) নিজেদের ন্যায় ও গণতন্ত্রের পক্ষের বলে দাবি করে তার সাথে কী করে ওই দুই নীতির ঘোষিত শত্রুর মৈত্রী হয়? ইংল্যান্ড কি তাহলে সশস্ত্র একনায়কতন্ত্র বলতে যা বোঝায় সেই পথে যাত্রা শুরু করেছে?

গোটা দুনিয়াকে জার্মানি দেখাচ্ছে, মানবতার মুখোশে হাজির হওয়া সহিংসতাকে কী নিপুণভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। ভণ্ডামি আর ভানগুলোকে তখন দিব্যি চালিয়ে নেওয়া যায়। জার্মানি আরও দেখাচ্ছে, চূড়ান্ত নগ্নতায় হাজির হওয়া সহিংসতা কতটা কুৎসিত, ভয়ঙ্কর ও বিভীষিকাময় হতে পারে। ইহুদিরা কি এই সংগঠিত ও নির্লজ্জ নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে? নিজেদের আত্মমর্যাদা সংরক্ষণ করা ও নিজেদের অসহায়, ঘৃণিত, অচ্ছুত না ভাবার কি কোন উপায় তাদের আছে? আমি মনে করি আছে। ঈশ্বরে বিশ্বাসী কোনও ব্যক্তিই নিজেকে নিঃসহায় কিংবা অচ্ছুত ভাবতে পারে না।

মূলগতভাবে ঈশ্বর সর্বজনীন-অদ্বিতীয় ও বর্ণনাতীত। তবে খ্রিস্টান, মুসলমান ও হিন্দুদের স্রষ্টার চেয়ে ইহুদিদের ঈশ্বর Jehovah আরও বেশি করে তাদের একান্ত। যেহেতু ইহুদিরা তাদের সেই ঈশ্বরের প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্যশীল এবং তাদের সমস্ত কর্মকাণ্ডকেই ইশ্বর-নিয়ন্ত্রিত মনে করেন; সুতরাং তাদের নিজেদের অসহায় মনে করার কোনও কারণ নেই। আমি যদি জার্মানিতে জন্ম নেওয়া এবং সেখানে জীবনযাপন করা একজন ইহুদি হতাম, তাহলে আমি জার্মানিকে আমার মাতৃভূমি মনে করতাম এবং সর্বোচ্চ অ-ইহুদি জার্মান শক্তির সামনে দাঁড়িয়ে বুক পাতিয়ে আমাকে গুলি করার চ্যালেঞ্জ জানাতাম। অথবা আমাকে ভূগর্ভস্থ কারাগারে নিক্ষেপ করতে বলতাম। আমি বিতাড়নকে প্রত্যাখ্যান করতাম, বৈষম্যপূর্ণ আচরণের প্রতি বশ্যতা স্বীকার করতাম না । আমার ইহুদি সতীর্থরা গণপ্রতিরোধে আমার সাথে যোগ দিবে এই অপেক্ষা করতাম না। কারণ, আমার পূর্ণ আত্মবিশ্বাস থাকতো যে শেষমেশ অন্য ইহুদিরা আমার পথেই হাঁটতে শুরু করবে।

এখন ফিলিস্তিনি ইহুদিদের উদ্দেশে কিছু কথা। আমার কোনও সন্দেহ নেই যে তারা ভুলপথে অগ্রসর হচ্ছে। বাইবেলের ধারণায় বর্ণিত ফিলিস্তিন কোনও ভৌগোলিক ভূখণ্ড নয়। এটি ইহুদিদের আধ্যাত্মভূমি। তারপরও তারা যদি ফিলিস্তিনি ভূমিকে তাদের জাতীয় আবাস মনে করে, তাহলেও ব্রিটিশ বন্দুকের ছত্রছায়ায় সেখানে প্রবেশ করা ঠিক নয়। কারণ, বেয়নেট কিংবা বোমার সাহায্য নিয়ে কোন ধর্মীয় কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করা উচিত নয় । একমাত্র আরবদের সদ্দিচ্ছায় তারা ফিলিস্তিনে থিতু হতে পারে । তাদের উচিত আরবদের হৃদয় জয় করার উপায় খোঁজা ।

আরবদের মনোভূতিতে যে ঈশ্বরের আবাস, একই সেই ঈশ্বর রয়েছেন ইহুদিদের হৃদয়ভূমিতেও। তাদের ধর্মীয় প্রজ্ঞার মধ্য দিয়ে তারা বিশ্ব-জনমতকে তাদের অনুকূলে পাবে। ব্রিটিশ বেয়নেটের সহায়তা পরিত্যাগ করলেই কেবল আরবদের সাথে সমঝোতায় পৌঁছানোর ভিন্ন-বিভিন্ন পথ বের হবে। কিন্তু ব্রিটিশদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তারা এমন একটা জনগোষ্ঠীকে সর্বস্বান্ত করছে, যারা (ফিলিস্তিনি) তাদের কোনও ক্ষতি করেনি । আমার এই অবস্থান আরবদের প্রতি আমার মাত্রাতিরিক্ত পক্ষপাত নয়। আমি শুধু চাইছি, যাকে তারা [আরবদের দখলকৃত ভূমিতে] অবৈধ অনুপ্রবেশ কিংবা অনিবার্য আঘাত হিসেবে দেখছেন তা প্রতিরোধে তারা অহিংসার নীতি অবলম্বন করুক। কিন্তু অভূতপূর্ব প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও, ন্যায় অন্যায়ের সর্বজনীন বিধিবিধানের কারণেই আরবদের প্রতিরোধকে নাকচ করা যায় না।

তাহলে যে ইহুদিরা নিজেদের (ঈশ্বর কর্তৃক) নির্বাচিত জাতি মনে করে, তারা পৃথিবীতে তাদের যথার্থতা প্রতিপালন করার ক্ষেত্রে অহিংস নীতি অবলম্বন করে নিজেদের নামের প্রতি সুবিচার করুক । ফিলিস্তিনসহ পৃথিবীর সব দেশই তাদের দেশ, কিন্তু সেটা আগ্রাসনের মাধ্যমে [দখল] নয়, ভালোবাসার মাধ্যমে জয় করুক তারা । আমার এক ইহুদি বন্ধু আমাকে সেসিল রথের ‘সভ্যতায় ইহুদিদের অবদান’ বইটি পাঠিয়েছেন । এতে পৃথিবীর শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত, নাটক, বিজ্ঞান, চিকিৎসা, কৃষির সমৃদ্ধিতে ইহুদিদের ভূমিকা লিপিবদ্ধ রয়েছে। নিজেদের ইচ্ছাশক্তির বলেই ইহুদিরা পশ্চিম কর্তৃক উচ্ছিষ্ট, উপেক্ষিত কিংবা পৃষ্ঠপোষিত হওয়ার বাস্তবতা প্রত্যাখ্যান করতে পারে । তারা ঈশ্বর কর্তৃক বর্জিত নিষ্ঠুর হওয়ার পরিবর্তে ঈশ্বরের নির্বাচিত সৃষ্টি হওয়ার মাধ্যমেই পৃথিবীর মনোযোগ ও শ্রদ্ধার দাবিদার হতে পারে । তারা তাদের অজস্র অবদানের বাস্তবতায় অহিংস নীতির ভিত্তিতে কর্মকাণ্ড পরিচালনার অতুলনীয় বিষয়টিকে যুক্ত করতে পারে।

সূত্র : বাংলাট্রিবিউন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত